ফ্ল্যাটের বাইরে যাঁরা দাঁড়িয়েছিলেন উৎসুক, তাঁদের জিজ্ঞেস করে মৃতের পরিচয় জানলেন শুভজিৎ। শ্যামপ্রসাদ রায়। একাই থাকতেন এবাড়িতে। আরও অনেক কিছু জানার আছে। তবে তার আগে তদন্তের প্রাথমিক কাজগুলো সেরে ফেলা দরকার। বডি পোস্টমর্টেমের জন্য পাঠানো, ডগ স্কোয়াডকে খবর দেওয়া, ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের তলব করা। এবং বড়বাবুকে ফোনে জানানো ঘটনাটা।
.
শ্যামপ্রসাদ রায় হত্যা মামলা। আজ থেকে এগারো বছর আগের ঘটনা। টালিগঞ্জ থানা। কেস নম্বর ২২২, তারিখ ১৬/৮/২০০৭। ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪ ধারায়। খুন এবং একই অপরাধের উদ্দেশ্যে একাধিকের সম্মিলিত পরিকল্পনা।
দক্ষিণ কলকাতার অভিজাত পাড়ার ফ্ল্যাটে একাকী বসবাসকারী প্রৌঢ় খুন। প্রতিক্রিয়ায় যা যা হওয়ার, হল। শহরে নিরাপত্তার অভাব নিয়ে কাগজে নিউজ়প্রিন্ট খরচ কিছু, এলাকায় পুলিশ পিকেট, ডিসি ডিডি, ডিসি সাউথ-সহ সিনিয়র অফিসারদের অকুস্থলে আসা একাধিকবার। ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের হোমিসাইড শাখার অফিসাররা পুরো দিনটাই কাটালেন পার্ক সাইড রোডে। বিকেল নাগাদ সিদ্ধান্ত হল, আপাতত টালিগঞ্জ থানাই থাকবে তদন্তের দায়িত্বে, প্রয়োজনে সাহায্য করার জন্য হোমিসাইড বিভাগ তো রইলই। তদন্তভার ন্যস্ত হল শুভজিতের উপরই। শুভজিৎ সেন, টালিগঞ্জ থানার তৎকালীন সাব-ইনস্পেকটর (বর্তমানে মেট্রো রেল পুলিশের ভারপ্রাপ্ত অফিসার-ইন-চার্জ)।
ময়নাতদন্তের ফল তেমনই, যেমনটা প্রত্যাশিত ছিল। ‘Death was due to the effects of violent Asphyxia by the process of smothering added with gagging and homicidal in nature.’ মুখে কাপড় গুঁজে, চেপে ধরে, শ্বাসরোধ। মৃতদেহের কাটাছেঁড়ার পর ডাক্তারবাবু আরও জানালেন, defensive wounds দেখে যা মনে হচ্ছে, একজন নয়, প্রৌঢ়কে কাবু করতে প্রয়োজন হয়েছিল একাধিক ব্যক্তির উপস্থিতির।
খুনটা কখন হয়েছিল? নির্দিষ্ট ডাক্তারি মতামত পাওয়া গেল, ময়নাতদন্তের আনুমানিক ছেষট্টি থেকে সত্তর ঘণ্টা আগে। থানায় ফোন এসেছিল ১৬ অগস্ট সকাল দশটা নাগাদ। তারপর দেহ উদ্ধারের পর পদ্ধতিগত খুঁটিনাটি মিটিয়ে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠাতে সন্ধে হয়ে গিয়েছিল। ১৭ তারিখ দুপুর গড়িয়ে গিয়েছিল পোস্টমর্টেম সম্পূর্ণ হতে। হিসেব করে যা দাঁড়াল, খুনটা হয়েছিল ১৪ অগস্ট সন্ধে ছ’টা থেকে রাত দশটার মধ্যে।
ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা ফ্ল্যাটের ডাইনে-বাঁয়ে-উপর-নীচে খুঁটিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরও এমন কিছু পেলেন না, যা তদন্তে দিশা দেখাতে পারে। ‘ডেভেলপ’ করে ‘ম্যাচ’ করানোর মতো ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা ফুটপ্রিন্ট নেই। শোওয়ার ঘরের আলমারি হোক বা অন্যান্য আসবাবপত্র, অক্ষত। আলমারির চাবি পড়ে আছে ড্রয়ারে। খুলে দেখা হল। অবিকৃত সব কিছু। জামাকাপড় নিপাট সাজানো, হাজার চারেক টাকা পড়ে আছে। দুর্মূল্য কিছু বাড়িতে ছিল, এমন ইঙ্গিত নেই। ফ্ল্যাট বৈভবহীন। ডাকাতির উদ্দেশ্যে খুন, ভাবার দূরতম কারণ নেই আপাতদৃষ্টিতে।
খুন হওয়ার প্রায় বাহাত্তর ঘণ্টা পরে পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল না ঘ্রাণযোগ্য এমন কিছু, যা তদন্তে সাহায্যের হাত বাড়াবে। তবু এল পুলিশ কুকুর। নিয়মরক্ষার আসা-যাওয়া। কাজের কাজ হল না কিছু। মৃত প্রৌঢ়ের ব্যাপারে প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথাবার্তা বলে শুভজিৎ প্রাথমিকভাবে যা জানলেন, এরকম:
শ্যামপ্রসাদ রায়ের বয়স হয়েছিল চুয়ান্ন। তিন ভাইয়ের মধ্যে সবচেয়ে ছোট। মেজোভাই সলিলপ্রসাদের বয়স সত্তরের কাছাকাছি। সপরিবারে অবসরজীবন কাটান চেতলার জৈনুদ্দিন মিস্ত্রি লেনে। বড়ভাই থাকেন কলকাতার বাইরে বহু বছর ধরে।
তিন ভাই যে যার নিজের মতো থাকতেন। পরস্পরের মধ্যে দেখাসাক্ষাৎ-কথাবার্তা ছিল না বললেই চলে, জানালেন সলিলপ্রসাদ। বড়ভাই অসুস্থ। খবর দেওয়া হল, কিন্তু আসতে পারলেন না। কিন্তু মৃতের স্ত্রী-ছেলেমেয়ে কেউ?
জানা গেল, পেশায় উকিল শ্যামপ্রসাদবাবু আলিপুর কোর্টে প্র্যাকটিস করতেন। বিবাহিত। এক মেয়ে আছে। কিন্তু প্রায় দশ-বারো বছর হয়ে গেল স্ত্রী এবাড়ি ছেড়ে চলে গেছেন মেয়েকে নিয়ে। এখন থাকেন যাদবপুর থানা এলাকার গোলাম মহম্মদ শাহ রোডে দাদার আশ্রয়ে। মেয়ে বেহালার একটি স্কুলের হস্টেলে থেকে পড়াশুনো করে। ক্লাস এইট। আইনি ডিভোর্স দু’জনের হয়নি ঠিকই, কিন্তু সম্পর্ক ছিল না কোনও উভয় পক্ষে। মৃত্যুর খবরেও এলেন না স্ত্রী, মেয়েও না।
কেন মেয়েকে নিয়ে বাড়ি ছেড়েছিলেন শ্যামপ্রসাদের স্ত্রী কৃষ্ণা? বনিবনার অভাব কী কারণে? সদুত্তর পাওয়া গেল না সলিলবাবুর কাছে। সাফ জানালেন, ভাইয়ের ব্যক্তিজীবন নিয়ে মাথা ঘামাননি কখনও।
গোলাম মহম্মদ শাহ রোড বেশি দূরে নয়। শুভজিৎ যখন কৃষ্ণাদেবীর বাড়িতে গিয়ে অতীত দাম্পত্য নিয়ে প্রশ্ন করলেন সন্ধের দিকে, মহিলা সোজাসাপটা জানিয়ে দিলেন, ‘উনি অত্যন্ত আত্মকেন্দ্রিক মানুষ ছিলেন। নিজেরটার বাইরে কিছু ভাবতে পারতেন না। চেষ্টা করেছিলাম অ্যাডজাস্ট করার। একটা পর্যায়ের পর পারিনি। এর বেশি বলার কিছু নেই। বহু বছর হল কোনও যোগাযোগ ছিল না। উনি কখনও খোঁজ নেননি। আমরা মা-মেয়েও কোনও উৎসাহ দেখাইনি।’
