স্রেফ আন্দাজেই বলা, এবং লক্ষ্যভেদ! মন্টু দাস কাঁপতে কাঁপতে চেয়ার ছেড়ে মাটিতে বসে পড়েন। পা জড়িয়ে ধরেন সুশান্তর। কাঁদতে শুরু করেন অঝোরে।
—সব বলছি স্যার। আমি একা মারিনি। অশোক আর প্রদীপও ছিল।
অশোক বর্মণ আর প্রদীপ বর্মণ, মৃত বিনোদের দুই সহোদরের দিকে তাকান সুশান্ত। দু’জনে যেন সহসাই বিদ্যুৎস্পৃষ্ট। বেঞ্চে চুপচাপ বসে থাকা রাজেশ শুনছিলেন সব। আচমকা উঠে দাঁড়িয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন অশোকের উপর, ঝাঁকাতে থাকেন কাকার শার্টের কলার, ‘তোমরা মেরেছ বাবাকে? তোমরা?’
দু’জন কনস্টেবল সরিয়ে নিয়ে যান রাজেশকে। মোবাইল কল রেকর্ডের আর দরকার পড়বে না আপাতত, বোঝেন সুশান্ত। বোঝেন, ওসি হোমিসাইডকে ফোন করা দরকার এখনই। বোঝেন, নেমন্তন্ন রক্ষা লাটে উঠল। বাড়ি যাওয়ার কোনও গল্পই নেই আর। ‘পরিবার’ থাকবে কিনা, ভাবার সময় নেই এখন।
মন্টু বলতে শুরু করলেন। মুখ খুললেন অশোক আর প্রদীপও। পরদা উঠল হত্যারহস্যের।
বিনোদদের মা গোদাবরী দেবী সেপ্টেম্বরের শুরুতে মারা যাওয়ার পরই মায়ের ঘরের দখলদারি নিয়ে অশোক-প্রদীপের সঙ্গে ঝামেলা শুরু হয় বিনোদের। মায়ের ঘরের সম্পূর্ণ দখল নিতে চেয়েছিলেন বিনোদ, একরকম জোর করেই। বাধা দেন অশোক-প্রদীপ। মায়ের শ্রাদ্ধের দিনও তীব্র বাদানুবাদ হয় এ নিয়ে। বিনোদ বলেন, ‘মায়ের চিকিৎসার সব খরচ যখন আমি দিতাম, ঘরের উপর আমারই দাবি সবার আগে।’ এ যুক্তি মানতে চাননি ভাইরা। যাঁরা নিজেদের দিন-আনি-দিন-খাই জীবনযাত্রার সঙ্গে বড়দার রাজা-মারি-বাদশা-মারি চালচলনের তুলনা করে দীর্ঘদিন যাবৎ ভুগতেন হীনম্মন্যতায়, ঈর্ষায়। যে ঈর্ষায় প্রবল ঘৃতাহুতি দিয়েছিল বিনোদের ঘর দখলের চেষ্টা।
মন্টু দাস এ পরিবারের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ। অশোক-প্রদীপদের বড় হতে দেখেছেন। মন্টুদা-র শরণাপন্ন হলেন দুই ভাই, ‘তুমি বড়দাকে বোঝাও। ওর টাকার জোর আছে। ঠিক কোনওভাবে ঘরটা দখল করে নেবে। জোরজার করলে কিন্তু আমরাও ছাড়ব না। টাকাপয়সা দিয়ে সাহায্য করে বলে উঠতে-বসতে গালিগালাজ করে। কথা শোনায় রোজ। অনেক সহ্য করেছি। আর নয়। তা ছাড়া ঈশ্বর গাঙ্গুলি স্ট্রিটের বাড়িটাও তো আছে। ওটা বেচে দিলে তো অনেক টাকা পাবে। মায়ের ঘরটাও দরকার? বাড়াবাড়ি করলে খুনোখুনি হয়ে যাবে। মেরেই ফেলব।’
অশোক আর প্রদীপ জানতেন না, বিনোদের ব্যাপারে ঈর্ষা শুধু তাঁরাই নন, আপাতদৃষ্টিতে অভিন্নহৃদয়ের বন্ধু মন্টুও পোষণ করতেন।
—স্যার, একসঙ্গে বড় হয়েছি বিনোদের সঙ্গে। হাফপ্যান্টের বয়সের বন্ধু। গত এক-দেড় বছরে ব্যবসার যত রমরমা বাড়ছিল, বিনোদ যেন ধরাকে সরা জ্ঞান করতে শুরু করেছিল। আচার-আচরণই পালটে গেছিল। একসঙ্গে আড্ডা দিতাম বা তাস খেলতাম ঠিকই। কিন্তু ও মাঝেমাঝেই কথাবার্তায় বুঝিয়ে দিত, যে ও বড়লোক আর আমরা ছাপোষা। ও পেরেছে, আমরা পারিনি।
—বলে যান, শুনছি।
—আমারও স্যার টানাটানির সংসার। কোনওভাবে দিন চলে। পুজোর মরশুমেই যা মূর্তি গড়ে টাকা আসে কিছু। বাকি বছরটা চালাতে প্রাণ বেরিয়ে যায়।
—টানাটানির সংসার বলে ছোটবেলার বন্ধুকে মেরে ফেললেন? মেরে পুঁতে রাখলেন?
