কান্নাভেজা গলায় যতটুকু বললেন সদ্য মাতৃহারা মানসী, মোটামুটি এই।
—মা একা থাকত বলে খুব সতর্ক ছিল অচেনা লোককে বাড়িতে ঢুকতে দেওয়ার ব্যাপারে। আমিও মা-কে সাবধান করতাম নিয়মিত। একা মানুষ থাকে। কখন কী হয় বলা যায়?
—ওঁর বাজারহাট-টাট… এসব কি আপনিই…
—হ্যাঁ, সপ্তাহে একবার আমি এসে করে দিয়ে যেতাম। আমি না পারলে আমার স্বামী আসতেন। সপ্তাহের বাজার, ওষুধপত্র, এই সব। বাকি ডলি কাকিমারা দেখে নিতেন হঠাৎ কিছু দরকার হলে। আর উষাদি তো ছিলই।
‘উষাদি’ বলতে ‘উষারানি দেবী’। আটপৌরে মলিন শাড়ির পঞ্চাশোর্ধ্বা মহিলা, যিনি ফ্ল্যাটের বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন ঠায়। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদেই চলেছেন। উষারানি এ বাড়িতে ঠিকের কাজ করছেন প্রায় বছর দশেক হল। এই আবাসনের আরও তিনটে ফ্ল্যাটেও কাজ করেন। বাড়ি ক্যানিংয়ে। রোজ সকালের ট্রেনে আসেন কলকাতায়। মঞ্জুর ফ্ল্যাটে সাতটা-সাড়ে সাতটায় ঢুকে ঝাড়পোঁছ করে অন্য ফ্ল্যাটগুলোর কাজ সারেন। দুপুরে ফের মঞ্জুর ফ্ল্যাটে চলে এসে কাপড় কাচা, বাসন মাজা, একটু রান্নাবান্না, টুকটাক ফাইফরমাশ খাটা, এবং বিকেলের ট্রেনে বাড়ি ফেরা। মঞ্জুর ব্যাপারে জিজ্ঞেস করতেই ডুকরে কেঁদে ওঠেন।
—‘মা’ আমাকে মেয়ের মতই ভালবাসতেন…
—আর কে আসত? কাজের লোক আর কেউ ছিল?
—হ্যাঁ স্যার, জগদীশ।
—কে জগদীশ?
জগদীশ যাদব। সুইপার, তিরিশ বছর বয়স। রোজ আটটার মধ্যে চলে এসে সাফসুতরো করে যেতেন বাথরুম। তারপর যেতেন আরও কয়েকটা ফ্ল্যাটে।
জগদীশ থাকেন কাছেই, চেতলার লকগেটের কাছে। বাড়িতেই ছিলেন। খবর পাঠাতেই এলেন শক্তপোক্ত চেহারার যুবক। কালো গেঞ্জি আর নীলরঙা বারমুডা পরিহিত জগদীশ জানালেন, যতক্ষণ ছিলেন মঞ্জুর ফ্ল্যাটে, অস্বাভাবিক কিছু দেখেননি।
—আমি আটটায় ঢুকেছিলাম রোজকার মতো। বেরিয়েছিলাম সোয়া আটটা নাগাদ। উষাদি তখন ঘর ঝাঁট দিচ্ছিল।
মলয় তাকান উষার দিকে। উষা ঘাড় নাড়েন, জগদীশ মিথ্যে বলছে না। আরও দুটো প্রশ্ন ছিল মলয়ের।
—অন্য ফ্ল্যাটগুলোর কাজ সেরে কখন বেরিয়েছিলেন?
—এই স্যার, দশটার কাছাকাছি হবে। পাঁচ-দশ মিনিট এদিক-ওদিক হতে পারে।
—হুঁ, বাড়ি কোথায় আপনার?
