আপত্তিটা কিন্তু উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। বাস্তব অভিজ্ঞতা বলে, জিজ্ঞাসাবাদকে তত্ত্বের ঘেরাটোপে বন্দি করে ফেললে ফল মেলে না অনেক ক্ষেত্রেই। কোন ক্ষেত্রে কোন স্ট্র্যাটেজি কাজ করবে, বলা মুশকিল। জেরা করতে করতেই অনেক ক্ষেত্রে তদন্তকারীকে পদ্ধতি বদলে ফেলতে হয় পরিস্থিতির বিচারে। ব্যাকরণসিদ্ধ প্রথার পরোয়া করলে চলে না তখন।
যেমন ধরুন, বহুপ্রচলিত ‘Good cop, Bad cop’ টেকনিক। সন্দেহভাজনকে যদি কিছুটা আবেগপ্রবণ মনে হয়, এই পদ্ধতিতে কাজ হয় বেশি। ‘Bad cop’ অর্থাৎ ‘খারাপ পুলিশ’ ইচ্ছাকৃত ভাবে রূঢ় ভাষায় জেরা করে সন্দেহভাজনকে মানসিক ভাবে দুমড়ে দিলেন। আর কিছুক্ষণের বিরতির পর ‘Good cop’ অর্থাৎ ‘ভাল পুলিশ’ এসে পিঠে সহানুভূতির হাত রাখলেন, ‘আগের জনের কথায় কিছু মনে করবেন না প্লিজ়। নিন, জল খান। আপনি কী অসহনীয় পরিস্থিতিতে ক্রাইমটা করতে বাধ্য হয়েছেন, আমি বুঝি। আপনার জায়গায় থাকলে আমিও একই জিনিস করতাম। কিছু বলতে হবে না এখন আপনাকে। যখন ইচ্ছে হয়, বলবেন। না ইচ্ছে হলে বলবেন না।’
এই পন্থায় অভাবিত কাজ দেয় কখনও কখনও। বাবা খুব বকাবকি করার পর মা পিঠে হাত রেখে আদর করে দিলে, বা উলটোটা হলে, বাচ্চারা যেমন হাউহাউ করে কেঁদে ফেলে কাঙ্ক্ষিত সহানুভূতির ছোঁয়ায়, এ অনেকটা তেমন। ‘Good cop’-এর কাছে স্বতঃস্ফূর্ত স্বীকারোক্তি আসে অপরাধের।
উদাহরণ আরও অনেক দেওয়া যায়। মোদ্দা কথা হল, তত্ত্বসর্বস্বতায় আটকে থাকতে নেই তদন্তকারীকে। টেকনিকের জন্য খেলা নয়। খেলার জন্যই টেকনিক। যে টেকনিকে যখন যেভাবে রান আসতে পারে, সেটাই তখন সেখানে ব্যাটসম্যানের সেরা টেকনিক। সে ব্যাটিং-ম্যানুয়াল যা-ই বলুক না কেন।
সুশান্ত জেরা শুরু করলেন ব্যাকরণের তোয়াক্কা না করেই। প্রথম থেকেই চালু করে দিলেন ‘শক থেরাপি’। মনস্তাত্ত্বিক ‘শক’, আচমকা ঝটকা। কথা নেই বার্তা নেই, শুরুতেই সবাইকে সরাসরি কাঠগড়ায় তোলা হতভম্ব-হতচকিত করে দিয়ে। এবং যাচাই করে নেওয়া বিনা মেঘে বজ্রাঘাতের প্রতিক্রিয়া।
বাড়ি ফেরার কিছুটা তাড়াও ছিল সুশান্তর। সন্ধে হয়ে যাবে একটু পরেই। বৃষ্টি শুরু হয়েছে আকাশ ভেঙে। থামার ন্যূনতম লক্ষণ নেই। রাত্রে যাদবপুরে এক ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের ছেলের জন্মদিনের অনুষ্ঠান। একবার না গেলেই নয়। বুড়ি ছুঁয়ে আসাই, তবু একবার মুখ দেখাতেই হবে, সে যত রাতই হোক। এমনিতেই পুলিশ মহলে একটা রসিকতা চালু আছে, ‘পুলিশের শনিবার নেই, রবিবার নেই, পরিবার নেই।’ আজকের নেমন্তন্নটায় না গেলে সত্যিই ‘পরিবার’ থাকার সম্ভাবনা কম। বাড়িতে সবাই অপেক্ষা করে আছে, সুশান্ত ফিরলে একসঙ্গে যাওয়া হবে। কিন্তু এ যা বৃষ্টি শুরু হয়েছে, সময়মতো বেরতে পারলে হয়। বিরক্ত লাগে সুশান্তর, দ্রুত শুরু করেন রাজেশকে দিয়ে।
—ভাই, আপনি কিন্তু আগাগোড়া একটা কথা মিথ্যে বলেছেন।
হকচকিয়ে যান রাজেশ।
—আমি? কী স্যার?
