সময় লাগল না বেশি। পরের যে বাক্যটি সাত্যকির মুখ থেকে বেরল, তাতে শুভজিৎ বুঝলেন, শ্যামপ্রসাদ হত্যা মামলা গোয়েন্দাবিভাগের হাতে যাচ্ছে না। ভাগ্য ফেরাতে আংটিরও প্রয়োজন পড়ছে না আপাতত।
—স্যার, ওরাই বলেছিল, আংটির খদ্দের খুঁজে দিতে। আমি সুরজিৎদার কাছে নিয়ে এসেছিলাম। ওরা বলেছিল, শ্যামদার আংটিটার দাম নাকি এক কোটি। কিন্তু আমি যাইনি স্যার সেদিন, খুনে আমি ছিলাম না।
.
সাত্যকি মল্লিক। বয়স বছর চব্বিশ। মধ্য কলকাতার পোস্তা এলাকার বনেদি এবং সম্পন্ন পরিবারের সন্তান। আশৈশব সঙ্গী থেকেছে সচ্ছলতা। স্কুলজীবন কেটেছে পার্ক সার্কাসের ডন বসকোতে। সপ্রতিভ চেহারা, কথাবার্তায় চৌকস।
স্কুল-কলেজের পাট চোকানোর পর আপাতত কর্মহীন। কিন্তু বেকারত্ব কোনও আঁচড় বসাতে পারেনি আয়েশি জীবনযাপনে। অফুরান হাতখরচা, যার অর্ধেক ব্যয় হত ইয়ারদোস্তদের সঙ্গে খানাপিনায়, আর বাকি অর্ধেক রেসের মাঠে।
যে দুই বন্ধু নিয়মিত সাত্যকির সঙ্গী হত ঘোড়দৌড়ের মাঠে, তাদের মধ্যে একজনের নাম অরিন্দম। অরিন্দম ঘোষ ওরফে বাবলা। বয়স ২৬, টালিগঞ্জ রোডের বাসিন্দা। বিবাহিত, স্ত্রী এবং দেড় বছরের কন্যাসন্তান আছে। উপার্জন? টুকটাক জমি-বাড়ির দালালি করে যতটুকু হয়। অর্থাভাব ছিল। চটজলদি বড়লোক হওয়ার বাসনাও। অরিন্দমও ডন বসকোরই প্রাক্তনী।
রেসের মাঠে সাত্যকি-অরিন্দমের অন্য সঙ্গীর নাম অম্লান দত্ত। বয়স সবে কুড়ি পেরিয়ে একুশ। বাড়ি রসা রোডে। বেকার। অরিন্দম ঘোষের বন্ধু একসঙ্গে ফুটবল খেলার সূত্রে। পড়াশুনার সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করেছিলেন অম্লান। ‘বাবার হোটেলেই’ দিন গুজরান। বাকি দু’জনের পকেটের জোর ছিল না, সাত্যকিই জোগাতেন ফুর্তির রসদ। পোস্তা এলাকার তারাসুন্দরী পার্কে নিয়মিত আড্ডা বসত ত্রয়ীর। আর মাসে অন্তত দুটো শনিবার গন্তব্য ছিল রেসকোর্স।
রেসকোর্সেই ত্রয়ীর আলাপ শ্যামপ্রসাদ রায় বা ‘শ্যামদা’-র সঙ্গে। কথায় কথায় একদিন শ্যামপ্রসাদ তিনজনকে বলেন, তাঁর কাছে একটা বহুমূল্য আংটি আছে। পৈতৃক সূত্রে পাওয়া। ‘অ্যান্টিক ভ্যালু’ প্রচুর এ আংটির। আংটির মধ্যে একটা দুর্মূল্য পাথর বসানো। ওই পাথরের জন্যই আংটিটার দাম প্রায় এক কোটি। একা মানুষ, বয়স হয়েছে। আজ আছেন, কাল নেই। আংটিটা বিক্রি করে দিতে চান এবার, খদ্দের খুঁজছেন। আশি-নব্বই লাখ পেলেও দিয়ে দেবেন।
প্রথমে বিশ্বাস হয়নি সাত্যকি-অরিন্দমদের। এত দামের আংটি আবার হয় নাকি? শ্যামপ্রসাদ ব্যাপারটা আন্দাজ করতে পেরে বলেন, ‘তোমরা বাড়িতে এসো একদিন। দেখলে বুঝবে।’
—দেখে কী বুঝেছিলে?
