বক্তা এবার অশোক।
—বাড়ি ফেরার পথে আমরা দু’জন আলোচনা করে ঠিক করলাম, রোজকার অর্থকষ্ট আর বড়দার অপমানের থেকে বাঁচতে এটাই সেরা রাস্তা।
সুশান্ত ইশারায় থামতে বলেন দুই ভাইকে। তাকান মন্টুর দিকে। শক্ত সবল চেহারার প্রৌঢ় মাথা নিচু করে বসে আছেন নিশ্চুপ।
—মন্টুবাবু, বাকিটা আপনার মুখ থেকেই শুনি। ধরা তো পড়েই গেছেন, চুপ করে থেকে আর লাভ নেই।
উনষাট বছরের মন্টু মুখ তোলেন, বলতে থাকেন ধীরে ধীরে, বন্ধুহত্যার বৃত্তান্ত।
—২৪ তারিখ সন্ধেবেলা বিনোদকে ফোন করলাম। বললাম, ‘একজন ভাল খদ্দের পেয়েছি। বাড়িটা দেখতে চাইছে। দলিলটা নিয়ে কাল সাড়ে এগারোটায় আসতে পারবি?’ জানতাম, ওই সময়টায় রোজ ও এমনিতেই আসে। বিনোদ বলল, ‘ঠিক আছে, আসব।’
—আসার পর?
—রাতেই জানিয়ে দিয়েছিলাম অশোক-প্রদীপকে। কথা ছিল, ওরা কাছেপিঠে থাকবে। বিনোদ এলে আমি ঢুকব। ঢোকার আগে একটা মিসড কল দেব অশোককে। ওরাও চলে আসবে পাঁচ মিনিটের মধ্যে।
—বেশ …
—বিনোদ এল দলিল নিয়ে। আমি টুকটাক কথাবার্তা চালালাম কয়েক মিনিট। বিনোদ জানতে চাইল, ‘খদ্দের কখন আসবে রে?’ আমি বললাম, ‘এখুনি এসে পড়বে।’ বলতে বলতেই অশোক আর প্রদীপ ঢুকল। বিনোদ চমকে উঠে বলল, ‘আরে, তোরা?’
প্ল্যানমাফিক একটা বড় ব্যাগে শাবল আর কয়েক টুকরো কাপড় নিয়ে এসেছিল ওরা। বিনোদ কিছু বোঝার আগেই ব্যাগ থেকে শাবলটা বার করলাম আমি। ওরা দু’জন বিনোদের হাত চেপে ধরল, আর আমি সজোরে শাবল চালালাম কপালে। পরপর দু’বার। বিনোদ কাটা গাছের মতো পড়ে গেল।
—তারপর গলায় কাপড়ের ফাঁস দিলেন, মুখে কাপড় গুঁজলেন, আর বাড়ির পিছনে বিনোদকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে গিয়ে শাবল দিয়ে মাটি খুঁড়ে পুঁতে দিলেন, এই তো?
—হ্যাঁ স্যার, তার আগে বিনোদের প্যান্ট-জামা খুলে নিয়েছিলাম। প্যান্ট থেকে চাবির গোছাটা নিলাম। মেঝের রক্তের দাগ জল দিয়ে ভাল করে ধুয়ে ঘর তালাবন্ধ করে দলিলটা নিয়ে বেরিয়ে এলাম। বিনোদের শার্ট-প্যান্ট ব্যাগে ভরে নিয়ে।
.
