পুলিশের কাছে তো বটেই, আদালতেও দেবাশিস–বিজন বারবার বলেছিলেন, অপহরণের পর হত্যার কোনও পরিকল্পনাই ছিল না তাঁদের। অনভিজ্ঞতা এবং ভয়ের যোগফলে ঘটে গিয়েছিল। কিন্তু অনুরাগ জীবিতই নেই আর, এটা জেনেও এরপর ওঁরা দু’জন যা করেছিলেন, ক্ষমাহীন।
১৪ অক্টোবর, লিখেছি আগে, প্রথম ফোন গিয়েছিল আগরওয়ালদের বাড়িতে। ১৫ অক্টোবর সন্ধে সাতটা কুড়িতে টাকা হাতবদল হল। পাঁচ টাকার বিনিময়ে একটি স্থানীয় বাচ্চা ছেলেকে শিখিয়ে-পড়িয়ে পাঠিয়ে দিলেন দু’জনে, বসুশ্রীর সামনে দাঁড় করানো গাড়ি থেকে টাকা নিতে। টাকা এল, ভাগাভাগি হল। এবং দু’জনে ঠিক করলেন, ভোদা-পলু-গোপালকে বলবেন, টাকা আদৌ পাওয়াই যায়নি। ওদের ভাগ দেওয়ার দরকার নেই। ভোদা-বাহিনী অবশ্য অত সহজে মেনে নেওয়ার পাত্র ছিল না। সরাসরি হুমকি দিল, ওসব গালগল্প শুনিয়ে লাভ নেই। কালীপুজোর মধ্যে টাকা না পেলে দেবাশিস-বিজনের লাশ খুঁজে পাওয়া যাবে না। অনুরাগের মতো দশা হবে।
ক্রমাগত হুমকিতে ভয়ই পেয়ে গেলেন দু’জন। ঠিক করলেন, আবার ফোন করবেন আগরওয়ালদের। ১৭ অক্টোবর থেকে ফোন করা শুরু হল। ততক্ষণে তদন্তে নেমে পড়েছে গোয়েন্দা দফতর। আগরওয়াল পরিবারও আঁচ পেয়ে গিয়েছে, বড়সড় গোলমাল আছে কোনও।
মোবাইল ফোন তখনও আসেনি এদেশে। এলে, এবং অভিযুক্তরা ব্যবহার করলে কিনারা করা অনেক সহজ হত। আগরওয়ালদের ল্যান্ডলাইনে আড়ি পাতা হল। ‘মিস্টার গুপ্তের’ ফোন তিন-চারদিন অন্তর আসতেই থাকল টাকার দাবি জানিয়ে। বক্তব্য, আশি হাজার পাইনি। কিন্তু আর আপনাদের বাড়ির ছেলেকে রাখতে চাই না। হাজার বিশেক দিলেই ছেড়ে দেব। দেবীলাল-শৈলেন্দ্র প্রতিবারই কথা বলতে চাইতেন অনুরাগের সঙ্গে। উলটোদিকের বাঁধাধরা উত্তর ছিল, টাকা পাওয়ার আগে কথা বলানো যাবে না। না পুলিশ, না আগরওয়াল পরিবার, কেউই তখনও জানে না, অনুরাগ আর বেঁচে নেই।
দাবি করা টাকার অঙ্ক কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই কুড়ি থেকে নেমে এল পাঁচ হাজারে। পুলিশের পরামর্শ অনুযায়ী ফাঁদ পাতা হল। দেবীলাল জানালেন, তিনি রাজি। ফোনে নির্দেশ এল, ৩ নভেম্বর কালীঘাট মন্দিরের কাছে একটা ডাস্টবিনে কাগজের প্যাকেটে টাকাটা রেখে দিতে। ছেঁড়া কাগজে ভরতি প্যাকেট নিয়ে সকাল দশটায় ডাস্টবিনে প্যাকেট রেখে দিলেন শৈলেন্দ্র। সোয়া দশটায় দেবাশিস ডাস্টবিনের কাছাকাছি এলেন, তাকাচ্ছিলেন এদিক-ওদিক। সাদা পোশাকের পুলিশ কলার চেপে ধরল।
—আপনি মিস্টার গুপ্ত?
—না, মানে…
—অনুরাগ কোথায়?
—কে অনুরাগ?
