ডলি রায়, যিনি আবিষ্কার করেন মৃতদেহ, মঞ্জুর ঘনিষ্ঠতম প্রতিবেশিনী ছিলেন। দু’জনে ছিলেন প্রায় সমবয়সিই। এতটাই ঘনিষ্ঠ ছিলেন দু’জনে, যে দুই পরিবারের নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের জন্য আলাদা কলিংবেল ছিল দুটো ফ্ল্যাটেই। আলাদা বেল, আলাদা আওয়াজ।
মঞ্জু বছর পাঁচেক ধরে নানা রোগে ভুগছিলেন। ব্লাডপ্রেসারের দোসর হয়েছিল ব্লাডসুগার। বছরখানেক হল ব্যাধির তালিকায় নতুন সংযোজন হয়েছিল আর্থারাইটিস। হাঁটুর ব্যথায় কাবু হয়ে থাকতেন বছরভর।
বাড়ির বাইরে বেরতেন মাসে একবারই। রিকশা করে ব্যাংকে যেতেন পেনশনের টাকা তুলতে। ব্যস, ওই একবারই। বাকি সময় ঘরেই। মাসকাবারি বাজার করে দিয়ে যেতেন মেয়ে মানসী বা জামাই দীপঙ্কর। রোজকার বাজারহাট আর টুকটাক কেনাকাটা, যখন প্রয়োজন হত, করে দিতেন প্রতিবেশীরাই। দিনে অন্তত দু’বার ডলি নিয়ম করে মঞ্জুর ফ্ল্যাটে আসতেন। ডলির থেকে আরও জানা গেল, মঞ্জু বাড়িতে সবসময় গলায় সোনার চেন পরে থাকতেন। আর হাতে সোনার চুড়ি। যা পাওয়া যায়নি মৃতদেহে। নিয়ে গেছে আততায়ীরা।
—কিছু দরকার হলে, বা এমনিই গল্প করার ইচ্ছে হলে মঞ্জুদি কলিংবেল বাজাত আমাদের ফ্ল্যাটে। যখন আমার যাওয়ার হত মঞ্জুদির ফ্ল্যাটে, আমিও বেল বাজাতাম উপর থেকে। মঞ্জুদি দরজা খুলে দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত দরজার মুখটায়। অপরিচিত কাউকে এমনিতে দরজা খুলতই না। ভিতর থেকে হাঁক দিয়ে জিজ্ঞেস করত, ‘কে? কী দরকার?’ চেনা কেউ এসেছে, একশোভাগ নিশ্চিত হয়ে তবেই খুলত।
—আজও উপর থেকে বেল বাজিয়ে নীচে এসেছিলেন?
—হ্যাঁ, ওটা অভ্যেস হয়ে গেছে আমাদের। মঞ্জুদির হাঁটুর ব্যথা শুরু হওয়ার পর থেকেই ওই ব্যবস্থা। রোজ সকালে এগারোটা নাগাদ নীচে আসতাম জর্দা আর সেদিনের ‘আনন্দবাজার’ কাগজটা নিয়ে। আজও বেল বাজালাম। নীচে এলাম, দেখি দরজা বন্ধ। ডাকলাম, সাড়া দিল না। দরজা ঠেললাম একটু পরে। খুলে গেল। ঢুকে দেখি এই কাণ্ড….।
হাউহাউ করে কেঁদে ফেলেন ডলি।
আতঙ্কের ঘোর কাটার পর স্বামী শেখরকে উপর থেকে ডেকে এনেছিলেন ডলি। শেখর রায়, বয়স সত্তরের উপর। রিজার্ভ ব্যাংক অফ ইন্ডিয়ার অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী। শেখর স্নেহ করতেন মঞ্জুকে, ডাকতেন ‘মা’ বলে। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করে এমন কোনও তথ্য পাওয়া গেল না, যা ডলি জানাননি পুলিশকে।
ডলি-শেখরের একমাত্র সন্তান সুমিত। বয়স সবে চল্লিশ পেরিয়েছে। অবিবাহিত। নেপাল ভট্টাচার্য লেনেই একটা ট্র্যাভেল এজেন্সির অফিস চালান। সুমিত রায়ের বয়ান অনুযায়ী, পৌনে দশটা নাগাদ রোজকার মতো অফিসে বেরিয়েছিলেন পায়ে হেঁটে। সাড়ে এগারোটা নাগাদ বাড়ি থেকে ফোন পান, মঞ্জুদেবী খুন হয়ে গেছেন। তড়িঘড়ি ফিরে আসেন।
