—তিনটে ছেলে? কেমন দেখতে? আগে দেখেছিলেন কখনও ওদের?
—স্যার, সেভাবে তো খেয়াল নেই। হাজার হাজার লোক আসে এখানে। বিপ্লবদা বললেন আর আপনি জানতে চাইছেন বলে ভেবেটেবে যেটুকু মনে পড়ছে, বয়স বেশি নয় ওদের। এই ধরুন তেইশ-চব্বিশ হবে। দু’জনের ছিপছিপে চেহারা। একজন একটু গোলগাল। মাঝারি হাইট সবার। এর বেশি মনে নেই স্যার।
যতটুকু মনে ছিল মণিময়ের, তা দিয়ে ‘Portrait Parle’ হয় না, হয় না চিহ্নিতকরণের জন্য ছবি আঁকানো। ছিপছিপে-গোলগাল-কমবয়সি-মাঝারি হাইট, এ দিয়ে হয়? এমন শ’খানেক লোক তো এই রেসকোর্সেই এ মুহূর্তে পাওয়া যাবে। অবশ্য চেহারার বিশদ বিবরণ পেলেই যে সূত্র মিলত কোনও, এমন না-ও তো হতে পারে। তিনটে ছেলের সঙ্গে পরপর দুটো শনিবার শ্যামপ্রসাদ গল্প করেছিলেন গ্যালারিতে, কী এমন অস্বাভাবিক? মণিময় হয়তো একটু বেশিই চিন্তা করে ফেলেছেন। এমন হয়, অভিজ্ঞতায় দেখেছেন শুভজিৎ। সবাই গোয়েন্দা হতে চায়। এবং সুযোগ পেলে কল্পনার উড়ান ব্যস্ত হয়ে পড়ে দুইয়ে দুইয়ে চার করতে।
—মণিময়বাবু, চললাম আজ। একটু চোখকান খোলা রাখবেন প্লিজ়। ওই ছেলেগুলোকে আবার যেদিন দেখবেন, সঙ্গে সঙ্গে ফোন করবেন।
—শিয়োর স্যার।
শুভজিৎ হাঁটতে শুরু করেন রেসকোর্সের মেন গেটের দিকে। নতুন দৌড়ের প্রস্তুতি ততক্ষণে শুরু হয়ে গিয়েছে। ধারাভাষ্যকার তারস্বরে উত্তেজনা আমদানি করছেন আপ্রাণ, ‘There you are! Lightning speed lined up at No. 1, Whispering Beauty at number 2 and watch out for Sweet Silver at 3…’
অন্য ঘোড়া, অন্য দৌড়।
.
১৯ অগস্ট, রবিবার।
শুধু একটা কেস নিয়ে পড়ে থাকলে চলে না থানার অফিসারদের। অন্য কেসের ডায়েরি লেখা আছে। ‘ল অ্যান্ড অর্ডার’ ডিউটি আছে। রোজকার রুটিন কাজ আছে। রবিবার ‘অফ’ ছিল। তবু থানায় এসেছেন শুভজিৎ বকেয়া কাজ সারতে। যা যা বেরিয়ে এসেছে এখনও পর্যন্ত খুনের তদন্তে, বাকি কাজ সেরে ঠান্ডা মাথায় সাজাতে থাকেন শুভজিৎ।
এক, শ্যামপ্রসাদের চরিত্র সম্পর্কে যা জানা যাচ্ছে রেস ছাড়া অন্য আসক্তি ছিল না। মহিলাঘটিত কিছু পাওয়া যাচ্ছে না।
দুই, শ্যামবাবুর অর্থকরী সমস্যা ছিল রেসের মাঠে বেপরোয়া টাকা ওড়ানোর ফলস্বরূপ। চিলেকোঠার ঘর সহ ছাদটা বেচে দেওয়ার কথা ভাবছিলেন। বিলাসী জীবনযাপন করতেন না।
এই লোককে খুন করে আর্থিক ভাবে লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা শূন্য। ফ্ল্যাটের ফরেনসিক পরীক্ষাও বলছে, আলমারি-ড্রয়ার বা অন্য জিনিসপত্র ছোঁয়ইনি খুনি বা খুনিরা। ছোঁয়ার মতো দামি কিছু ছিলই না আদপে। ‘মার্ডার ফর গেইন’ হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণতম।
