মেঝেতে পড়ে প্লাস্টিকের চপ্পল একজোড়া, দৃশ্যতই মঞ্জুর রোজকার ব্যবহারের। চশমাটা পড়ে বিছানায়, বালিশের পাশে। বাড়ির ল্যান্ডফোনের রিসিভারটা মাটিতে পড়ে, তার ছেঁড়া। দুটো শোওয়ার ঘরই তছনছ অবস্থায়। বালিশ-বিছানা, আলনায় রাখা কাপড়চোপড়, প্লাস্টিকের ছোটখাটো ব্যাগ, কিছুই বাদ দেয়নি খুনি বা খুনিরা। হাতড়েছে সব।
যে বিছানায় মঞ্জুদেবীর মৃতদেহ পড়ে ছিল, তার পাশে স্টিলের আলমারি একটা। বন্ধ, কিন্তু চাবি ঘোরানোর জায়গায় একাধিক ‘টুলমার্ক’। চাবি না পেয়ে কোনও যন্ত্রপাতি দিয়ে খোলার চেষ্টা করলে যেমন দাগ হয়। খুনের পর যে ফ্ল্যাটের যেখানে যা টাকাপয়সা-গয়নাগাটি আছে, হাতানোর মরিয়া চেষ্টা হয়েছিল, বুঝতে ফেলুদা বা ব্যোমকেশ হওয়ার দরকার নেই। ঝলকের দেখাই যথেষ্ট।
মঞ্জুর মৃতদেহ উদ্ধার হল যে ঘরে, সে ঘরেই একটা মাঝারি সাইজ়ের ডাইনিং টেবিল। যার উপর দুটো চায়ের কাপ। একটা স্টিলের, আরেকটা পোর্সেলিনের। চায়ের তলানি পড়ে আছে দুটো কাপেই। আর একটা বড় চায়ের কাপ পড়ে আছে মেঝেতে। হ্যান্ডলটা ভেঙে গেছে, পড়ে আছে কাপের পাশে। একটা নিশ্চয়ই মঞ্জুর, অন্য দুটো? খুনি এক নয়, দু’জন?
বাথরুমের ভিতরটা দেখা হল। অস্বাভাবিক কিছু নেই। দেখা হল রান্নাঘরও। সিঙ্কে কিছু থালাবাসন পড়ে আছে। কাপ-প্লেট-বাটি-চামচ-বয়াম রাখা আছে কিচেনের তাকে, যেমন থাকে যে-কোনও মধ্যবিত্ত বাড়িতে। সবজি পড়ে আছে ঝুড়িভরতি।
ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা ঘুরে দেখলেন ফ্ল্যাটের প্রতিটি ইঞ্চি-সেন্টিমিটার-মিলিমিটার। আঙুলের ছাপ পাওয়া গেল দুটো জায়গায়। স্টিলের আলমারিতে, আর ডাইনিং টেবিলের উপর রাখা দুটো চায়ের কাপে। তৈরি হল ‘seizure list’, বাজেয়াপ্ত করা জিনিসের তালিকায় থাকল মঞ্জুদেবীর বিছানায় লাগা রক্তের ছোপের নমুনা, রক্তমাখা বিছানার চাদর ও বালিশের কভার, নীল রংয়ের একটা ক্যারিব্যাগ রক্তমাখা, আঙুলের ছাপ সহ দুটো চায়ের কাপ, মাটিতে পড়ে থাকা কাপ এবং তার ভাঙা হ্যান্ডল।
ততক্ষণে এসে পৌঁছেছে গোয়েন্দাবিভাগের CD Van (Corpse Disposal), বিশেষ শববাহী গাড়ি। ময়নাতদন্তে পাঠানোর জন্য যখন নীচে নামানো হচ্ছে মঞ্জুদেবীর নিথর দেহ, স্থানীয় মানুষের ভিড়ে থিকথিক নেপাল ভট্টাচার্য স্ট্রিট। গাড়িতে তুলে ‘বডি’ বার করতেই কালঘাম ছুটে গেল পুলিশের। ডিসি সাউথ আর ডিসি ডিডি নীচে নামতেই ধেয়ে এল ইলেকট্রনিক মিডিয়ার কয়েক ডজন বুম।
—খুনের কারণ কিছু জানা গেল?
—আপনারা কি পরিচিত কাউকে সন্দেহ করছেন?