আর একটি তথ্য দিলেন সুমিত। আন্দাজ সাড়ে ন’টা নাগাদ এক যুবক বেল বাজিয়েছিল তাঁদের তিনতলার ফ্ল্যাটে। বলেছিল, আনন্দবাজার পত্রিকার মার্কেটিং বিভাগের কর্মী। আনন্দবাজার এবং টেলিগ্রাফের দৈনিক গ্রাহক হওয়ার ‘কম্বো অফার’ নিতে আগ্রহী কিনা, জানতে চেয়েছিল। সুমিত আগ্রহ দেখাননি। যুবক উঠে গিয়েছিল চারতলায়।
চারতলায় কোথায় গিয়েছিল? ভরদ্বাজ পরিবারের ফ্ল্যাটে। স্ত্রী-কন্যা নিয়ে দীর্ঘদিন এই ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকেন ওমপ্রকাশ ভরদ্বাজ। ব্যবসা করেন। স্ত্রীর নাম মধুবালা। একমাত্র কন্যা প্রীতির বয়স একুশ। কস্টিং পড়ার পাশাপাশি চাকরি করেন সল্টলেকের একটি বিপিও-তে। প্রীতি জানালেন, আনন্দবাজারের ওই কর্মী তাঁদের ফ্ল্যাটেও গিয়েছিল। ‘কম্বো অফার’ নিতে রাজি হয়েছিলেন প্রীতিরা। ফর্মে সই করে রিসিট দিয়ে গেছে যুবকটি। নিজের নাম আর ফোন নম্বরও লিখে দিয়েছে রিসিটের পিছনে। কী নাম? শুভঙ্কর দে।
ফোনে সঙ্গে সঙ্গেই শুভঙ্করকে ধরেছিলেন মলয়। বিকেল চারটে নাগাদ। চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ মিনিটের মধ্যেই আনন্দবাজারের প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিটের অফিস থেকে কালীঘাটে চলে এসেছিলেন বাইশ বছরের শুভঙ্কর। মিনিট পনেরো কথা বলেই মলয় বুঝেছিলেন, ছেলেটি সত্যিই মার্কেটিং-এর কাজে এসেছিল। কোথাও কোনও গণ্ডগোল নেই। একটাই জিনিস শুধু জানার ছিল।
—যখন উঠছেন সিঁড়ি দিয়ে, বা নেমে আসছেন, কাউকে উঠতে বা নেমে যেতে দেখেছিলেন? মনে করে দেখুন…।
একটু ভাবেন শুভঙ্কর।
—না স্যার, অত খেয়াল করিনি। আমি ফোনে কয়েকটা এসএমএস চেক করতে করতে উঠছিলাম। খেয়াল করিনি।
—তবু মনে করে দেখুন না একটু…
শুভঙ্কর হাসেন।
—ভাল করে দেখলে তবে তো মনে থাকবে। দেখিইনি তো খেয়াল করে। এখন কিছু বলতে গেলে বানিয়ে বলতে হবে স্যার।
সূত্রের খোঁজে মরিয়া মলয় তবু প্রশ্ন করেন।
—যখন দোতলা থেকে তিনতলায় উঠছেন, দোতলার দরজা খোলা ছিল?
—না, বন্ধ ছিল। আমি তো দোতলাতেও বেল বাজিয়েছিলাম। মিনিট খানেক অপেক্ষা করেছিলাম। কেউ খোলেনি দরজা। তারপর তিনতলায় উঠে গিয়েছিলাম।
—সময় তখন আন্দাজ ক’টা হবে?
—এই সাড়ে ন’টার আশেপাশে হবে।
—যখন নেমে আসছিলেন, তখনও বন্ধ ছিল দোতলার দরজা?
শুভঙ্কর সামান্য হেসে ফেলেন এবার।
—খেয়াল করিনি এত স্যার।
এঁকে আর জিজ্ঞাসা করে নতুন কিছু পাওয়ার নেই। বরং জানা দরকার, কার কার রোজ মঞ্জুদেবীর ঘরে ঢোকার প্রবেশাধিকার ছিল। উত্তর পাওয়া গেল মানসী মৈত্রর কাছে। মৃতার একমাত্র সন্তান। যিনি কেঁদেই চলেছেন মায়ের ফ্ল্যাটে চলে আসার পর থেকে। সান্ত্বনা দিতে ব্যর্থ হচ্ছেন স্বামী দীপঙ্কর।
