থানা থেকে বেরিয়ে মন একটু খারাপই হয়ে যায় শুভজিতের। গোয়েন্দাপ্রধানের এই ‘জানতে চাওয়া’-র অর্থ বুঝতে অসুবিধে হয় না। অগ্রগতি যদি দ্রুত না হয়, লালবাজারের গোয়েন্দাবিভাগ দায়িত্ব নেবে তদন্তের। স্বাভাবিক, এটাই প্রথা। হইচই ফেলে-দেওয়া মামলায় দ্রুত কিনারা থানাস্তরে সম্ভব না হলে এটাই হয়ে থাকে।
শুভজিৎ থাকতেন উলটোডাঙার পুলিশ আবাসনে। বাড়ি থেকে থানায় যাতায়াত মোটরসাইকেলে। সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ ধরে গিরিশ পার্কের কাছাকাছি পৌঁছনোর সময় শুভজিতের মনে হল, একবার সুরজিতের ঠেকে এক কাপ চা খেয়ে ফেরা যাক। একটু আড্ডা দিলে মাথাটা হালকা হতে পারে।
সুরজিত রায়ের সঙ্গে দীর্ঘদিনের পরিচয় শুভজিতের। ভদ্রলোক বেশ কিছুটা ছোট বছর চল্লিশের শুভজিতের থেকে। গিরিশ পার্ক এলাকায় একটা শরীরচর্চার আখড়া চালান। যেখানে রোজ সন্ধেয় ছেলেছোকরারা আসে ঘাম ঝরাতে। সুরজিতের গ্রহরত্নের কারবারও আছে একটা। খুব বড়সড় কিছু ব্যবসা নয়, মাঝারিই। সুরজিতের ঠেকে মাঝে মাঝে অফিসফেরত ঢুঁ মেরে একটু গল্পগুজব করে আসেন শুভজিৎ।
—আরে শুভজিৎদা, অনেকদিন পরে? খবর কী?
—এই তো, চলছে ভাই। আসা হয়নি মাসখানেক হল, ভাবলাম একটু চা খেয়ে যাই।
—বেশ করেছ, কিন্তু তোমাকে এত উস্কোখুস্কো দেখাচ্ছে কেন? শরীর ঠিক আছে তো?
—শরীর তো ঠিকই আছে, মনটাই বিগড়ে আছে। একটা খুনের মামলা নিয়ে ফেঁসে আছি। একজন বয়স্ক মানুষ নিজের ফ্ল্যাটে…
—হ্যাঁ হ্যাঁ, কাগজে দেখেছি। ওটা তুমি ইনভেসটিগেট করছ?
—আর বলো কেন? তিনদিন হয়ে গেল, কোনও লিড নেই।
—সবে তো তিনদিন, পেয়ে যাবে ঠিক।
—সব অ্যাঙ্গল মোটামুটি দেখা হয়ে গেছে। তবু এগোনো যাচ্ছে না। এসব মামলায় কী জানো, শুরুর দিকে ‘লিড’ পেয়ে গেলে ভাল। যত দেরি হয়, তত মুশকিল হয়ে যায়। একটা কেসের উপরই তো আর দিনের পর দিন ফোকাস করা যায় না।
—হুঁ, নাও, চা খাও।
চায়ের কাপে আনমনা চুমুক দেন শুভজিৎ। চানাচুরের প্লেট এগিয়ে দিতে দিতে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন সুরজিৎ।
—অত চিন্তা কোরো না। হয়ে যাবে ঠিক। এক এক সময় লাক খারাপ যায়।
—যা বলেছ। কপাল খারাপ। নির্ঘাত রাহুর দৃষ্টি পড়েছে, বুঝলে? দাও না একটা ভাল দেখে আংটি-টাংটি।
সুরজিৎ হেসে ফেলেন।
—সে না হয় দেব দেখেশুনে। আংটির কথায় মনে এল, যা দিনকাল পড়েছে! সেদিন যা কাণ্ড হল…
—কী?
—আর বোলো না। এই তো দিনতিনেক আগে হবে, দুটো ছেলে একটা আংটি নিয়ে এখানে এসে বলে কী, ‘এটার দাম এক কোটি টাকা। আপনার তো স্টোনের ব্যবসা আছে। খদ্দের জোগাড় করে দিতে পারেন?’
—কোটি টাকা?
