দিন তো গেল, সন্ধে হল | অনুরাগকে নিয়ে তিনজন ফের রওনা দিল গোডাউনে। পলু ও ভোদা ভিতরে অপেক্ষা করছিল। ঢুকেই ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল অনুরাগ। এ কোথায় এলাম? এখানে শুটিং হবে? ক্যামেরা কই, আলো কই, টেকনিশিয়ানরা কই? আর ওই দু’জন কারা? লুঙ্গি পরে বসে আছে, সামনে গ্লাস, বিশ্রী গন্ধ বেরচ্ছে মুখ থেকে? একটা প্যাকিং বক্স উঁচু করে রাখা একধারে। উপরে চট ও চাদর পাতা। একটা ছোট ল্যাম্প জ্বলছে টিমটিম। বিজনরা ঢুকতেই ভোদা দরজা বন্ধ করে দিল গোডাউনের, চাবি দিয়ে দিল ভিতর থেকে। দারোয়ান ভগবতী তখন বাইরে, চোলাইয়ের খদ্দেররা আসতে শুরু করেছে।
এই গুদামঘরে অনুরাগকে মারা হয়েছিল
ব্যাপারস্যাপার দেখে ভয় পেয়ে গেল অনুরাগ। কেঁদেই ফেলল দেবাশিসের হাত জড়িয়ে ধরে, ‘আঙ্কল, বাড়ি যাব | আমাকে প্লিজ় নিয়ে চলুন এখান থেকে। আমি অভিনয় করতে চাই না।’
দেবাশিস-বিজন তখন কিছুটা বিভ্রান্ত। ঠিক কীভাবে এগোবেন, বুঝতে পারছেন না। ভোদা ব্যাপারটা বুঝে দায়িত্ব নিয়ে নিল, এরপর চিল্লামিল্লি করবে, বেঁধে ফেল।
পাঁচজনে ঘিরে ধরে মুখে লিউকোপ্লাস্ট লাগিয়ে দেওয়া হল অনুরাগের, বেঁধে ফেলা হল হাত-পা। প্যাকিং বক্সের উপর শুইয়ে দিয়ে air purifier mask-এর মধ্যে কয়েক ফোঁটা ক্লোরোফর্ম দিয়ে নাকের কাছে ধরা হল। একটা ঝিমুনি ভাব এল ঠিকই, কিন্তু অচৈতন্য নয়।
সে-রাতে পাহারায় থাকল বিজন। ঠিক হল, ভোদা আর পলু রাতে মাঝেমাঝে এসে দেখে যাবে, কোনও অসুবিধে হচ্ছে কি না। দেবাশিস কলকাতায় চলে এলেন সে-রাতে। পরের দিন, ১৩ অক্টোবর, ফিরে এলেন সন্ধেবেলায়। বিজন বললেন, ‘কোনও কাজ হয়নি ক্লোরোফর্মে, সারারাত ছটফট করেছে অনুরাগ।’ সঙ্গে যোগ করলেন, ‘ফোন করেছ আগরওয়ালদের?’ দেবাশিস বললেন, ‘করব, কাল।’
বিজন এবার ফিরে গেলেন কলকাতায়। সে-রাতে পাহারার পালা দেবাশিসের। সন্ধেবেলা গুদামঘরে তখন গোপাল-পলু-ভোদা-দেবাশিস। ভোদা বখরার টাকার দাবি করল। এখনও জোগাড় হয়নি শুনে খেপে গিয়ে বলল, ‘এমন তো কথা ছিল না! আমি আগে টাকা না নিয়ে কোনও কাজে হাত দিই না। পলু বলেছিল বলে করেছিলাম। ২/৩ দিন ওয়েট করব, তার মধ্যে টাকা না পেলে…।’ কথা শেষ করল না ভোদা, কিন্তু চোখের দৃষ্টিতে রক্ত হিম হয়ে গেল দেবাশিসের।
রাত বাড়ল। ভোদা একটা দোকানে নিয়ে গেল বাকি তিনজনকে। ডিনারে মশলা ধোসা, শেষ পাতে কুলফি। দেবাশিস পয়সা দিতে গেলেন, ভোদা থামিয়ে দিল, ‘আমার কাছে পয়সা চাওয়ার হিম্মত এ তল্লাটে কারও নেই। কেউ কথা বলে না আমার উপর।’