বিধ্বস্ত সাত্যকির কাছে জানতে চান শুভজিৎ।
—বাড়িতে গিয়েছিলাম আমরা তিনজন। দেখে চোখ ছানাবড়া হয়ে গিয়েছিল স্যার। সত্যিই অমন আংটি দেখিনি আগে। শেপটা hexagonal, মধ্যের পাথরটা থেকে যেন আলো ঠিকরোচ্ছে। আমরা ভেবেছিলাম, শ্যামদা নির্ঘাত দামটা বেশি বাড়িয়ে বলছে, তবে এর দাম চল্লিশ-পঞ্চাশ লাখ হতেই পারে।
—তারপর?
—বলছি স্যার। আমরা সন্ধেবেলা পোস্তার পার্কে আড্ডা দিতাম প্রায় রোজ। সঞ্জয়দাও থাকত।
—কে সঞ্জয়?
—সঞ্জয়দা। ব্যান্ডেলের ছেলে। আমাদের চেয়ে বয়সে অনেক বড়। বড়বাজারে আসত টুকটাক ব্যবসার কাজে। এখানে ওর এক আত্মীয়ের বাড়িও আছে। পার্কেই আলাপ।
—বেশ…
—সঞ্জয়দাকে বললাম। সব শুনে বলল, ‘এক কোটি হয়তো হবে না, কিন্তু যদি ধর পঁচিশ-তিরিশ লাখও হয়, আংটিটা হাতাতে পারলে আমাদের ভাগ্য খুলে যাবে। তোরা ভদ্রলোককে বল, এখানে আংটিটা নিয়ে আসতে কোনও একদিন। বল, কাস্টমার পাওয়া গেছে। আংটি দেখতে চাইছে। আমি লোক ফিট করছি, যারা রাস্তায় ছিনতাই করে নেবে আংটিটা। নিয়ে পরে আমাদের দিয়ে দেবে। আর আমরাও কেস খাব না। ছিনতাই যারা করবে, তাদের কয়েক হাজার টাকা ঠেকিয়ে দেব।’
—তারপর?
—শ্যামদাকে রেসকোর্সে বললাম একদিন। উনি বললেন, অত দামি জিনিস বাইরে নিয়ে বেরবেন না। কাস্টমারকে বাড়িতে আসতে বলো।
—তোমরা কী করলে এরপর?
—সঞ্জয়দা সব শুনে বলল, ‘এক কাজ কর। চল, ওঁর বাড়ি যাই। আমি কাস্টমার সাজব। আমাকে তো চেনে না। ভালয় ভালয় দিলে ভাল, নয় তো কেড়ে নেব। আংটিটা পেলে লাইফ বদলে যাবে আমাদের।’
—হুঁ…
—রেসকোর্সে শ্যামদার সঙ্গে দেখা হল গত শনিবার।
—মানে ১১ তারিখ?
—তাই হবে স্যার, তারিখ মনে নেই। শ্যামদাকে বললাম, ‘কাস্টমার পাওয়া গেছে। আপনার বাড়িতে আনব?’ উনি বললেন, ‘ঠিক আছে। মঙ্গলবার বিকেলে আনো।’
—মানে চোদ্দো তারিখ।
—তাই হবে স্যার। কিন্তু আমার ব্যাপারটা ভাল লাগছিল না শুরু থেকেই। আমি বলে দিয়েছিলাম, যেতে পারব না। নেমন্তন্ন আছে। আমি যাইনি স্যার।
—যাওনি?
—না স্যার, বিশ্বাস করুন। সঞ্জয়দা আরও চারজনকে জুটিয়েছিল।
—কোন চারজন?
—বলছি। কালো স্যান্ট্রো করে ওরা শ্যামদার বাড়ি গিয়েছিল স্যার। আগের রাতে পার্কে সব কথা হয়েছিল। পোস্তাতে একজন ব্যবসায়ী আছে। রাজেশ নাম। ওর ড্রাইভারের নাম রাম। ওই গাড়ি করে শ্যামদার বাড়ি নিয়ে গিয়েছিল।
—চারজনের একজন হল, বাকি তিন?
—দু’জনের নাম বিজয়। একজন বিজয় রায়। হাওড়ায় বাড়ি। লিলুয়া বোধহয়। আরেকজনের পদবি সিং। বিজয়বাহাদুর সিং। বড়বাজারে শাড়ির দোকানে অর্ডার সাপ্লাই করে। সঞ্জয়দা চিনত এদের।
