ওরা ছুটতে থাকে মরণ-বাঁচন। দৌড় শেষ হয়। আনন্দ-হতাশা-উচ্ছ্বাস-আক্ষেপের কোলাজ তৈরি হয় গ্যালারিতে। ফার্স্ট-সেকেন্ড-থার্ড, ফলাফল ঘোষণার পর ধারাভাষ্যকার রাশ টানেন নাটকীয়তায়, স্বাভাবিক গলায় জানিয়ে দেন পরের দৌড়ের সময়। অন্য ঘোড়া, অন্য দৌড়।
শুভজিৎ দেখছিলেন উদাসীন। রেসের মাঠে জীবনে আসেননি এই খুনটা হওয়ার আগে। আজ এই প্রথমবার এলেন। কে জানে, আর কতবার আসতে হবে? যখন ফোনটা থানায় এসেছিল সপ্তাহখানেক আগে, কে ভেবেছিল, এত ঝক্কি পোহাতে হবে? কে ভেবেছিল, এতটা সময় কাটাতে হবে ঘোড়দৌড়ের মাঠে?
.
১৬ অগস্ট, ২০০৭, বৃহস্পতিবার।
—নমস্কার, টালিগঞ্জ থানা…
স্বভাবসিদ্ধ কেজো গলায় ফোনটা তুলেছিলেন শুভজিৎ। থানায় ঢুকে নিজের চেয়ারে বসেছেন আধঘণ্টা হল। লম্বা দিন সামনে। একটু পরে আলিপুর কোর্টে যেতে হবে একটা পুরনো মামলায় সাক্ষী দিতে। একটা বধূনির্যাতন আর একটা চুরি, অন্তত দুটো মামলার চার্জশিট লিখে ফেলতেই হবে আজ। নানা ঝামেলায় লেখা হয়ে ওঠেনি। একটু বেশিই দেরি হয়ে গেছে। বড়বাবু গত রাতেও তাগাদা দিয়েছেন। বকাঝকাও করেছেন একটু।
চুরির কেসটার চার্জশিটে হাত দিতে না দিতেই ফোনের ক্রিং ক্রিং। একটু বিরক্তি নিয়েই রিসিভার কানে নিয়েছিলেন শুভজিৎ। এবং দূরভাষের অন্য প্রান্ত থেকে যা ভেসে এসেছিল, শুনে চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়তে কয়েক সেকেন্ডই লেগেছিল মাত্র।
—স্যার, এখানে একটা মার্ডার হয়ে গেছে।
—এখানে মানে?
—পার্ক সাইড রোড, ২৪ নম্বর। তাড়াতাড়ি আসুন স্যার… খুন…
গাড়িতে থানা থেকে দূরত্ব খুব বেশি হলে মিনিট পাঁচেক। আর একটা কেস সম্ভবত ঘাড়ে চাপতে যাচ্ছে, যেতে যেতে ভাবছিলেন শুভজিৎ। সব মামলায় মগজের পুষ্টি হয় না। চুরি-ছিনতাই ইত্যাদির অধিকাংশই তো ‘ধর তক্তা মার পেরেক’ ঘরানার তদন্ত। আর খুনের মামলা মানেই যে রহস্য হাতছানি দিয়ে ডাকতে থাকে, এমনও নয়।
দশের মধ্যে ন’টা মামলায় রোমাঞ্চ-অ্যাডভেঞ্চার-উত্তেজনা অনেক দূরের গ্রহ। বেশিরভাগ খুনের মামলায় প্রথম দিনই জানা হয়ে যাচ্ছে, খুনি কে। হয় গৃহভৃত্য মনিবকে খুন করে টাকাপয়সা লুঠ করে পলাতক, নয় পুরনো শত্রুতার জেরে বন্ধুকে খুন বন্ধুর। বা, প্রত্যাখ্যান সহ্য না করতে পেরে প্রেমিকাকে খুন প্রেমিকের। রহস্য কই? শুধু ফেরার অপরাধীকে গ্রেফতার, গুচ্ছের লোকের জবানবন্দি নেওয়া, চার্জশিটে যাতে ফাঁকফোকর না থাকে, সেটা দেখা। মাথা খাটানোর মতো মামলা বছরে বড়জোর একটা-দুটো। ওই বুদ্ধি খরচ করার প্রক্রিয়াটা দারুণ লাগে শুভজিতের। ওই জন্যই তো পুলিশের চাকরিতে আসা।
ছোটবেলা থেকে গোয়েন্দা গল্পের পোকা। ফেলুদা-ব্যোমকেশের মতো একটার পর এক রহস্যের সমাধান করবেন, এমনই ভাবতেন শুভজিৎ স্কুলবেলায়। চাকরিতে এসে সাময়িক মোহভঙ্গ ঘটেছিল, কল্পনার সঙ্গে বাস্তবের আকাশপাতাল তফাতে। কোথায় ফেলুদার মগজাস্ত্রের রোম্যান্স, আর কোথায়ই-বা ব্যোমকেশ বক্সীর সত্যান্বেষণের রোমাঞ্চ! কল্পনার গোয়েন্দাকাহিনির গা-ছমছম উত্তেজনা যদি হয় সবুজে সবুজ ইডেন গার্ডেন্স, বাস্তবের তদন্ত তুলনায় ছিরিছাঁদহীন কাঁকরভরতি পাড়ার ফুটবল মাঠ।
