শুভজিৎ তবু খুঁচিয়েছিলেন মহিলাকে, ‘আচ্ছা ম্যাডাম, লাস্ট কোয়েশ্চেন, মানে, মিস্টার রায়ের কি চরিত্রের কোনও দোষ ছিল, আই মিন অন্য কোনও মহিলার সঙ্গে…?’ দৃশ্যতই বিরক্ত কৃষ্ণা থামিয়ে দিয়েছিলেন মাঝপথে। উত্তর দিয়েছিলেন কেটে কেটে, ‘যতদিন একসঙ্গে ছিলাম, চোখে পড়েনি অমন কিছু। পরের কথা বলতে পারব না।’ শুভজিৎ আর কথা বাড়াননি।
.
১৭ অগস্ট, শুক্রবার।
দেহ উদ্ধারের পরের দিনটা, সকাল থেকে সন্ধে অবধি শুভজিৎ কাটিয়েছিলেন ২৪এ এবং ২৪বি পার্ক সাইড রোডের ফ্ল্যাটগুলোর বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে। প্রত্যেকের বয়ান নিয়েছিলেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে। ১৪ তারিখ বিকেল থেকে রাত, কে কোথায় ছিলেন, খোঁজ নিয়েছিলেন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। পাতা ভরতি হয়ে গিয়েছিল নোটবুকের। দিশা তবু ছিল দূর অস্ত। তথ্য অবশ্য মিলেছিল কিছু।
তথ্য বলতে, শ্যামপ্রসাদের বাবা সফল ব্যবসায়ী ছিলেন। কলকাতায় সম্পত্তি করেছিলেন প্রচুর। একাধিক বাড়ি কিনেছিলেন শহরে। তিন ভাইকে ভাগ করে দিয়েছিলেন অস্থাবর সম্পত্তি। পৈতৃক সম্পত্তির ভাগ হিসেবে শ্যামপ্রসাদ পেয়েছিলেন পার্ক সাইড রোডের দুটো তিনতলা বাড়ি। প্রতি তলায় একটা করে ফ্ল্যাট। মোট ছ’টা। যার পাঁচটা বেচে দিয়েছিলেন। নিজে রেখেছিলেন একটা, ২৪এ-র তিনতলা।
পাড়াপ্রতিবেশীরা শ্যামপ্রসাদকে অন্তর্মুখী প্রকৃতির মানুষ হিসেবেই জানতেন। এ পাড়ায় ছিলেন প্রায় বছর কুড়ি। কারও সঙ্গেই ঘনিষ্ঠতা ছিল না। কোর্টে যাতায়াতের পথে বা বাজারহাট করার সময় পরিচিত কারও সঙ্গে দেখা হলেও ‘কী কেমন আছেন?’ আর ‘হ্যাঁ, চলছে’-র গণ্ডি পেরনোয় ঘোর অনীহা ছিল ভদ্রলোকের।
নিজের মতো থাকতে ভালবাসতেন। নিজে রান্না করে খেতেন। নিজেই বাসন মাজতেন, কাপড় কাচতেন। খবরের কাগজ নিতেন না। কাজের লোক বলতে কেউ ছিল না। একজন শুধু এসে ঘরদোর-বাথরুম পরিষ্কার করে দিয়ে যেতেন, সপ্তাহে দু’বার। শুধু ওঁর ফ্ল্যাটের নয়, সবারই। এই সাফাইকর্মীই ১৬ অগস্ট সকালে সাফসুতরো করতে এসে দরজার বাইরে থেকে দুর্গন্ধ পান এবং হইচই করে লোক জড়ো করেন।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বাকি পাঁচটা ফ্ল্যাটের বাসিন্দাদের কাউকে সন্দেহ করার কোনও কারণ খুঁজে পেলেন না শুভজিৎ। তবে আরও খোঁজখবর করার আছে। একদিনে আর কী-ই বা বোঝা যায়? সোর্স লাগাতে হবে। যে যা বলেছেন সেদিন নিজের গতিবিধির ব্যাপারে, সেটা যাচাই করতে হবে।
এই যাচাই করার প্রক্রিয়াটা কী যে ভীষণ পরিশ্রমসাধ্য হত বছর বারো-তেরো আগে হলে! ভাগ্যিস মোবাইল ফোন ভারতে এসে গেছে নয়ের দশকের মাঝামাঝি, ১৯৯৫-তে। প্রাক্-মোবাইল যুগে ‘অ্যালিবাই’ যাচাই করতে কত না কাঠখড় পোড়াতে হত সেসময়ের গোয়েন্দাদের, ভাবলেই আঁতকে উঠতে হয় মোবাইল-উত্তর যুগের তদন্তকারীদের। যে যখন যেখানে ছিল বলেছে, সেখান থেকে অমুক সময়ে বেরিয়ে তমুক জায়গায় গিয়েছিল বলে দাবি করছে, সবটা মিলিয়ে নিতে হত জায়গায় গিয়ে, প্রত্যক্ষদর্শীদের খোঁজ করে।
আর মোবাইল এসে যাওয়ার পর? প্রযুক্তির আনুকূল্যে দ্রুত মিলবে CDR (Call Details Record) এবং টাওয়ার লোকেশন। যা নিমেষে প্রশ্নাতীত জানিয়ে দেবে, কে কখন কোথায় ছিলেন, কতক্ষণ ধরে কার সঙ্গে কথা বলেছেন বা মেসেজ চালাচালি করেছেন। কেউ মিথ্যে বলার চেষ্টা করলেই চেপে ধরা যায় নিমেষে, ‘টাওয়ার তো অন্য কথা বলছে!’