—একটা ম্যাটাডোর কেনার টাকা চেয়েছিলেন বাবার কাছে। বিনোদবাবু দেননি। বলেছিলেন, ‘তোকে টাকা দেওয়া মানে জলে দেওয়া। মদ খেয়ে উড়িয়ে দিবি দু’দিনে।’ চেতলার জুয়ার ঠেকে এ নিয়ে তো পরদিন বাবাকে প্রচুর গালমন্দ করেছিলেন। বলেছিলেন, ‘দেখে নেব বুড়োকে!’
—ভুল খবর স্যার, ডাহা মিথ্যে!
—মোটেই মিথ্যে নয়! আপনি যান না চেতলা লক গেটের পাশের ঠেকে প্রতি রাত্রে?
রাজেশ আমতা আমতা করতে থাকেন এবার।
—যাই স্যার। অনেকেই যায়। কিন্তু বিশ্বাস করুন, বাবার কাছে টাকাও চাইনি আর ওসব বলিওনি ঠেকে। আপনি খোঁজ নিয়ে দেখুন স্যার।
—খোঁজ না নিয়ে কী আর বলছি? বাবাকে মেরে বাড়িটা হাতানোর মতলব করেছিলেন কিছু গুন্ডা-বদমাইশদের নিয়ে। ভুল বলছি?
রাজেশ রেগে যান হঠাৎ।
—হ্যাঁ স্যার, ভুল বলছেন। একশোবার ভুল বলছেন। হাজারবার ভুল বলছেন। আমি মরে গেলেও নিজের বাবাকে খুন করার কথা ভাবতেই পারব না। কী প্রমাণ আছে আপনাদের কাছে? যা খুশি বলে যাবেন, আর মেনে নিতে হবে?
সুশান্ত শোনেন চুপচাপ। সত্যিই, প্রমাণ তো কিছু নেই। এ তো স্রেফ আন্দাজে ঢিল ছোড়া চলছে। লাগলে তুক, না লাগলে তাক। মুখে অবশ্য বুঝতে দেন না রাজেশকে।
—কী প্রমাণ আছে, ঠিক সময়ে বলব। আমরা তো আর ঘাসে মুখ দিয়ে চলি না। কাল দুপুরের দিকে খবর পাঠাব। লালবাজারে চলে আসবেন।
রাজেশের চোখে আতঙ্কের ছায়া পড়ে।
—লালবাজারে কেন স্যার?
সুশান্ত থেমে থেমে উত্তরটা দেন, সময় নিয়ে।
—আসলে কী জানেন, থানায় বসে ঠিক হয় না। দেখছেন তো, কত লোক কত সমস্যা নিয়ে আসছে যাচ্ছে। এখানে ঠিক হয় না ব্যাপারটা। লালবাজারে আলাদা ঘর আছে জেরা করার। কাল আসুন, বুঝতে পারবেন। নিশ্চিন্ত থাকুন, যত্নআত্তির কোনও ত্রুটি হবে না।
রাজেশের আতঙ্ক দৃশ্যতই আরও গাঢ় হয়। লালবাজারে যত্নআত্তি মানে? পাশে বসে থাকা মন্টুবাবুর হাত চেপে ধরেন রাজেশ।
—মন্টুকাকু, স্যাররা ভাবছেন আমি বাবাকে মেরেছি। আমি কেন নিজের বাবাকে মারতে যাব? তুমি তো আমাকে ছোট থেকে দেখেছ। তোমার মনে হয়, আমি বাবাকে মারতে পারি? তুমি বলো স্যারকে …
মন্টু সত্যিই রাজেশকে জন্মাতে দেখেছেন, বিনোদের সঙ্গে প্রায় চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ বছরের অভিন্নহৃদয় বন্ধুত্ব। পিঠে হাত রাখেন পুত্রসম রাজেশের, তাকান সুশান্তর দিকে।
