—অসম্ভব নয়….
—আরও একটা জিনিস স্যার, খুনটা যে পরিচিত কেউ করেছে এটা তো পরিষ্কার। যদি দুটো চায়ের কাপ থেকে ধরে নিই, আততায়ী দু’জন ছিল, তা হলেও দু’জনের একজনকে পরিচিত হতেই হবে। না হলে দরজা খুলতেন না মঞ্জুদেবী।
—বুঝলাম, কিন্তু…
—বলছি স্যার। একটা ব্যাপার মাথায় রাখা দরকার, ডলির ফ্ল্যাটের আলাদা কলিংবেলটা, যা দিয়ে মঞ্জুর ফ্ল্যাটের বেল বাজানো যায়, সেটা কিন্তু ইচ্ছে করলেই সুমিতও বাজাতে পারতেন। অ্যাকসেস ছিল।
—হুঁ!
—ধরুন স্যার, উনি বেলটা বাজালেন অফিস বেরনোর আগে। মঞ্জু এসে দাঁড়ালেন দরজার বাইরে। অন্য কাউকে, সে ফ্ল্যাটেরই হোক বা অন্য কোনও লোক, হয়তো আগে থেকে সুমিত বলে রেখেছিলেন। সে-ও ওই সময়ে ঢুকল বাড়িতে। উঠল দোতলায়। সুমিত নেমে এলেন। মঞ্জুকে হয়তো কোনও দরকারি কথার ব্যাপারে বললেন। সঙ্গের বন্ধুকেও ডেকে নিলেন, চা খাওয়ার পর দু’জনে মিলে খুনটা করলেন।
—থিয়োরেটিকালি অসম্ভব নয়, প্র্যাকটিক্যালিও হয়তো নয়, হতেই পারে। আর, সুমিত এবং তার সঙ্গী করেছে বলে ধরে নেওয়াটাও ঠিক নয়, হয়তো করিয়েছে। ভাড়াটে লোক দিয়ে। যারা অপেক্ষায় ছিল নীচে। নির্দিষ্ট সময় বলা ছিল। যারা সময়মতো উঠে এসে বেল বাজিয়েছে। আর মঞ্জু কিছু বোঝার আগেই সুমিত ভিতর থেকে খুলে দিয়েছেন দরজা, এবং খুলে দিয়ে বেরিয়ে গেছেন সঙ্গীকে নিয়ে, ভাড়াটে খুনিরা ‘অ্যাকশন’ করে বেরিয়ে গেছে।
—পসিবল স্যার…
—কিন্তু সুমিতই হোক বা অন্য কেউ, লাভ তো কিছু হল না। ওই তো কয়েকটা গয়না, যা পরে থাকতেন। বেচে বড়জোর দশ হাজার। আর ব্যাগে ট্যাগে হয়তো কিছু টাকা ছিল। সেটা নিয়ে গেছে। কতই বা হবে? হাজার দুই-তিন খুব বেশি হলে। তার বেশি টাকা তো বাইরে থাকার কথা নয়।
—সেটা অপরাধীদের ব্যাড লাক স্যার। ভদ্রমহিলা এবং ওঁর স্বামী, দু’জনেই সরকারি চাকরি করেছেন দীর্ঘদিন। টাকাপয়সার অভাব ছিল না। যে কেউ ভাববে, আলমারি ভাঙতে পারলে ভালই আমদানি হবে। আলমারির চাবি মঞ্জু রাখতেন রান্নাঘরে একটা শিশির মধ্যে। ওটা খুঁজে পায়নি খুনিরা।
—হুঁ।
—সাসপেক্ট নাম্বার টু, জগদীশ। সুইপার। পেটানো চেহারা।
ওসি হোমিসাইড হেসে ফেলেন।
—মলয়, চেহারা গুন্ডার মতো হলেই যে গুন্ডা হতে হবে, এমন কথা নেই কিন্তু।
মলয়ও মৃদু হেসেই উত্তর দেন।
—সে তো জানি স্যার। কিন্তু এর ক্ষেত্রেও ওই ফ্যাক্টর দুটো অ্যাপ্লিকেবল। টাকা এবং পরিচিত হিসেবে প্রবেশাধিকার।
—কিন্তু উষা তো বলছেন, কাজ সেরে বেরিয়ে গিয়েছিল জগদীশ!
—উষা বেরিয়ে যাওয়ার পর ফিরে আসেনি কাউকে নিয়ে, কী গ্যারান্টি আছে?