সন্ধেবেলা থানায় ফিরে নোটবই খোলেন শুভজিৎ। টাওয়ার সত্যিই অন্য কথা বলছে কিনা, জেনে যাওয়া যাবে স্বচ্ছন্দে। সবার মোবাইল নম্বর নিয়েছেন শুভজিৎ। পাঠানোর ব্যবস্থা করেছেন সংশ্লিষ্ট ‘সার্ভিস প্রোভাইডার’-দের কাছে। CDR হাতে এসে যাবে ঘণ্টাখানেকের মধ্যে। শুধু প্রতিবেশীদের নয়, আসবে শ্যামপ্রসাদের মোবাইল কলরেকর্ডও। যে বা যারাই ফ্ল্যাটে ঢুকে খুনটা করেছিল, তারা ফোনটা নিয়ে গেছে ওঁর। ফ্ল্যাটের কোথাও পাওয়া যায়নি। তারপর থেকে ফোন বন্ধ। রেকর্ডটা পেলে একটা ধারণা তো অন্তত হবে, ওঁর পরিচিত বৃত্তে কারা ছিলেন। আর কে বলতে পারে, অধরা সূত্রও চলে আসবে না হাতের মুঠোয়?
একগুচ্ছ কলরেকর্ডের পাতার পর পাতা ঘেঁটেঘুঁটে কাজের মধ্যে জানা গেল এই, প্রতিবেশীরা কেউ মিথ্যে বলেননি। যে যা বলেছিলেন ১৪ অগস্টের গতিবিধি নিয়ে, মিলছে হুবহু। এতেই যে সটান সন্দেহের বৃত্তের বাইরে ছিটকে গেলেন ওঁরা, এমন নয়। হতেই পারে, কেউ লোক লাগিয়ে খুনটা করিয়েছেন, এবং নিজের ‘অ্যালিবাই’ নিশ্ছিদ্র রেখেছেন। হতেই পারে, কারও সঙ্গে এমন কিছু শত্রুতা ছিল শ্যামপ্রসাদের, যা এখনও অজানা। সবে তো চব্বিশ ঘণ্টা হয়েছে।
শ্যামপ্রসাদের কলরেকর্ড বলছে, ১৪ তারিখ সকালে কোর্টে গিয়েছিলেন। বিকেল চারটে নাগাদ ফিরে আসেন বাড়িতে। সেই থেকে বাড়িতেই ছিলেন, বেরননি আর। গত এক মাসের কথোপকথন আর এসএমএস-এর খতিয়ান জানাচ্ছে, মোবাইলে দীর্ঘক্ষণের আলাপচারিতায় অভ্যস্ত ছিলেন না। কথাবার্তা মূলত পেশাগত পরিচিতির বলয়েই হত। মেসেজও যা কিছু, কাজের ব্যাপারেই। কোনও মহিলার সঙ্গে ফোন বা মেসেজ আদানপ্রদানের রেকর্ড নেই। বিপ্লব ঘোষ নামের একজনের সঙ্গে কথা বলতেন প্রায়ই, পাওয়া গেল রেকর্ড থেকে। সে-রাতেই শুভজিৎ ছুটলেন বিপ্লববাবুর কসবার বাড়িতে। যদি সূত্র মেলে কিছু।
