স্নেহ অতি বিষম বস্তু। লোভ বিষমতর।
পুনশ্চ: সাত্যকি মল্লিক এবং সুরজিৎ রায়, এই দুটি নাম পরিবর্তিত। ওঁরা জীবিত। ওঁদের স্বাভাবিক সামাজিক জীবনে এই কেস নিয়ে কৌতূহলী প্রশ্ন আর অহেতুক বিড়ম্বনার আবির্ভাব হোক এত বছর পরে, অভিপ্রেত নয়, তাই।
২.০৯ বিশ্বাসই বিশ্বাসঘাতক
[মঞ্জু ঘোষাল হত্যা
মলয় দত্ত, সাব-ইনস্পেকটর, গোয়েন্দাবিভাগ। ২০১৬ সালে পেয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী প্রদত্ত ‘সেবা পদক’।]
দরজাটা বন্ধ কেন? মঞ্জুদির তো খুলে বেরিয়ে আসার কথা, বেরিয়ে দাঁড়ানোর কথা দরজার মুখে। এমনটাই তো হয়ে আসছে এতদিন ধরে। আজ অন্যথা কেন? কেউ আছে ভিতরে? সামান্য থমকান ডলি। একটু ইতস্তত করেন। বেল বাজান। উত্তর নেই কোনও। সামান্য জোরেই ডাক দেন এবার।
—মঞ্জুদি?
সেকেন্ড পাঁচেক পরেও যখন আওয়াজ নেই কোনও ঘরের ভিতর থেকে, গলা আর একটু চড়ান ডলি।
— মঞ্জুদি.. আমি ডলি। মঞ্জুদি…?
কী হল? এমন তো হওয়ার কথা নয়। মঞ্জুদি সাড়া দিচ্ছে না কেন? শরীরটা ইদানীং ভাল যাচ্ছিল না। মাথা-টাথা ঘুরে অজ্ঞান হয়ে গেল? নাকি পেনশন তুলতে বেরিয়েছে? কিন্তু সে তো দিনচারেক আগেই তুলে এনেছে ব্যাংক থেকে। তা ছাড়া বেরলে তো দরজায় তালা দেওয়া থাকবে। নেই তো! উদ্বিগ্ন ডলির কী মনে হয়, দরজায় সামান্য চাপ দিয়ে দেখেন। এবং খুলে যায় অর্ধেকটা, ওই সামান্য চাপেই। দরজাটা খোলাই ছিল, ভেজানো। ডলি দ্বিধা কাটিয়ে ঘরে ঢুকে পড়েন।
ফ্ল্যাটে ঢুকেই সামান্য একচিলতে জায়গা। পেরিয়ে বাঁ দিকে একটা শোওয়ার ঘর। খোলা। কেউ নেই ভিতরে। বিছানাটা ওলটপালট অবস্থায়। জিনিসপত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে। ভয় পেয়ে যান ডলি। মঞ্জুদি কোথায়?
এ ফ্ল্যাটে সে-অর্থে ড্রয়িংরুমের কোনও বালাই নেই। ডানদিকে একটা ছোট প্যাসেজ। বাথরুম-রান্নাঘর ছাড়া আরেকটা শোওয়ার ঘর। যার দরজাটা একটু খোলা। ডলি ঠেলে খুললেন। এবং খুলেই দাঁড়িয়ে পড়লেন স্থাণুবৎ।
‘মঞ্জুদি’ পড়ে আছেন বিছানায়। উপুড় হয়ে। লাল-সাদা রংয়ের যে নাইটিটা পরে ছিলেন, ভেসে যাচ্ছে রক্তে। শরীরের উপরিভাগ খাটের উপর। হাঁটু থেকে নিম্নাংশ খাটের নীচে। ঝুলছে। ঘর লন্ডভন্ড।
ডলি কাঁপতে থাকেন। ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে কোনওমতে উঠে আসেন তিনতলায়, নিজের ফ্ল্যাটে। হাত চেপে ধরেন স্বামী শেখরের, ‘নীচে চলো… মঞ্জুদি…!’
