—আরেকজন?
—অমিত নাম। কী করে জানি না। ওরা জানে। আগে এক-দু’বার দেখেছি। কাছেপিঠেই থাকে। এগজ়্যাক্ট জানি না।
নির্দিষ্ট ভাবে সব জানার দরকারও ছিল না আর। সাত্যকির থেকে শুভজিৎ নিয়ে নিলেন অম্লান-সঞ্জয়-অরিন্দম ঘোষের মোবাইল নম্বর। কাজ বলতে বাকি ছিল একে একে সাতজনকে ধরা। সে-রাতে আর বাড়ি ফেরা হল না শুভজিতের। ফিরলেন থানায়। প্রথমেই হানা দিলেন টালিগঞ্জে অরিন্দম ঘোষের বাড়ি। বাড়িতে নেই। অরিন্দমের বাবা পুলিশে চাকরি করতেন। অবসরপ্রাপ্ত সাব-ইনস্পেকটর। জানতে চাইলেন শান্ত ভাবে, ‘বাড়িতে পুলিশ কেন?’ সব শুনে ততোধিক শান্ত ভঙ্গিতে বললেন, ‘ছেলেটা নষ্ট হয়ে গেছে জানতাম এমন ছেলে থাকার চেয়ে না থাকাই ভাল। কোথায় আর যাবে? আশেপাশেই থাকবে। রাত দেড়টা-দুটোর আগে তো বাড়ি ফেরে না। ফোন নম্বরটা দিয়ে যান আপনার, বাবলা বাড়ি ফিরলেই খবর দেব।’
—একটা ছবি পাওয়া যাবে আপনার ছেলের?
বিনা বাক্যব্যয়ে ছেলের ছবি এনে শুভজিতের হাতে তুলে দিয়েছিলেন অরিন্দমের বাবা। বাড়ি ফেরার আগেই ধরা পড়ল অরিন্দম। ফোনের উপর প্রযুক্তি-প্রহরা চালু হয়ে গিয়েছিল সে-রাতেই, জানা যাচ্ছিল গতিবিধি। ভবানী সিনেমা থেকে নাইট শো দেখে বেরনোর মুখে ধরা হল। টালিগঞ্জ থানায় জিজ্ঞাসাবাদ চলল রাতভর। খুনের বৃত্তান্ত জানা গেল বিস্তারিত।
ছকের আসল কারিগর ছিলেন ব্যান্ডেলের সঞ্জয় ব্যানার্জি। তারাসুন্দরী পার্কের আড্ডায় অরিন্দমদের কাছে আংটি-বৃত্তান্ত শোনার পর সঞ্জয়ই মাথায় ঢোকান বাকিদের, আংটিটা হাতাতে পারলে সারা জীবন আর কারও কোনও চিন্তা থাকবে না। সঞ্জয়ই জুটিয়েছিলেন কুকর্মের আরও চার শরিককে।
বিজয়বাহাদুর সিং ওরফে বাদল, বড়বাজারের একটা শাড়ির দোকানের অস্থায়ী কর্মী। লিলুয়ার বিজয় রায়, যার বড়বাজারেই ফলের রসের ছোট দোকান। হরিরাম গোয়েঙ্কা স্ট্রিটের বাসিন্দা কুড়ি বছরের বেকার যুবক অমিত সিং। এবং যেহেতু কাজ হাসিল করার পর পালাতে হবে দ্রুত, গাড়ি দরকার। স্থানীয় ব্যবসায়ী রাজেশ প্রসাদের ড্রাইভার রামকুমার মণ্ডলকে লোভ দেখিয়ে দলে টেনেছিলেন সঞ্জয়।
চিত্রনাট্য ছিল এরকম— শ্যামপ্রসাদ কোর্ট থেকে সাধারণত ফিরে আসেন পাঁচটার মধ্যে। সাড়ে তিনটে থেকে চারটের মধ্যে মালিকের কালো স্যান্ট্রো গাড়ি নিয়ে রামকুমার পৌঁছবে পার্কের কাছে। মালিককে আগের রাতে বলে রাখবে গাড়ি সার্ভিসিং-এর কথা। বাকিরা অপেক্ষা করবে পার্কে।
