—স্যার, জানি না কী প্রমাণ পেয়েছেন আপনারা। তবে এটুকু বলতে পারি, আর যাই করুক, খুন করার ছেলে রাজেশ নয়। বিশ্বাস করুন।
সুশান্ত সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেন মন্টুকে। তাকান রীতার দিকে।
—কিছু মনে করবেন না রীতাদেবী, আপনার সঙ্গে বিনোদবাবুর সম্পর্ক ঠিক কেমন ছিল?
মহিলা এ প্রশ্ন আশা করেননি। অবাক দৃষ্টিতে তাকান।
—কেমন সম্পর্ক মানে?
—মানে আর নতুন করে কী বোঝাব? আপনিও বুঝছেন, কী বলতে চাইছি। বিনোদবাবুর সঙ্গে আপনার অবৈধ সম্পর্কের কথা বলছি। বাধ্য হয়েই বলছি।
—এসব কী বলছেন স্যার!
—আপনার অজানা কিছু বলছি কি? আর না জেনে এ ধরনের কথা বলবই বা কেন? বিনোদ যখন ঈশ্বর গাঙ্গুলির বাড়িতে যেতেন রোজ, মাঝেমাঝে আপনি যেতেন না দুপুরের দিকে? কেন যেতেন? ওঁর দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে বাড়িটা নিজের নামে লিখিয়ে নিতে জোর করতেন না? একটা শব্দও মিথ্যে এর?
রীতা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকেন সুশান্তর দিকে। তারপর কেঁদেই ফেলেন প্রায়।
—এ আপনি কী বলছেন স্যার? বিনোদদার সঙ্গে দাদা-বোনের সম্পর্ক ছিল। ওঁর বাড়িতে যাইই নি কোনওদিন। উনিই বরং গত ভাইফোঁটায় আমার বাড়িতে এসে ফোঁটা নিয়ে গেছেন। রাস্তাঘাটে দেখা হলে দু’-একটা কথা হত। আলাপ ছিল। এইটুকুই। খোঁজ নিয়ে দেখুন না পাড়ায়, সেলাই করে সংসার চালাই। মিথ্যে স্যার, আপনাকে যে এসব খবর দিয়েছে, মিথ্যে বলেছে। ডাকুন না একবার আমার সামনে…
—সময় হলেই ডাকব। যাক গে, বৃষ্টি থামলে বাড়ি যেতে পারেন। আরও কিছু জিজ্ঞেস করার আছে। কাল বিকেলের দিকে আপনাকেও একবার লালবাজার আসতে হতে পারে। থানা জানিয়ে দেবে, কখন।
রীতার মুখ থেকে কথা বেরয় না। চেয়ারেই বসে থাকেন। যেন নড়াচড়ারও ক্ষমতা হারিয়েছেন।
সুশান্ত দেখেও দেখেন না। ঘড়িতে চোখ বুলোন। পৌনে ছ’টা। দেরি হয়ে যাচ্ছে। মন্টু-প্রবাল-অশোক-প্রদীপ এখনও বাকি। তাড়াতাড়ি সেরে বেরতে হবে এবার। বৃষ্টিটা ধরে এসেছে একটু। থামেনি, তবে আগের মতো মুষলধার চোখরাঙানি নেই।
—মন্টুবাবু, কী কী কারণে আপনি বাল্যবন্ধু বিনোদকে খুন করতে পারেন বলবেন একটু…
কথা জোগায় না স্তম্ভিত প্রৌঢ়র মুখে। সুশান্ত আবার জিজ্ঞেস করেন।
—বলুন মন্টুবাবু… কেন মারলেন বিনোদবাবুকে? ছোটবেলার বন্ধুকে এভাবে মারতে হাত কাঁপল না? আপনার তো নরকে ঠাঁই হওয়াও মুশকিল …
মন্টুকে আক্ষরিক অর্থেই বাক্রুদ্ধ দেখায়।
—স্যার, আমি ছাপোষা মানুষ। কালীঘাট মন্দিরে পাঁঠাবলি দিই, পটুয়াপাড়ায় মূর্তি বানাই। গায়ক অমৃক সিং অরোরার নাম নিশ্চয়ই শুনেছেন স্যার? ওঁর বাড়ির কালীপুজোয় আমিই মূর্তি বানাই বহু বছর হল। জিজ্ঞেস করে দেখবেন আমার ব্যাপারে। আমি খুন করব বিনোদকে?