—হ্যাঁ, কিন্তু সুইপারকে ডাইনিং টেবিলে বসিয়ে চা খাওয়ায় কেউ?
—রাইট স্যার, ওখানেই খটকা।
—ব্যাক গ্রাউন্ড চেক করেছ জগদীশের?
—করেছি স্যার। বলার মতো কিছু পাইনি। রাত্রে মদ-টদ খায়, এই পর্যন্ত। ক্রিমিনাল রেকর্ড কিছু নেই। লোক লাগানো আছে। টাকা ওড়াচ্ছে কিনা, খবর রাখতে বলেছি।
ওসি হোমিসাইড বুঝতে পারেন দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায়, মলয় দিনরাত খাটছে ঠিকই, কিন্তু তদন্ত এখনও ঘুরপাক খাচ্ছে সম্ভাব্যতার গণ্ডিতে। নির্দিষ্ট ‘ক্লু’ এখনও নেই। নেই প্রমাণ।
—আর কোনও সাসপেক্ট?
—সে-অর্থে সাসপেক্ট বলব না স্যার, কিন্তু মঞ্জুদেবীর জামাই দীপঙ্করের আর্থিক অবস্থাও যে খুব ভাল ছিল এমন নয়। আরও খোঁজ নিচ্ছি স্যার। ক্লিন চিট দেওয়ার জায়গায় কেউই নেই।
—গুড। আমরা যখন ট্রেনিং-এ ছিলাম, কী বলা হত জানো? তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়ে কাউকে বিশ্বাস করতে নেই। ‘Believe nobody, trust nobody’। সব কিছু বারবার যাচাই করে তবেই বিশ্বাসের প্রশ্ন, সন্দেহের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার প্রশ্ন। সে যে-ই হোক না কেন। মৃতের মা-বাবাই হোক বা স্ত্রী-পুত্র, বা মেয়ে-জামাই। আচ্ছা, হোয়াট অ্যাবাউট ভরদ্বাজ ফ্যামিলি? যারা চারতলায় থাকত?
—মিস্টার ভরদ্বাজের ব্যবসা সংক্রান্ত কোনও আর্থিক সমস্যা ছিল না। মধুবালার সঙ্গে, আই মিন মিসেস ভরদ্বাজের সঙ্গে মঞ্জুদেবীর সুসম্পর্ক ছিল। ওঁদের মেয়ে প্রীতিকে মঞ্জু খুবই ভালবাসতেন। প্রতি পুজোয় জামাকাপড় কিনে দিতেন। ঘটনার সঙ্গে এই ফ্যামিলির কোনওরকম ইনভলভমেন্টের সম্ভাবনা দেখছি না। অন্তত এখনও পর্যন্ত।
—বেশ …
—রইল বাকি উষারানি। ট্র্যাক রাখছি মহিলার। মঞ্জুদেবীর মেয়ে মানসীকে আলাদা করে জিজ্ঞেস করেছি উষারানির ব্যাপারে।
—কী বললেন?
—বললেন, ‘উষাদিকে দশ বছর ধরে দেখছি। নিজের মায়ের মতো ভালবাসত মা-কে। আমাকে ভালবাসে মেয়ের মতো। এর সঙ্গে উষাদি জড়িত, দুঃস্বপ্নেও ভাবতে পারি না। উষাদি আমাদের পরিবারের সদস্য হয়ে গেছিলেন।’
—হুঁ… উষার বাড়িতে কে কে আছেন?
—স্বামী মারা গেছেন। একা থাকেন ক্যানিং-এ। এক মেয়ে। বিয়ে হয়ে গেছে। মেয়ে-জামাইয়ের সঙ্গে তেমন যোগাযোগ নেই।
—সোর্সকে তবু বলে রেখো।
—বলেছি স্যার। এমন তো কতই হয়, দীর্ঘদিনের কাজের লোক বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে বাইরে কাউকে খবর দিয়ে দিল…
—হ্যাঁ, ভেরি কমন। ট্র্যাক রাখো।
—ইয়েস স্যার।
মলয় উঠে পড়ার মুখে থামান ওসি হোমিসাইড।
—আর হ্যাঁ, ইলেকট্রনিক সারভেল্যান্স…কাউকে বাদ দিয়ো না কিন্তু… সে যে-ই হোক… কাউকেই না…