পৌনে পাঁচটার মধ্যে রাসবিহারী মোড়ের কাছে পৌঁছনো হবে। পৌনে ছ’টা থেকে ছ’টার মধ্যে এক এক করে সবাই পৌঁছে যাবে তিনতলায় শ্যামপ্রসাদের ফ্ল্যাটের সামনে। রামকুমার গাড়ি নিয়ে অপেক্ষায় থাকবেন শরৎ বোস রোডের মুখে। সঞ্জয় যাবেন ‘কাস্টমার’ সেজে। আংটিটা দেখতে চাইবেন। এবং কিছুক্ষণ ‘নাম-কা-ওয়াস্তে’ দরদামের পর বলবেন, বাইরে ভাল দোকান থেকে যাচাই করে দু’-একদিন পরে আংটি ফেরত দিয়ে যাবেন। জানা কথা, শ্যামপ্রসাদ এ প্রস্তাবে রাজি হবেন না। তখন জোর করে কেড়ে নিতে হবে আংটি।
অরিন্দমকে বয়ানের মাঝপথেই থামান শুভজিৎ।
—শুধু কেড়ে নিয়ে পালালে তো সেটা একরকম হত। কিন্তু খুন…
—না স্যার, বিশ্বাস করুন, আমি জানতাম, আংটি নিয়ে পালিয়ে যাব। সঞ্জয়দা আর অম্লান যে অন্য প্ল্যান করেছে, ব্যাগে করে নারকেল দড়ি আর মুখে গোঁজার কাপড় নিয়ে গেছে, জানতাম না। বোকার মতো গেলাম ওদের সঙ্গে, ভুল হয়ে গেছে স্যার। সাত্যকি কিছু একটা আঁচ করে আগের রাতে আমাকে বলেছিল, ‘যাস না বাবলা, এই সঞ্জয় লোকটা ক্রিমিন্যাল টাইপের মনে হচ্ছে। উলটোপালটা কিছু করলে ফেঁসে যাব।’
—বন্ধুর কথা শুনলে খুনের দায়ে জেল খাটতে হত না, এখন বলে আর কী লাভ?
—স্যার, ও কিছুতেই যেতে রাজি হল না। নেমন্তন্ন আছে বলে কাটিয়ে দিল। বলল, টাকার ভাগ লাগবে না ওর। বড়লোকের ছেলে, টাকার অভাব নেই। আমি লোভ সামলাতে পারলাম না। সঞ্জয়দা বলেছিল, এক একজনের ভাগে কম করে পাঁচ-সাত লাখ করে পড়বে। টানাটানির সংসার, জমির দালালি করে আর কত হয়? বাবার পেনশনের টাকাতেই সংসারটা চলে। কিন্তু শ্যামদাকে খুন করার কথা কখনও মাথায় ছিল না, বিশ্বাস করুন।
—মাথায় এসেছিল কি না সেটা তো এখন আর জরুরি নয়…
—আমার কথাটা একটু শুনুন স্যার সঞ্জয়দা আংটিটা হাতে নিয়ে শ্যামদাকে বলল, ‘দাদা,
দু’-একদিন পরে ফেরত দিয়ে যাব এটা। টাকাপয়সার কথা সেদিনই ফাইনাল করব। আগে তো দেখি সত্যিই যত বলছেন, তত দাম কিনা।’ শ্যামদা এই শুনেই রেগে আগুন হয়ে চিৎকার শুরু করল, ‘চালাকি পেয়েছেন? ফেরত দিন আমার জিনিস। আমি বিক্রি করব না আংটি।’
—তারপর কী হল?
—আমার দিকে তাকিয়ে শ্যামদা বলল, ‘এসব কী ব্যাপার অরিন্দম? এ কেমন কাস্টমার নিয়ে এসেছ? আর এত লোক নিয়েই বা এসেছ কেন?’
—তারপর?
সঞ্জয়দা ঝাঁপিয়ে পড়ল শ্যামদার উপর। ওর সঙ্গে অম্লান-অমিত আর দুই বিজয়। আমিও যোগ দিলাম স্যার। তখনও ভাবিনি, শ্যামদাকে মেরেই ফেলা হবে। সঞ্জয়দা বলতে থাকল, ‘একে বাঁচিয়ে রাখলে আমাদের সর্বনাশ হবে। পুলিশকে সব বলবে। ধরা পড়বই কাল নয় পরশু।’ আমি ভাবলাম, ঠিকই তো বলছে… তারপর তো জানেন স্যার, সবাই মিলে হাত-পা বেঁধে, মুখে কাপড় গুঁজে…
