সূত্র বলা যায় না সে অর্থে, কিন্তু একটা অজানা তথ্য পাওয়া গেল বাহান্ন বছরের বিপ্লববাবুর কাছে। ছোটখাটো ব্যবসা করেন। স্ত্ৰী-কন্যা নিয়ে সংসার। বিপ্লব জানালেন, শ্যামপ্রসাদের একটাই নেশা ছিল। ঘোড়দৌড়ের। বিপ্লববাবুও একই নেশায় আসক্ত এবং রেসকোর্সে যাতায়াতের সুবাদে ঘোড়দৌড়ের মাঠেই বছরদুয়েক আগে আলাপ শ্যামপ্রসাদের সঙ্গে। ফোনালাপ যেটুকু হত, সে ওই ঘোড়া নিয়েই। পরের শনিবারে কী কী রেস আছে, কোনটায় কোন ঘোড়া ফেভারিট, কত টাকা কোন রেসে কোন ঘোড়ার উপর লাগানো উচিত বা অনুচিত, এইসব।
রেসভাগ্য কেমন ছিল শ্যামপ্রসাদের? বিপ্লব জানালেন, ইদানীং কপাল মন্দ যাচ্ছিল শ্যামপ্রসাদের। গত কয়েক মাসে হারছিলেন লাগাতার। এবং মরিয়া হয়ে আরও বেশি টাকা লাগাচ্ছিলেন পরের রেসে। ভাগ্য তবু সহায় হচ্ছিল না কিছুতেই।
—জানেন শুভজিৎবাবু, আমি বারণ করেছিলাম। বুঝিয়েছিলাম, একটু বুঝেশুনে খেলতে। শ্যাম শুনত না। বলত, এখানে আজ যে ফকির, কাল সে রাজা।
—শেষ কবে দেখা হয়েছিল আপনার সঙ্গে?
—লাস্ট দুটো শনিবার যাইনি। শরীরটা ভাল যাচ্ছিল না। তার আগের শনিবার শেষ দেখা হয়েছিল। সেদিনও আমি বারবার বললাম ‘প্লেস’ খেলতে। কিন্তু শ্যামের জেদ, ও সেই ‘উইন’-ই খেলবে।
—‘প্লেস’ মানে?
—ওটা রেসের মাঠের ভাষা। ধরুন ৫ নম্বর ঘোড়ার উপর ‘প্লেস’ খেললেন। মানে, প্রথম তিনটে ‘প্লেস’, ফাস্ট-সেকেন্ড-থার্ডের মধ্যে আপনার ঘোড়া থাকলে লাভ। পাঁচশো লাগিয়ে হয়তো ছ’শো-সাড়ে ছ’শো এল।
—আর ‘উইন’?
—‘উইন’ মানে ৫ নম্বর জিতবেই ধরে আপনি টাকা লাগালেন। জিতলে লাগানো টাকা ডবল হয়ে যেতে পারে প্রায়, কিন্তু হারলে পুরো টাকাই জলে। ‘প্লেস’ খেললেও হারতেই পারেন, তবে ন্যাচারালি ঝুঁকি কম। কিন্তু ওই যে, শ্যামের জেদ…
—তা এত যে টাকা জলে যাচ্ছিল, সমস্যা হচ্ছিল না?
—হচ্ছিল তো। শ্যামের ওকালতির পসার তো তেমন একটা ভাল ছিল না। পৈতৃক সূত্রে পাওয়া ফ্ল্যাটগুলো বেচে ভালই টাকা পেয়েছিল। ব্যাংকে ছিল। সেই ভাঙিয়েই চলত। কিন্তু ওভাবে কি অনন্তকাল চলে বলুন? ইদানীং বলত, বাড়ির ছাদ আর চিলেকোঠার ঘরটা বেচে দেবে। খদ্দের খুঁজতে বলেছিল। এ নেশা ভয়ংকর নেশা শুভজিৎবাবু। কপাল খারাপ হলে রাজাকেও পথের ভিখিরি বানিয়ে ছাড়ে। কাগজে শ্যামের খবরটা দেখেছি। খুব খারাপ লেগেছে। কে মারল ওভাবে? জানতে পারলেন কিছু?
—সেটাই তো বোঝার চেষ্টা করছি। আপনার কী মনে হয়?