—সকালবেলা এভাবে একজন বয়স্ক মহিলা খুন হয়ে গেলেন, এটা কি শহরে নাগরিকদের নিরাপত্তা রক্ষায় কলকাতা পুলিশের ব্যর্থতা নয়?
—ফরেনসিক এক্সপার্টরা কী বললেন?
—সিপি কি স্পট ভিজিটে আসবেন?
প্রশ্ন ঝাঁকে ঝাঁকে। একে অন্যকে শেষ করার সুযোগ না দিয়েই। ডিসি ডিডি শান্ত ভাবে বললেন, ‘তদন্ত সবে শুরু হয়েছে। খুনের কিনারা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব করার চেষ্টা করব আমরা। সমস্ত সম্ভাবনাই খতিয়ে দেখা হবে।’
ডিসি সাউথ যোগ করলেন, ‘একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটেছে। খুবই দুর্ভাগ্যজনক। কিন্তু সামগ্রিক ভাবে শহরের নাগরিকদের নিরাপত্তায় কলকাতা পুলিশ ব্যর্থ, এই ধারণা করা অতি সরলীকরণ হবে বলে আমাদের মনে হয়।’
এটুকুই যথেষ্ট ছিল। শুরু হয়ে যায় ‘লাইভ’ সম্প্রচার, কালীঘাট থেকে অমুকের সঙ্গে ক্যামেরায় তমুক।
‘আপনারা শুনলেন, কালীঘাটে প্রৌঢ়ার নৃশংস খুনকে স্রেফ ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ বলে দায় এড়ালেন ডিসি সাউথ। কিন্তু স্থানীয় মানুষ এই ঘটনায় চূড়ান্ত আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন শহরের বয়স্কদের নিরাপত্তা নিয়ে। থানার এত কাছে দিনদুপুরে ঘটে যাওয়া এই খুনে প্রশ্ন উঠছে কালীঘাট থানার ভূমিকা নিয়েও। আমরা এখন শুনে নেব, স্থানীয় বাসিন্দারা ঠিক কতটা আতঙ্কগ্রস্ত… আচ্ছা…আপনি তো এখানেই থাকেন… এভাবে দিনের বেলায় এই নৃশংস খুন…’
মিডিয়া মিডিয়ার কাজ করছিল। পুলিশ পুলিশের। যখন ফ্ল্যাটের ভিতরটা সরেজমিনে দেখছিলেন পুলিশকর্তারা-ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা, প্রাথমিক বিবরণ ফোনে শুনে নিয়েই সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছিলেন নগরপাল। কেসটা ডিডি করবে। তদন্তের দায়িত্ব পড়েছিল হোমিসাইড শাখার তরুণ সাব-ইনস্পেকটর মলয়কুমার দত্তর উপর।
.
তথ্যসংগ্রহের প্রাথমিক কাজকর্ম সেরে মলয় যখন বেরলেন বাড়ি ফেরার জন্য, রাত সাড়ে ন’টা বেজে গেছে প্রায়। তিন-চারটে তো নয়, ৩২টা ফ্ল্যাট। সব মিলিয়ে একশোর উপর বাসিন্দা। প্রত্যেকের ঠিকুজিকুষ্ঠি জোগাড় করতেই তো ঘণ্টা তিনেক চলে গেল। তা-ও শেষ হয়নি পুরোটা। বাকি আছে আরও। কে কী করেন, ঘটনার সময় কোথায় ছিলেন, কার মোবাইল নম্বর কত, খুঁটিয়ে জানতে আরও একটা দিন লাগবে।
তবে দিন একেবারে নিষ্ফলাও যায়নি। খুনটা যে পরিচিত বা পরিচিতরাই করেছে, এবং উদ্দেশ্য যে ছিল টাকাপয়সা-গয়নাগাটি লুঠপাট, সেটা মোটামুটি ধরা যেতেই পারে। এখনও ‘মোটামুটি’, কারণ এক শতাংশ সম্ভাবনা এসব ক্ষেত্রে থাকেই, খুনটা হল সম্পূর্ণ অন্য কারণে, কিন্তু পুলিশকে ‘মিসলিড’ করতে চেহারা দেওয়া হল লুঠপাটের। তেমন কিছু তো এখনও মনে হচ্ছে না, ফিরতে ফিরতে ভাবেন মলয়। যা যা জানা গেল আজ দিনভর জিজ্ঞাসাবাদে, মনে মনে ঝালিয়ে নেন একবার।