ভাবনায় ছেদ পড়ে ড্রাইভারের ব্রেক কষার শব্দে। গাড়ি থেমেছে একটা জটলার সামান্য দূরে। পুলিশের গাড়ি দেখে কয়েকজনকে উৎসুক ভঙ্গিতে এগিয়ে আসতে দেখে শুভজিৎ বোঝেন, ‘স্পট’-এ পৌঁছে গেছেন।
রাসবিহারী মোড় থেকে যদি হাঁটা দেন গড়িয়াহাটের দিকে, কিছুটা এগিয়ে বাঁ হাতে পড়বে পার্ক সাইড রোড। ঢোকা যায় শরৎ বোস রোডের দিক থেকেও। রাস্তার দু’ধারের বাড়িগুলোর দিকে একবার চোখ বুলোলেই বোঝা যায়, এ মহল্লায় উচ্চবিত্তেরই বাস প্রধানত।
বছর তিরিশের এক যুবক এগিয়ে আসেন শুভজিতের দিকে।
—স্যার, থানায় আমিই ফোন করেছিলাম। কয়েকটা বাড়ি পরেই থাকি। বাজার করে ফিরছিলাম। ২৪ নম্বরের ফ্ল্যাটগুলোয় যে ছেলেটা সপ্তাহে দু’বার সিঁড়ি-টিঁড়ি ঝাঁট দিতে আসে, সেই প্রথম নেমে এসে চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করেছিল। গন্ধ পেয়ে ওর সন্দেহ হয়েছিল। ভয়ও পেয়েছিল। অনেকবার বেল বাজিয়েও সাড়া পায়নি ভিতর থেকে। আমরা কয়েকজন গেলাম। যা বিশ্রী গন্ধ বেরচ্ছিল… দরজা ভেজানো ছিল, ভিতরে ঢুকে দেখলাম…
শুভজিৎ থামিয়ে দেন যুবককে।
—দাঁড়ান, দেখছি।
দুটো তিনতলা বাড়ি। একটার পিছনে আরেকটা। সামনেরটা ২৪বি, পিছনেরটা ২৪এ। সামনের বাড়ির পাশ দিয়ে একটা সরু প্যাসেজ। যা পেরিয়ে পৌঁছতে হয় পিছনের ২৪এ-র সিঁড়ির কাছে। কৌতূহলী জটলা পেরিয়ে সিঁড়িতে পা রাখতে না রাখতেই গন্ধ নাকে ছিটকে আসে শুভজিতের। সেই গন্ধ, যার সঙ্গে ডাক্তার বা পুলিশের পরিচয় ঘটে যায় চাকরির শুরুতেই। একদম প্রথম দিকে গা গুলোত শুভজিতের, পচাগলা দেহ দেখলে। অবশ্য সয়েও গেছিল দ্রুত। এখন তো কিছুই মনে হয় না আর। অভ্যেস।
প্রতি তলায় একটা করে ফ্ল্যাট। তিনতলায় উঠে ফ্ল্যাটের অর্ধেক খোলা দরজার দিকে তাকান শুভজিৎ। কেউ খুলেছিল, না কি খোলাই ছিল, খোঁজ নেওয়ার জন্য অনেক সময় পড়ে আছে। আগে তো দেখা যাক, আদৌ খুন, আত্মহত্যা, না অন্য কিছু?
ফ্ল্যাট আয়তনে বড় নয় খুব। কত হবে? সাড়ে ছ’শো স্কোয়ারফুট মেরেকেটে। একটা মাঝারি মাপের ড্রয়িং-কাম-ডাইনিং, একটা শোয়ার ঘর, বারান্দা একফালি। রান্নাঘর আর বাথরুম। এক প্রৌঢ় ভদ্রলোক অবিকল নিল ডাউন অবস্থায় বসে রয়েছেন শোওয়ার ঘরে ঢোকার মুখে। বয়স মাঝপঞ্চাশ মনে হয় দেখে। আলতো পিঠ ঠেকে আছে দেওয়ালে। স্যান্ডো গেঞ্জি আর হাফপ্যান্ট পরে আছেন। ‘আছেন’ লেখা ভুল হল, ‘ছিলেন’। প্রাণহীন দেহে পচন ধরার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। দড়ি দিয়ে হাত বাঁধা পিছমোড়া করে। মুখে কাপড় গোঁজা। নাক থেকে রক্ত চুঁইয়ে পড়ে জমাট বেঁধেছে ঠোঁটের কোণে। দেহে কোনও আঘাতের চিহ্ন চোখে পড়ছে না তেমন। প্রতিরোধজনিত ক্ষত (defensive wound) অবশ্য আছে কিছু শরীরে। ছড়ে যাওয়ার দাগ, আঁচড়ের চিহ্ন কিছু। ধস্তাধস্তি হয়েছিল সম্ভবত খুনি বা খুনিদের সঙ্গে।