—আমি তো অবাক হয়ে গেছি খবরটা শুনে। শ্যামের কোনও শত্রু ছিল বলে তো মনে হয় না। টাকাপয়সাও যে অনেক ছিল, তাও নয়।
—অন্য কোনও দোষ, মানে মহিলা-টহিলা…
—দেখুন, আমি শ্যামকে দু’বছর ধরে জানি। ওঁর নারীবিষয়ে কোনও আগ্রহই ছিল না। ধ্যানজ্ঞান একটাই ছিল, রেসের মাঠ।
—একবার রেসকোর্সে যেতে চাই। কবে গেলে ভাল হয় বলুন তো? কথাটথা বলতে হবে একটু ওখানের স্টাফদের সঙ্গে।
—কালই যান না। আজ ১৭, শুক্র। কাল শনি। কাল চারটে রেস। দুপুর দুপুর চলে যেতে পারেন। আমি একজনের নাম-নম্বর দিয়ে দিচ্ছি। মণিময়। ওখানের মাঝামাঝি স্তরের স্টাফ। ভাল ছেলে। আপনাকে সব ঘুরিয়ে দেখাবে।
—আপনি যাবেন না কাল?
—না, কাল বাড়িতে লোকজন আসার কথা আছে কিছু। আর আমি এভরি স্যাটারডে যাইও না। শ্যাম রেগুলার ছিল। আমি মাসে বড়জোর দু’বার।
.
১৮ অগস্ট, শনিবার। রেসকোর্সে ভরদুপুর।
ঘোড়াগুলো ছুটছে। পাশাপাশি, ঊর্ধ্বশ্বাসে। ধুলো উড়ছে ট্র্যাকে এলোমেলো। শুরুর দিকে একে-অন্যের ঘাড়ে নিশ্বাস ফেলা, তিরিশ-চল্লিশ মিটার পরেই ছবিটা বদলে গিয়ে ছিটকে বেরনো তিন-চারজনের দলের। এবং ফিনিশিং পয়েন্টে সবার আগে পৌঁছনোর মরণবাঁচন দৌড়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে গ্যালারির শব্দব্রহ্ম।
শুভজিৎ দেখতে থাকেন উদাসীন। এই প্রথম আসা রেসের মাঠে। কে জানে আর কতবার আসতে হবে? অথচ জায়গাটা কী সুন্দর! এত সবুজ চারদিকে। কী অপূর্ব লাগে এখান থেকে ভিক্টোরিয়াকে! ঘোড়দৌড়ে ন্যূনতম রুচি নেই শুভজিতের, কখনও ছিলও না। তবু ভাবেন, এই কেস মিটে গেলে এমনিই আর একদিন এলে হয়। খুনের তদন্তে নয়। স্রেফ সবুজ শুষে নিতে। কোনও এক উইকডে-তে, যেদিন কোনও দৌড় থাকবে না।
মণিময় এসে পড়েছেন। মধ্যতিরিশের সপ্রতিভ যুবক। চোখেমুখে বুদ্ধির ছাপ আছে। শুভজিৎ কোনও ভণিতা করেন না।
—বিপ্লববাবুর থেকে আপনার নম্বর পেয়েছি। বিপ্লব ঘোষ।
—হ্যাঁ হ্যাঁ স্যার, উনি ফোন করেছিলেন সকালে। শ্যামদার খুনের ব্যাপারে বলছিলেন…
—হ্যাঁ, সেই ব্যাপারেই আসা। উনি তো নিয়মিত আসতেন এখানে।
—ইয়েস স্যার, আমি এখানে বছরচারেক আছি। হি ওয়াজ় আ রেগুলার। প্রতি শনিবার দেখা হত। একটু ইনট্রোভার্ট প্রকৃতির লোক ছিলেন। বেশি কথা হত না।
—বুঝলাম। গত কয়েক সপ্তাহে বিশেষ কিছু লক্ষ করেছিলেন ওঁর ব্যবহারে? মানে যতটুকু কথা হত, যতটুকু বোঝা যায় বাইরে থেকে?
মণিময়ের উত্তরে স্নায়ু সামান্য সক্রিয় হয়ে ওঠে শুভজিতের।
—হ্যাঁ স্যার। বিপ্লবদা সকালে ফোন করার পর থেকেই ভাবছিলাম এটা। গ্যালারিতে আমাদের যে স্টাফরা থাকে, তারাও সবাই প্রায় চিনত শ্যামদাকে। ওরাও বলল।… জানি না এটা জরুরি কিনা…
—কী?
—তেমন কিছু নয়। আমার কাজটা বেসিক্যালি রেসের সময় গ্যালারিতে রেসকোর্সের কর্মীদের উপর খবরদারি করা। শেষ দুটো শনিবার শ্যামবাবুর সঙ্গে তিনটে ইয়ং ছেলেকে বসতে দেখেছিলাম। গল্পগুজব করছিলেন খুব। একটু অবাকই হয়েছিলাম। শ্যামবাবু তো বড় একটা মিশুকে প্রকৃতির ছিলেন না।