—সে না হয় জিজ্ঞেস করব। আর আপনি যদি না-ও মেরে থাকেন, আর কে মারতে পারে আপনার বন্ধুকে? কী মনে হয়?
বিহ্বল মন্টু হাতজোড় করে ফেলেন এবার। চশমা খুলে চোখ মোছেন।
—কী বলব স্যার? বিনোদের তো কোনও শত্রু ছিল না। নির্ঝঞ্ঝাট মানুষ ছিল।
সুশান্তর হঠাৎই চোখ চলে যায় করজোড় মন্টুর বাঁ হাতের দিকে। লাল ছোপ একটা বুড়ো আঙুলে।
ইনস্টিংক্ট। ইংরেজি শব্দ। কী বাংলা হয়? সহজাত প্রবৃত্তি? আগাথা ক্রিস্টির ‘The Mysterious Affair at Styles’ উপন্যাসে অদ্বিতীয় Hercule Poirot এক জায়গায় বলছেন, ‘Instinct is a marvellous thing. It can neither be explained, nor can be ignored.’ সহজাত প্রবৃত্তি এক আশ্চর্য বস্তু। ব্যাখ্যাও করা যায় না, উপেক্ষাও না।
জিজ্ঞাসাবাদের সময় সন্দেহভাজনের শরীরের প্রতিটি নড়াচড়া শ্যেনদৃষ্টিতে লক্ষ করা যে-কোনও বুদ্ধিমান তদন্তকারীর সহজাত প্রবৃত্তি, স্বাভাবিক ইনস্টিংক্ট। যেটা অভাবিত ভাবে কাজে লেগে গেল সুশান্তর।
—ওটা কীসের দাগ মন্টুবাবু? লাল দাগটা?
মন্টুকে সামান্য অপ্রস্তুত দেখায়, সামলে নেন পরমুহূর্তেই।
—মূর্তি গড়ি তো, রং লেগে যায়, লেগে গেছে অসাবধানে।
সুশান্ত উঠলেন চেয়ার ছেড়ে। মন্টুবাবুর বাঁ হাতটা ধরে লাল ছোপটা দেখলেন মিনিটখানেক। স্থির দৃষ্টিতে তাকালেন চোখাচোখি।
—মিথ্যে বলছেন কেন? এটা মূর্তির রং নয়। এটা তো লাল ওষুধ, মারকিউরোক্রোম।
মন্টুবাবু ফ্যালফ্যাল করে তাকান সুশান্তর দিকে। তোতলাতে থাকেন হঠাৎ।
—পাঁঠা কাটি তো… রক্ত ছিটকে বোধহয়…
সুশান্ত শোনেন, এবং আগ্রাসী আক্রমণে যান নিমেষে। লোভনীয় ফ্লাইটেড ডেলিভারিতে ঠিক যেভাবে স্টেপ আউট করে ব্যাটসম্যান।
—একবার বলছেন মূর্তির রং, একবার বলছেন বলির রক্ত। আমাকে দেখে যদি নির্বোধ বলে মনে হয় আপনার, তা হলে ভুল মনে হয়। কোথায় কেটে গেছে আপনার? লাল ওষুধের দরকার পড়ল কেন?
মন্টু বসে থাকেন বজ্রাহতের মতো। টেনে দাঁড় করান সুশান্ত।
—জামাটা খুলুন।
জামা খোলার পর দেখা গেল, মন্টুর ডান কনুইয়ের কাছে ছড়ে যাওয়ার চিহ্ন। দেখেই বোঝা যায়, ক্ষত খুব পুরনো নয়। সবে মামড়ি পড়তে শুরু করেছে। ফরেনসিক সায়েন্সের ভাষায়, ‘brush abrasion’, রাফ সারফেসের সঙ্গে শরীরের কোনও অংশের ঘর্ষণজনিত ক্ষতচিহ্ন।
—এটা কবে হল? কী ভাবে হল?
মন্টু নিরুত্তর। কাঁপছেন। সুশান্ত বলতে থাকেন।
—আমি বলি? আমি বলি, কীভাবে হয়েছিল? বিনোদকে খুন করে যখন বডিটা টেনেহেঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন পোঁতার জন্য, দেওয়ালে ঘষা লেগেছিল। ঠিক বলছি?