তিন, সন্দেহভাজনদের তালিকা তৈরি করতে গিয়েই তো হোঁচট। কাকে সন্দেহ করবেন? প্রতিবেশীদের ‘অ্যালিবাই’ যাচাই করা হয়ে গেছে প্রযুক্তি-প্রমাণে। বিপ্লববাবু? যা বলেছেন, অক্ষরে অক্ষরে সত্যি, জানাচ্ছে মোবাইল-মানচিত্র। রইল বাকি রেসকোর্সের ওই তিনটে ছেলে। যাদের সম্পর্কে ধারণা করারই অবকাশ ঘটেনি। সন্দেহ তো পরের কথা।
চার, এবং সবচেয়ে মোক্ষম চার, মোটিভ? তদন্ত দু’ভাবে হয়। ‘কে’ থেকে ‘কেন’? আর, ‘কেন’ থেকে ‘কে’? অনেক মামলায় সন্দেহভাজন অপরাধী ধরা পড়ে যায় ঘটনাপরম্পরায় বা তথ্যসূত্রে। অপরাধের কার্যকারণ জানা যায় জেরায়। এসব ক্ষেত্রে আগে ‘কে’, পরে ‘কেন’। এ তদন্ত সরলরৈখিক।
জটিলতা আসে তখনই, যখন কূলকিনারা পাওয়া যায় না অপরাধীর, সংগৃহীত তথ্যের চুলচেরা বিশ্লেষণে পাওয়া যায় না কোনও সম্ভাব্য ইঙ্গিত। এই অবস্থাতেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ‘মোটিভ’। ‘কেন’ থেকে শুরু হয় ‘কে’-র সন্ধান। কেন খুন হলেন শ্যামপ্রসাদ? ‘কে মারবে’-র থেকেও বড়, কেন মারবে? টাকা ছিল না, যৌন-ঈর্ষার গল্প ছিল না, ব্যক্তিগত শত্রুতারও হদিশ পাওয়া যাচ্ছে না কোনও। তাহলে?
.
২০ অগস্ট, সোমবার।
অপরাধ সে যেমনই হোক, তদন্তের গতিপথ কিছু ক্ষেত্রে ধার ধারে না যুক্তি-তর্কের। তোয়াক্কা করে না প্রথাগত ব্যাকরণের। সব নিয়ম, সব পদ্ধতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কখনও কখনও কিনারাসূত্র অভাবিত সমাপতনে এসে পড়ে তদন্তকারীর নাকের ডগায়। শুধু সিনেমাতেই নয়, বাস্তবেও ঘটে এমন। কদাচিৎই, কিন্তু ঘটে।
সিনেমার প্রসঙ্গ উঠলই যখন, ‘সোনার কেল্লা’ ভাবুন। জয়পুরের রাস্তায় অটোসফরে লালমোহনবাবুর যদি চোখে না পড়ত সোনারংয়ের পাথরবাটির দোকান, যদি না দৃষ্টি আকর্ষণ করতেন ফেলুদার, জয়সলমিরের কথা মাথায়ই আসত না ‘সোনার কেল্লা’-র সম্ভাব্য অবস্থান হিসেবে। ওই চোখে পড়াটা এবং দুয়ে-দুয়ে চারের সম্ভাবনার আবছা আভাস পাওয়ামাত্র অটো থামিয়ে প্রদোষ মিত্রের নেমে পড়া, রহস্যভেদে অন্যতম প্রধান deductive moment ওটাই। ‘Hajra’ আর ‘Hazra’-র তফাত তো আরও পরে। সার্কিট হাউসে, দুম করে ডক্টর হাজরার মুকুলকে নিয়ে বারমের রওনা হয়ে যাওয়ার খবর মন্দার বোসের থেকে পাওয়ার পর।
রক্তমাংসের গোয়েন্দাদের ভাগ্যে এহেন মুহূর্ত উদয় হয় কালেভদ্রে। কিন্তু যখন হয়, তখন ‘কোথা হইতে কী হইয়া’ যায়, হার মেনে যায় কল্পনার রহস্যকাহিনিও। ঠিক যেমনটা ঘটল ২০ অগস্টের সন্ধেয়।
রবিবার সারাদিন কাজ করেছেন। সোমবারও সাততাড়াতাড়ি এসেছেন থানায়, ডিসি সাউথের মাসিক ক্রাইম কনফারেন্সের প্রস্তুতি-পরিসংখ্যান তৈরি করতে সাহায্য করেছেন ওসি-কে। বড়বাবু সদয় হয়ে ছেড়ে দিয়েছেন সন্ধের মুখে, ‘বাড়ি যাও আজ। অত চাপ নেওয়ার কিছু নেই। সব কেস সাতদিনের মধ্যেই ক্র্যাক করতে হবে, এমন কথা নেই। দেখা যাক আর কয়েকদিন। ডিসি ডিডি ফোন করেছিলেন একটু আগে। ডেভেলপমেন্ট কিছু হল কিনা, জানতে চাইছিলেন।’