ফেরা হল গুদামে | তখন প্রবল ছটফট করছে অনুরাগ, কাঁদছে। মুখ বাঁধা থাকায় আওয়াজ বেরচ্ছে না, কিন্তু জল পড়েই চলেছে চোখ দিয়ে। পলু বলল, ‘ব্যাপারটা কিন্তু খারাপ দিকে যাচ্ছে। কলকাতার ছেলে, ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ে। টাকা যদি পেয়েও যাই, একে ছেড়ে দিলে সব বলে দেবে। মুখ তো চিনেই ফেলেছে। ধরা পড়লে লাইফ বরবাদ হয়ে যাবে।’
ভোদা সায় দিল, ‘সবার আগে দেবাশিস তোমরা ফাঁসবে। আনাড়ি মালের সঙ্গে কাজ করার এই মুশকিল। আমার জেলখাটা অভ্যেস আছে। ও ঠিক বেরিয়ে আসব কয়েক মাসের মধ্যে। তুমি আর বিজন সারা জীবনের মতো ভোগে।’
পলু বলল, ‘ভোদা ঠিক বলছে, একে বাঁচিয়ে রাখলে বিপদ।’
দেবাশিস এসব শুনে দিশেহারা তখন। অনুরাগের ছটফটানি, ভোদা-পলুর ভয় দেখানো, সব মিলিয়ে পাগল-পাগল অবস্থা। ঠিক, বাঁচিয়ে রেখে আর লাভ নেই, বলে দেবাশিসই প্রথমে চড়ে বসলেন অনুরাগের বুকের উপর। ঝাঁপিয়ে পড়ল বাকিরাও। গলায় গামছা দিয়ে ফাঁস দিল ভোদা, পা চেপে ধরল পলু-গোপাল। ছটফটানি থেমে গেল অনুরাগের, অল্প কিছু সময়ের মধ্যেই।
এবার? অনুরাগ বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল সাদা স্ট্রাইপড শার্ট আর খয়েরি ট্রাউজ়ার পরে। পায়ে ছিল চটি। হাতে সোনার আংটি ছিল, গলায় সোনার চেন | সঙ্গে নিয়ে ছিল একটা ব্যাগ। যাতে ক্রিম রংয়ের শার্ট আর ট্রাউজ়ার ছিল, শুটিং-এ ইস্ত্রি করা ভাল জামাকাপড় পরবে, সম্ভবত এই ভেবেই। কালো সানগ্লাস ছিল, ছিল একটা ক্যামেরাও। হলুদ রঙের টুপি ছিল ব্যাগে, একটা খাতা-পেনসিলও নিয়েছিল। যদি ডায়লগ টুকে রাখতে হয়, এমনটাই ভেবে ছিল হয়তো। একটা মানিব্যাগ ছিল পকেটে, ভিতরে একটা কুড়ি টাকার নোট। আর ছিল একপাতা ভিটামিন ক্যাপসুল, যা দাদুর কথায় খেত রুটিন মাফিক।
যা পরে ছিল অনুরাগ, জ্বালিয়ে দেওয়া হল সব। ব্যাগের শার্টপ্যান্ট নিলেন দেবাশিস, পরের দিন রেখে এলেন বিজনের বাড়িতে| ক্যামেরাটাও দেবাশিসই নিয়েছিলেন, বেচে দিয়েছিলেন পরে। বিক্রির টাকা ভাগ করে নিয়েছিলেন পল্লব আর বিজনের সঙ্গে। গোপাল নিল সানগ্লাস। ওষুধের পাতাটা পল্লব রেখে দিল পকেটে।
ভোদাই ব্যবস্থা করল দেহ লোপাটের। বস্তায় অনুরাগের দেহ ভরে বেঁধে ফেলল দড়ি দিয়ে। রাত গভীর হলে সবাই রওনা হল গঙ্গার ঘাটে, গলির গলি তস্য গলি দিয়ে, নুনগোলার পাঁচিল টপকে। ভোদাই পথ দেখিয়ে নিয়ে গেল। অন্ধকারে হোঁচট খেয়ে পায়ে চোট লাগল দেবাশিসের।
বস্তাবন্দি দেহ নিয়ে পলু ও গোপাল গঙ্গায় নামল। সাঁতরে কিছু দূর গিয়ে ভাসিয়ে দিল জলে। সেদিন ছিল চতুর্থী। দেবীর বোধনের আগেই পুজোর মরশুমে গঙ্গায় ভাসান হয়ে গেল নিরপরাধ এক কিশোরের, যে অন্ধের মতো বিশ্বাস করেছিল দেবাশিস-বিজনকে।
