—আংটিটা কোথায়? আর শ্যামবাবুর মোবাইল?
—মোবাইলটা ফেরার পথে গাড়ি থামিয়ে আছড়ে ভেঙে ফেলেছিল সঞ্জয়দা। বলেছিল, ‘এটা রাখা রিস্কি। পুলিশ ক্লু পাবে।’ আংটি সঞ্জয়দার কাছে আছে। পরদিন সকালে সাত্যকি সব শুনে বলল, ‘তোকে আগেই বলেছিলাম বাবলা, যাস না। এখন তো পুলিশ পিছনে লেগে যাবে।’ অম্লান আর আমি বললাম, ‘যা হওয়ার হয়ে গেছে। আংটিটা বেচে টাকা যা পাব, নিয়ে পালিয়ে যাব কলকাতার বাইরে।’ সাত্যকি যেখানে জিম করতে যেত, তার মালিকের জেম-জুয়েলারির কারবার ছিল। বললাম, একবার আংটিটা ওঁকে দেখানোর ব্যবস্থা করতে।
—সাত্যকি রাজি হল?
—প্রথমে হচ্ছিল না। আমরা জোরজার করায় নিমরাজি হল। পরদিন সন্ধেয় আংটিটা নিয়ে গেলাম। জিমের মালিক ভদ্রলোক দেখেশুনে বললেন, দাম বড়জোর হাজার দশেক হবে। আমরা চলে এলাম মন খারাপ করে। বুঝলাম, শ্যামদাই কোনও শাঁসালো খদ্দেরকে ঠকানোর মতলব এঁটেছিল আমাদের থ্রু দিয়ে।
—এরপর?
—সঞ্জয়দা সন্ধেবেলা পার্কে এসেছিল। বললাম সব। শুনে বলল, ‘আমাকে আংটিটা দে। ব্যান্ডেলে ভাল দোকান আছে। আমি ওখানে দেখাব আংটিটা।’ দিয়ে দিলাম। তারপর থেকে সঞ্জয়দার সঙ্গে কথা হয়নি আর। ফোন বন্ধ।
.
রাজকুমার, অমিত, বিজয়বাহাদুর এবং বিজয় রায়, এই চারজনকে ধরাটা কষ্টসাধ্য হল না বিশেষ। এক সপ্তাহের মধ্যেই গ্রেফতার হল। সঞ্জয় ছিলেন ধূর্তচূড়ামণি। কাগজে বেরিয়েছিল খুনের কিনারার খবর। জানতেন, পুলিশ হানা দেবেই ব্যান্ডেল স্টেশন রোডের বাড়িতে। পালিয়েছিলেন, মোবাইল দিনভর বন্ধ রাখতেন। চালু করতেন দিনে এক বা দু’বার। সঞ্জয়ের বাড়ি থেকে জোগাড় করা হয়েছিল ছবি। যা ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল সোর্সদের মধ্যে।
আংশিক প্রযুক্তি-সূত্র, আংশিক সোর্সের খবরের ভিত্তিতে সঞ্জয় ধরা পড়লেন ৮ সেপ্টেম্বর। আমহার্স্ট স্ট্রিটের ‘ক্রাউন লজ’ থেকে। যেখানে ‘মনোজিৎ ব্যানার্জি’ নামে উঠেছিলেন ৬ সেপ্টেম্বর। আসাম থেকে আসা ব্যবসায়ীর পরিচয়ে।
আংটি পাওয়া গেল না সঞ্জয়ের কাছেও। গেল কোথায়? সঞ্জয়ের বয়ান, ‘আমি দু’-একটা দোকানে যাচাই করে দেখেছিলাম স্যার। বলল, পাথরটা দেখতেই দামি হিরের মতো। হিরে নয়। ভাবলাম, আরও কয়েকটা জায়গায় দেখাব। তার মধ্যেই কাগজে দেখলাম, বাবলা ধরা পড়ে গেছে। আংটিটা বেচা রিস্কি হয়ে যেত। নিজের কাছে রাখলেও প্রমাণ থেকে যেত। গঙ্গায় ফেলে দিয়েছিলাম স্যার।’
প্রত্যক্ষদর্শীহীন অপরাধ। পুলিশের কাছে দেওয়া বয়ানের অকাট্য প্রমাণমূল্য নেই আদালতে। যতক্ষণ না পারিপার্শ্বিক প্রমাণের সমর্থন থাকে ঠাসবুনোট। শুভজিতের পেশ করা চার্জশিটে ঘটনা-পরম্পরা উঠে এল চিত্রবৎ।
বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল রাজেশ প্রসাদের কালো স্যান্ট্রো গাড়িটা। রাজেশ নিজের সাক্ষ্যে জানালেন, গাড়িটা সার্ভিসিং-এর অজুহাতে ১৪ অগস্ট নিয়ে বেরিয়েছিলেন রামকুমার। সাত্যকি মল্লিক বিচারকের কাছে জবানবন্দি দিলেন (judicial confession, ফৌজদারি দণ্ডবিধির ১৬৪ ধারায়)। যাতে ধরা থাকল শ্যামপ্রসাদের সঙ্গে রেসের মাঠের আলাপ হওয়া থেকে শুরু করে আংটি হাতানোর পরিকল্পনা, সব। সুরজিৎ আদালতে চিহ্নিত করলেন অরিন্দম ঘোষ এবং অম্লান দত্তকে। আমহার্স্ট স্ট্রিটের ‘ক্রাউন লজ’ থেকে বোর্ডার্স রেজিস্টার বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল। যেখানে ‘মনোজিৎ ব্যানার্জি’ নামে সই করেছিলেন সঞ্জয়। বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় সে হস্তাক্ষর মিলে গিয়েছিল ধৃত সঞ্জয়ের থেকে সংগৃহীত হাতের লেখার নমুনার সঙ্গে।
কেউ কি দেখেছিলেন সেদিন ধৃতদের শ্যামপ্রসাদের বাড়িতে ঢুকতে? রহস্যভেদের পর অনেক খুঁজেছিলেন শুভজিৎ। ঢুকতে দেখেছিলেন, এমন কাউকে পাওয়া না গেলেও খোঁজ মিলেছিল এক স্থানীয় বাসিন্দার। যিনি অরিন্দম ঘোষকে চেনেন দীর্ঘদিন, একই এলাকায় থাকার সুবাদে। পার্ক সাইড রোডের কাছেই কারমেল স্কুল। বিকেলবেলা স্কুলছুটির পর মেয়েকে নিয়ে ফিরছিলেন স্কুটারে করে। পার্ক সাইড রোডের মুখে সাড়ে চারটে-পৌনে পাঁচটা নাগাদ অরিন্দম এবং অন্যদের একটা সিগারেটের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিলেন। পাশে পার্ক করা ছিল সেই কালো স্যান্ট্রো। কৌতূহলবশত জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘কী রে বাবলা, এখানে এখন?’ অরিন্দম বলেছিলেন, ‘এই তো ইভনিং শো-তে মেনকায় সিনেমা দেখতে যাব আজ।’ গুরুত্বপূর্ণ পারিপার্শ্বিক প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল এই সাক্ষ্য। যাতে সঙ্গত করেছিল ধৃত সাতের সেদিনের মোবাইল টাওয়ার লোকেশন, বিকেল পৌনে পাঁচ থেকে সাড়ে ছ’টার।
বিচারপর্বে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন অভিযুক্ত সাতজন। অরিন্দম-অম্লান-সঞ্জয়, অমিত-বিজয় রায়-রাম কুমার-বিজয়বাহাদুর সিং। দণ্ডাদেশ? যাবজ্জীবন কারাবাস। এখনও জেলেই দিনযাপন।
মার্ক টোয়েন লিখেছিলেন, ‘Truth is stranger than fiction, but it is because fiction is obliged to stick to possibilities. Truth isn’t.’
খাঁটি কথা। ‘সত্যি’ সত্যিই হার মানায় বাস্তবকে, ফিকশনকে বলে বলে গোল দিতে পারে কখনওসখনও। কল্পকাহিনির লক্ষ্মণরেখা চিহ্নিত থাকে সম্ভাব্যতার সীমায়। বাস্তবের সে দায় নেই। থাকলে এভাবে প্রাণ যায় শ্যামপ্রসাদের? এভাবে জেলকুঠুরিতে পচতে হয় সাতজনকে? অর্থলিপ্সা ছিল উভয়তই। যিনি খুন হলেন, তাঁর। যারা খুন করেছিল, তাদেরও।