—বিহার স্যার। ছাপড়া। বছর সাতেক আগে কলকাতায় এসেছি পেট চালাতে।
এতগুলো ফ্ল্যাট, বাসিন্দাদের সবার ব্যাপারে বিস্তারিত খোঁজখবর নিতেই কেটে গেল আরও দিনদুয়েক। স্বাভাবিক নিয়মে ওই চারতলা বাড়িতে কার কখন প্রবেশাধিকার ছিল, জানা জরুরি ছিল। কোন ফ্ল্যাটে কে কাগজ দিত, কোন ফ্ল্যাটে কে সুইপারের কাজ করত, ঠিকে কাজের লোক কে ছিল কাদের বাড়িতে, কোন দুধওয়ালা সকালে আসত দুধ দিতে, কেবল অপারেটর কারা কারা আসত ফ্ল্যাটবাড়িতে, এই সব।
তথ্য সংগ্রহের এই কাজটা যে কী পরিমাণে ‘শুষ্কং কাষ্ঠং’ হতে পারে, সেটা তদন্তকারী অফিসার মাত্রই জানেন হাড়েহাড়ে। অপরাধটা করেছে হয়তো এক বা দু’জন বা তিন। তদন্তের চূড়ান্ত পর্বে হয়তো সন্দেহভাজনের সংখ্যা দাঁড়াবে বড়জোর পাঁচ কিংবা ছয়ে, তবু কমপক্ষে পঞ্চাশ-ষাট জনকে একই প্রশ্ন করে যেতে হয়। যাঁকে প্রশ্ন করা হচ্ছে, তাঁর খুনের সঙ্গে কোনও যোগ থাকার সম্ভাবনা শূন্য, এটা জেনেও। এটা জেনেও, বাড়তি কোনও তথ্য পাওয়ার সম্ভাবনাও হয়তো শূন্যেরই কাছাকাছি।
উদ্দেশ্য একটাই। ‘Process of elimination’, দুধের থেকে জলটা আলাদা করা। অপ্রয়োজনীয় তথ্য একটা একটা করে ছেঁটে ফেলা। মাঠটাকে ছোট করে আনা।
এই আলাদা করার প্রক্রিয়ায় বিস্তর খাটাখাটনি করলেন মলয়। একতলায়, গেট দিয়ে ঠিক ঢোকার মুখে ‘ইলেকট্রোক্রাফট’ বলে একটা দোকান ছিল। ইলেকট্রিক্যাল সরঞ্জামের যে দোকান রোজ সকাল সাড়ে আটটায় ঝাঁপি খুলত, সেই দোকানের সমস্ত কর্মচারীর সঙ্গে কথা বললেন মলয়। পাশেই পান-বিড়ি-সিগারেটের দোকান ছিল একটা। সেখানেও তথ্যতালাশ। রোজকার চেনামুখের বাইরে অন্য কাউকে ঢুকতে দেখছিলেন? কেউই মনে করতে পারলেন না বলার মতো কিছু।
কী করেই বা পারবেন? ময়নাতদন্তের রিপোর্ট বলছে, খুনটা হয়েছে ন’টা থেকে সাড়ে দশটার মধ্যে। এমন একটা সময়ে, যখন বাসিন্দারা কাজে বেরচ্ছেন একের পর এক। কাজের লোকদের যাতায়াতও লেগেই আছে। রোজকার সকাল-সন্ধে-দুপুর-বিকেল কে আর অত মনে রাখে আলাদা করে, কে-ই বা খেয়াল করে খুঁটিয়ে?
.
—কী দাঁড়াচ্ছে তা হলে?
মলয়কে প্রশ্ন করেন ওসি হোমিসাইড। লালবাজারের গোয়েন্দাবিভাগে পর্যালোচনা চলছে মামলার অগ্রগতির। দিন সাতেক পেরিয়ে গেছে খুনের পর। ‘ক্লু’ বা ‘লিড’ এখনও অধরা।
—স্যার, পসিবল সাসপেক্টদের একটা লিস্ট করেছি। তবে এর বাইরেও হতে পারে অন্য কেউ।
—শুনি।
—এক নম্বরে সুমিত রায়। ডলি-শেখরের ছেলে। আমি খোঁজ নিয়েছি স্যার। ওই ট্রাভেল এজেন্সির ব্যবসা মোটেই ভাল চলছিল না। টাকার দরকার ছিলই।
—‘মোটিভ’ বুঝলাম, কিন্তু ‘অ্যালিবাই’?
—আছে, তবে দুর্ভেদ্য কিছু নয়। বলেছেন, পৌনে দশটা নাগাদ অফিস গেছিলেন। সেটা সত্যিই বলেছেন, ভেরিফাই করেছি। কিন্তু সময়টা ভাবুন স্যার। খুনটা হয়েছে সকাল ন’টা থেকে সাড়ে দশটার মধ্যে। সুমিতবাবু অফিস যাওয়ার পথে কাজটা করে রোজকার মতো বেরিয়ে গেছেন, একেবারে অসম্ভব নয়।