একটি জোরদার থাপ্পড়ের প্রয়োজন হল, যা গালে পড়লে মিনিটতিনেক কানমাথা ভোঁ ভোঁ করার কথা। ওটুকুই যথেষ্ট ছিল।
—স্যার, আমি দেবাশিস ব্যানার্জি। অনুরাগকে মেরে ফেলেছি আমরা। আমি একা ছিলাম না।
বাকি যারা ছিল, বিজন-পল্লব-ভোদা-গোপাল, ধরা পড়ল কয়েকদিনের মধ্যেই। জেরায় সব স্বীকার করল অভিযুক্তরা। কিন্তু একটাই সমস্যা, অনুরাগের দেহ পাওয়ার কোনও সম্ভাবনা ছিল না। দেহ না পেলে মৃত্যু প্রমাণ করা দুরূহ | অভিযুক্তদের জিজ্ঞাসা করা হল, একই স্বীকারোক্তি কি আদালতে দেওয়ার জন্য প্রস্তুত? সবার আগে রাজি হলেন দেবাশিস।
এখানে একটু আইনের ব্যাখ্যা জরুরি। তফাতটা বোঝানো জরুরি, পুলিশের কাছে করা স্বীকারোক্তি আর আদালতে বিচারকের এজলাসে করা স্বীকারোক্তির। গ্রেফতারের পর পুলিশ ধৃতের মৌখিক স্বীকারোক্তির বয়ান লিপিবদ্ধ করতে পারে ফৌজদারি দণ্ডবিধির ১৬১ ধারায়। কিন্তু এই স্বীকারোক্তি প্রামাণ্য হিসেবে গ্রাহ্য নয় আদালতে, যতক্ষণ না তা অন্য সাক্ষ্যপ্রমাণ দিয়ে তর্কাতীতভাবে প্রমাণিত হচ্ছে। পরিভাষায়, corroborative evidence, সহায়ক প্রমাণ মাত্র, স্বতঃসিদ্ধ নয়। হতেই পারে, মেরেধরে ভয় দেখিয়ে স্বীকারোক্তি আদায় করেছে পুলিশ। তাই এই আইনি রক্ষাকবচ।
আদালতে বিচারকের কাছে দেওয়া স্বীকারোক্তির (judicial confession, ফৌজদারি দণ্ডবিধির ১৬৪ ধারা) প্রমাণমূল্য ঢের বেশি, এ প্রমাণমূল্য অকাট্য (substantive evidence), যদি সেটা হয় সত্যি এবং স্বেচ্ছাপ্রণোদিত। এবং যদি তার সাধারণ সমর্থন মেলে অন্য সাক্ষ্যপ্রমাণে, সে সরাসরিই (direct evidence) হোক বা পারিপার্শ্বিক (circumstantial), শাস্তি একরকম অনিবার্যই |
কী করে বোঝা যাবে, আদালতে স্বীকারোক্তি পুলিশের চাপে কি না? সে বিধানও আছে আইনে। প্রাক্-স্বীকারোক্তি পালনীয় নিয়ম রয়েছে। যা মানতে হয় বিচারককে। প্রথামাফিক, পুলিশ পেশ করে আর্জি। জানায়, আদালতে স্বীকারোক্তিতে রাজি হয়েছে অভিযুক্ত। আবেদন গৃহীত হলে দিন স্থির হয় স্বীকারোক্তির। আদালতে অভিযুক্ত হাজির হলে কিছু বাঁধাধরা প্রশ্ন করেন বিচারক। নমুনা দেওয়া যাক।
‘আপনি কি অমুক মামলায় দোষ স্বীকার করতে চান? করলে, কেন চান?
আমি ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশের লোক নই। আপনি কিন্তু আইনত দোষ স্বীকার করতে বাধ্য নন আসামি হিসেবে। তবু যদি স্বীকার করেন, বিচারপর্বে সেই স্বীকারোক্তি আপনার বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হবে। এটা জানেন তো?
পুলিশ কি আপনাকে বলেছে যে দোষ স্বীকার করলে মামলা থেকে অব্যাহতি পাবেন বা সাজা কম হবে?
আপনি কি পুলিশের নির্দেশে বা চাপে পড়ে দোষ স্বীকার করতে এসেছেন? নির্ভয়ে বলুন।