সত্তর ছুঁইছুঁই শেখর দু’তলায় নামেন যত দ্রুত সম্ভব। দেখেন, এবং বোঝেন, প্রতিবেশীদের বা মৃতা মঞ্জুর আত্মীয়দের খবর দেওয়ার আগেও জরুরি পুলিশকে জানানো। থামান কাঁদতে থাকা ডলিকে।
—ওঁর মেয়েকে ফোন করো। আমি ততক্ষণ থানায় জানাচ্ছি।
সকাল সোয়া এগারোটায় ফোন বাজল কালীঘাট থানায়। ডিউটি অফিসার ধরলেন, শুনলেন, জানালেন ওসি-কে। দুটো ফোন করলেন ওসি। একটা ডিসি সাউথ-কে, আরেকটা ডিসি ডিডি-কে। তারপর গাড়িতে উঠে বসলেন, ড্রাইভারের প্রতি নির্দেশ এল ঝটিতি।
—নেপাল ভট্চাজ স্ট্রিট, তাড়াতাড়ি।
ডিসি সাউথও পার্ক স্ট্রিটের অফিস থেকে রওনা দিলেন। যার কিছু পরেই লালবাজার থেকে স্টার্ট নিল ডিসি ডিডি-র গাড়ি।
গন্তব্য? কোথায় আর, কালীঘাট।
.
ন’বছর আগের মামলা। মঞ্জু ঘোষাল হত্যারহস্য। কালীঘাট থানা, কেস নম্বর ১৮৬, তারিখ ৬ নভেম্বর, ২০০৯। ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪/৩৯৪ ধারায়। খুন, একই অপরাধের উদ্দেশ্যে একাধিকের সম্মিলিত পরিকল্পনা এবং লুঠের উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃত আঘাত।
১, নেপাল ভট্টাচার্য স্ট্রিট। কালীঘাট থানা থেকে গাড়িতে মিনিট দুই-তিনের দূরত্বে। রাসবিহারী মোড় থেকে পশ্চিমদিকে কিছুটা এগিয়েই ডান হাতে পড়বে সদানন্দ রোড। সেই রাস্তা ধরে সামান্য এগিয়েই বাঁ দিকে পাবেন নেপাল ভট্টাচার্য স্ট্রিট। বাদামতলা আষাঢ় সংঘের পুজোটা যে জায়গায় হয়, তার দশ-বিশ মিটারের মধ্যেই অকুস্থল।
একই ঠিকানাতে দুটো বাড়ি পাশাপাশি। দুটোই চারতলা। বাড়ি দুটোতে ভাড়াটিয়া হিসেবে ৩২টি পরিবারের বাস। একটাই বড় গেট ঢোকার।
মঞ্জু ঘোষাল যে ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকতেন, সেটা দোতলায়। মঞ্জু এবং তাঁর স্বামী নারায়ণচন্দ্র ঘোষাল, দু’জনেই ডাক ও তার বিভাগের কর্মচারী ছিলেন। নারায়ণবাবু আটের দশকের শেষাশেষি চাকরি থেকে অবসর নেন। মঞ্জুও শারীরিক অসুস্থতার কারণে স্বেচ্ছাবসর নিয়েছিলেন ২০০৫ সালে।
ঘোষাল দম্পতির একমাত্র সন্তান, মানসী। ডাক নাম বুলা। সম্বন্ধ করে মানসীর বিয়ে হয়েছিল ১৯৯৯-তে। সিঁথির বাসিন্দা দীপঙ্কর মিত্রের সঙ্গে। মানসী-দীপঙ্করের বিয়ের মাস দেড়েকের মধ্যেই মৃত্যু হয় নারায়ণবাবুর। সেই থেকে মঞ্জু একাই থাকতেন দোতলার ওই ফ্ল্যাটে। যেখানে দিনদুপুরে কে বা কারা এসে কুপিয়ে খুন করে গেল ষাট বছরের প্রৌঢ়াকে।
কৌতূহলী প্রতিবেশীদের ভিড় সরিয়ে ফ্ল্যাট সম্পূর্ণ খালি করে দিয়ে যা যা নজরে এল পুলিশের, জানানো যাক। মঞ্জু রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে ছিলেন উপুড় হয়ে। চিত করে দিয়ে দেখা গেল, গালে ছড়ে যাওয়ার দাগ। শরীরের দু’জায়গায় ধারালো অস্ত্রের আঘাত। গলার নলি কাটা। রক্ত ঝরেছে প্রচুর। দ্বিতীয় ক্ষতচিহ্ন পেটে। ছুরি হোক বা ধারালো অন্য কিছু, আততায়ী বা আততায়ীরা সোজা ঢুকিয়ে দিয়েছিল পেটে। নাড়িভুঁড়ি বেরিয়ে এসেছে। লাল-সাদা নাইটিটা রক্তধারায় প্রায় পুরোটাই লাল। সাদা রং খুঁজতে দূরবিন লাগবে।