প্রমাণ একত্রিত করার কাজটা খুব দুঃসাধ্য ছিল না চার্জশিট তৈরির সময়।
এক, রক্তের দাগ-লাগা শাবল উদ্ধার হয়েছিল অশোকের ঘর থেকে। রক্তের দাগের নমুনা বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় মিলে গিয়েছিল ঘরের দেওয়াল থেকে সংগৃহীত রক্তের নমুনার সঙ্গে।
দুই, বিনোদের রক্তমাখা শার্টপ্যান্ট মন্টু দাসের বাড়ির তল্লাশিতে পাওয়া গেছিল। এক্ষেত্রেও পোশাকের রক্তের নমুনা আর অকুস্থল থেকে সংগৃহীত রক্তের নমুনা মিলে গিয়েছিল পরীক্ষায়। উদ্ধার হওয়া শার্টে একটা বোতাম ছিল অমিল। ঘটনাস্থল থেকে বাজেয়াপ্ত হওয়া প্লাস্টিকের বোতামই যে সেই বোতাম, একই শার্টের, ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের রিপোর্টে নিখুঁত প্রমাণিত হয়েছিল।
তিন, প্রদীপের কাছে ছিল বিনোদের সেই বাড়ির দলিল। উদ্ধার হয়েছিল হিউম রোডের বাড়িতে প্রদীপের ঘরের ট্রাঙ্ক থেকে।
চার, কফিনে শেষ পেরেক ঠুকেছিল বিনোদ এবং আততায়ী-ত্রয়ীর কল রেকর্ড। খুনের আগের সন্ধেয় বিনোদকে ফোন মন্টুর, খুনের দিন সকালে মন্টুর মিসড কল অশোককে, চারজনের ফোনের টাওয়ার লোকেশন খুনের সময় একই বিন্দুতে মিলে যাওয়া, পারিপার্শ্বিক প্রমাণও ছিল অকাট্য।
পাঁচ বছরের বিচারপর্বের শেষে মন্টু-অশোক-প্রদীপকে দোষী সাব্যস্ত করে সাজা শুনিয়েছিলেন বিচারক। কারাদণ্ড যাবজ্জীবন। যে সাজা ওঁরা এখনও ভোগ করছেন।
স্বামী-স্ত্রীকে খুন করছে সন্দেহের বশে। স্ত্রী ষড়যন্ত্রে শরিক হচ্ছে প্রেমিকের সঙ্গে, স্বামীকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিতে। ছেলে সম্পত্তির লোভে ছক কষছে বাবার ভবলীলা সাঙ্গ করার। বাবার হাত কাঁপছে না সন্তান-নিধনে। ছোটবেলার বন্ধু অর্থলিপ্সায় পথের কাঁটা ভাবছে বন্ধুকে, বন্ধুর ভাইদের সঙ্গে সজ্ঞানে প্ল্যান করছে খুন করে মাটিতে পুঁতে দেওয়ার!
কল্পনার গল্প-উপন্যাসে এসব পড়া এক। বাস্তবের এমন ব্যতিক্রমী ঘটনা কাগজে পড়া এক। কিন্তু ঘটনায় জড়িত রক্তমাংসের চরিত্রগুলোর সঙ্গে তদন্ত চলাকালীন নিয়মিত ভাবের আদানপ্রদান আরেক। তদন্ত যাঁরা করেন এ ধরনের বিরল মামলায়, তাঁদের কিছুটা সুযোগ ঘটে অপরাধীর মনোজগৎকে সত্তর মিলিমিটার স্ক্রিনে দেখার।
দেখেও যে খুব বেশি শেখা যায়, এমন দাবিই বা করি কী করে? সম্পর্কের যোগ-ভাগ-গুণ-বিয়োগ মেলে না অপরাধের দুনিয়ায়। এ এক অন্য পৃথিবী।
বিপুলা যে পৃথিবী। যার কতটুকুই বা জানি!
পুনশ্চ: রীতা নস্কর নামটি পরিবর্তিত। মহিলার সামাজিক বিড়ম্বনা অভিপ্রেত নয়। তাই।
২.০৮ আংটি, তবে বাদশাহি নয়
[শ্যামপ্রসাদ রায় হত্যা
শুভজিৎ সেন, মেট্রো রেল পুলিশের ওসি।]
ওরা ছুটছে। পাশাপাশি, ঊর্ধ্বশ্বাসে। নিজের নিজের ট্র্যাকে। শুরুর দিকে পরস্পরের মধ্যে ব্যবধান উনিশ-বিশ। কিন্তু সেটা ওই শুরুর দিকেই যা। তিরিশ-চল্লিশ মিটার পরেই ছবিটা বদলে যাচ্ছে দ্রুত। তিন-চারজনের একটা দল ছিটকে বেরিয়ে আলাদা হয়ে যাচ্ছে। তাল রাখতে পারছে না বাকিরা।
ফিনিশিং পয়েন্টের একশো মিটার আগে একটা টার্ন আছে। তারপর এসপার-ওসপারের দৌড়। হাতে দূরবিন উঠে এসেছে জনতার। প্রতিটা ইঞ্চি-সেন্টিমিটারের এগোনো-পিছনোয় জান্তব উল্লাস ছিটকে আসছে গ্যালারি থেকে। উত্তেজিত ধারাভাষ্য যথেচ্ছ বারুদ জোগাচ্ছে সে উল্লাসে, ‘Number 3 in the lead, but for how long? 2 catching up fast, so is 5 and keep an eye on number 4 too.. Goodness me, this is as close as it gets!’