—বিশ্বাস করুন, বিনোদকে মারার কথা দুঃস্বপ্নেও ভাবিনি কোনওদিন। গত মাসে ওর থেকে কিছু টাকা ধার চেয়েছিলাম বাড়িটা সারানোর জন্য। বেশি নয়, হাজার পাঁচেক। শুনে হাসতে হাসতে বলল, ‘দিতে পারি, কিন্তু শোধ দিবি, তার গ্যারান্টি কী? ফস করে কোনদিন মরে যাবি, আমার টাকা জলে যাবে।’ ওই অপমানটা প্রচণ্ড গায়ে লেগেছিল আমার। নিজেকে খুব ছোট মনে হয়েছিল। মুখে শুধু বলেছিলাম, ‘দিতে হবে না টাকা।’ বিনোদ তারপরেও দিতে চেয়েছিল টাকা। নিইনি। সম্মানে লেগেছিল। রাগ হয়েছিল খুব। দয়া দেখাচ্ছে?
—তারপর?
—অশোক-প্রদীপরা যখন এসে বলল, বিনোদ মায়ের ঘরের দখল নিতে চাইছে, যখন বলল, জবরদস্তি করলে ওরা মেরেই ফেলবে ‘বড়দা’-কে, আমার মাথায় একটা প্ল্যান এল। নিজের ভাইদের সঙ্গে যে কুকুর-ছাগলের মতো ব্যবহার করে, টাকার গরমে ছোটবেলার বন্ধুকে অপমান করতে যার বাধে না, তার চরম শাস্তিই পাওয়া উচিত।
—প্ল্যানটা কী করলেন?
—ঈশ্বর গাঙ্গুলি স্ট্রিটের বাড়িটা ভাল করে সারিয়ে-সুরিয়ে বেচে দেওয়ার কথা ভাবছিল বিনোদ। আমাকে বলেছিল, ‘দ্যাখ না একটা ভাল কোনও খদ্দের।’ আমি অশোক-প্রদীপকে বললাম, ‘তোদের বড়দা এই বাড়িটা বেচে দিয়ে মোটা টাকা পাবে আর সেই দিয়ে ব্যবসা আরও ফুলেফেঁপে উঠবে। মামলা করে তোদের মায়ের ঘরটাও দখল নেবে। একটা উপায় আছে আমাদের তিনজনেরই বড়লোক হওয়ার। শুনতে চাস তো বলব।’
অশোক এবার থামিয়ে দেন মন্টুকে।
—আমি বলছি স্যার। মন্টুদা বলল, ‘বিনোদের কাছ থেকে বাড়ির দলিলটা কোনওভাবে বাগিয়ে তারপর পৃথিবী থেকেই সরিয়ে দিতে পারলেই কেল্লা ফতে। দলিলটা জাল করে বাড়িটা বিক্রি করে যা টাকা পাব, সেটা তিনজন ভাগ করে নেব।’
প্রদীপ বলতে শুরু করেন অশোকের কথা শেষ হতে না হতেই।
—আমরা জিজ্ঞেস করেছিলাম মন্টুদাকে, ‘যদি পুলিশ ধরে ফেলে?’ মন্টুদা বলেছিল, ‘আরে, বডি পেলে তো ধরবে। পুঁতে দেব মাটির নীচে। খুঁজেই তো পাবে না কেউ। লোকে কিছুদিন পরে ভাববে, মেন্টাল পেশেন্ট বউ-কে ফেলে রেখে বাড়ি বেচে অন্য কোনও মহিলার সঙ্গে চলে গেছে অন্য কোথাও। দ্যাখ ভেবে, তোরা রাজি আছিস কিনা?’