—আরে, আমি তো হাঁ! বলে কী! আংটিটা অবশ্য সত্যিই অন্যরকম দেখতে। কারুকাজ আছে অনেক। মধ্যের পাথরটা বেশ বড়, আর খুব ঝকমকে। দেখলে হিরে বলে ভুল হতে পারে। তবে হাতে নিয়ে একটু উলটেপালটে দেখেই বুঝলাম, খুব দামি কিছু নয়। হিরে তো নয়ই। দাম মেরেকেটে ওই দশ-বিশ হাজার হতে পারে ম্যাক্সিমাম।
আংটির গল্পে কোনও উৎসাহ পান না শুভজিৎ। স্রেফ ভদ্রতার খাতিরেই বলেন, ‘তারপর?’
—তারপর আর কী? বললাম, ‘ভাই, এর দাম এক লাখও হবে না, কোটি তো অনেক দূরের ব্যাপার। বড়জোর হাজার দশেক পেতে পারো।’ শুনে মুখ চাওয়াচাওয়ি করল দু’জন। বললাম, ‘কোথায় পেয়েছ এটা?’
—কী বলল?
—কিছু বলল না। হনহন করে বেরিয়ে গেল।
—চোরাই মাল হতে পারে। কোথাও থেকে হাতিয়েছে, তারপর এখানে-সেখানে আগডুম-বাগডুম দাম হেঁকে বাজিয়ে দেখছে।
—দেখেশুনে কিন্তু চোর মনে হয়নি। ভদ্রঘরের ছেলে বলেই মনে হল।
—আগে দেখেছ ওদের? মানে আগে এসেছিল কখনও এখানে?
—না না, আগে দেখিনি। কেন?
—না, এমনিই। চেহারার ডেসক্রিপশনটা ভাল করে জেনে নিতাম আর কী, ডিডি-তে একটা anti-fraud সেকশন আছে, ওরা এসব গ্যাং-এর ব্যাপারে খবরটবর রাখে, জাস্ট বলে রাখতাম। যাক গে ছাড়ো, উঠি আজ…
—আমার তো খুব ডিটেলে মনে নেই, তবে দাঁড়াও দাঁড়াও, সাত্যকিকে ডাকি। সাত্যকির সঙ্গেই তো এসেছিল ওরা। সাত্যকি, এই সাত্যকি!
লাগোয়া ঘরটায় চলছিল যুবকদের রোজকার শরীরচর্চা। সেখান থেকে সাড়া দেয় এক যুবক।
—হ্যাঁ সুরজিৎদা …
—আয় না একবার এখানে…
পুলিশের পোশাকে শুভজিৎকে দেখে হঠাৎই একটু থমকে যায় যুবক। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায় সুরজিতের দিকে।
—হ্যাঁ রে, ওই সেদিন তোর সঙ্গে দুটো ছেলে এসেছিল না… ওই যে রে, আংটি নিয়ে একটা…
‘আংটি’ শব্দটা সুরজিৎ উচ্চারণ করার সঙ্গে সঙ্গেই চোখমুখ সাদা হয়ে যায় সাত্যকির। শুভজিৎ লক্ষ করেন, হাত-পা কাঁপছে ছেলেটির। কী হল হঠাৎ? সুরজিৎও ঘাবড়ে যান সাত্যকির চেহারা দেখে।
—শরীর খারাপ লাগছে নাকি রে? ইনি টালিগঞ্জ থানার অফিসার, ওই ছেলেদুটোর ব্যাপারে জানতে চাইছিলেন।
বলতে না বলতেই হাউহাউ করে কেঁদে ফেলে সাত্যকি। কান্নায় জড়িয়ে যায় ভয়ার্ত গলার স্বর।
—স্যার… আমি যাইনি সেদিন। খুনে আমি ছিলাম না! বিশ্বাস করুন, আমি যাইনি ওদের সঙ্গে! ওরা মেরেছে।
শুভজিৎ শুনলেন, এবং উঠে দাঁড়ালেন চেয়ার ছেড়ে। ক্লান্তি অন্তর্হিত। শ্রান্তি নিরুদ্দেশ। খুন? ওরা? সেদিন? সুরজিৎ কিছু বলতে যাওয়ার আগেই থামিয়ে দিলেন।
—সুরজিৎ, বাকিদের চলে যেতে বলো আজ। আরেক কাপ চা হলে ভাল হয়। এই ছেলেটার সঙ্গে কথা বলার আছে। সময় লাগবে।
