—যেমন?
—ধরুন স্যার, রাজেশ। ব্যবসা থেকে একরকম তাড়িয়েই দিয়েছিল বাবা। অটো চালিয়ে আর ক’পয়সা হয়? নেশার ঠেকে প্রায়ই দেখা যায়, সোর্স ইনফর্মেশন। টাকার দরকার ছিল। মোটিভ? বাবাকে মেরে ব্যবসার দখল নেওয়া। মিসিং ডায়েরিটা স্রেফ আমাদের মিসলিড করতে। আর ওই আকুলিবিকুলি কান্নাটা স্রেফ নাটক।
—হুঁ…
—আবার একই কারণে দুই ভাই অশোক আর প্রদীপকেও সন্দেহের তালিকার বাইরে রাখা যায় না। ওদের আর্থিক অবস্থাও ভাল ছিল না। তার উপর দাদার এই রমরমা।
—হ্যাঁ, কিন্তু যদি উইল-টুইল বিনোদ না করে গিয়ে থাকেন, লেখাপড়া যদি কিছু না থাকে, বিনোদের মৃত্যুর পর তো ব্যবসার দখল নিয়ে রাজেশ আর ওর কাকাদের মধ্যে ঝামেলা লাগবে।
—আমি এই পয়েন্টেই আসছিলাম স্যার। এমন হওয়াও অস্বাভাবিক নয় যে রাজেশ আর তার দুই কাকা মিলেই বিনোদকে মেরেছে। আফটার অল, কাজটা কারও একার নয়। খুনটা যে একাধিক লোক মিলে করেছে, সেটা তো পরিষ্কার।
—হুঁ, অসম্ভব নয়। আর রীতা? বা বন্ধু যে দু’জনের কথা বললে, মন্টু, আর কী যেন নাম অন্যজনের?
—প্রবাল। দুই বন্ধু মিলেও করতেই পারে। কিন্তু মোটিভ তো কিছু দেখছি না। ছোটবেলার বন্ধুকে মারতে যাবে কেন হঠাৎ? আর রীতা নস্করের সঙ্গে তো এখনও কথাই বলা গেল না। আজ বলব।
—হ্যাঁ, শুধু রীতা নন, সকলের সঙ্গেই আর একবার ডিটেলে কথা বলো আজ, সময় নিয়ে। থানাতেই ডেকে নাও বিকেলের দিকে।
—রাইট স্যার।
—আর হ্যাঁ, রাজেশ এবং অন্য যাঁদের কথা বললে, মোবাইল রেকর্ডস পেয়েছ? ভিক্টিমেরটা?
—রিকুইজিশন কাল সন্ধেবেলায়ই পাঠিয়ে দিয়েছি। শেষ তিন মাসের চেয়েছি। আজ সন্ধের মধ্যে ডেফিনিটলি পেয়ে যাব।
—হ্যাঁ, ওটা থেকে ‘লিড’ কিছু একটা পাওয়া উচিত। আর না পেলেও কয়েকজনকে ‘এলিমিনেট’ অন্তত করতে পারবে সাসপেক্টদের লিস্ট থেকে।
.
১ অক্টোবর, কালীঘাট থানা। বিকেল সাড়ে চারটে।
থানায় উপস্থিত বর্মণ পরিবারের তিন সদস্য রাজেশ-অশোক-প্রদীপ, দুই বাল্যবন্ধু মন্টু দাস-প্রবাল দস্তিদার, এবং প্রতিবেশিনী রীতা নস্কর। সুশান্ত থানায় চলে এসেছেন সোয়া চারটেয়। এঁদের প্রত্যেকের ব্যাকগ্রাউন্ডের ব্যাপারে আরও অনেক খোঁজখবর নেওয়ার আছে। প্রত্যেকের গতিবিধির উপর নজর রাখাও প্রয়োজন। সেসব করাই যাবে। মোবাইল রেকর্ডস এসে যাবে সন্ধের মধ্যে। কোনও অসংগতি পেলে চেপে ধরতে আর কতক্ষণ? এক রীতা ছাড়া প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ এঁদের সবারই হয়ে গেছে। তবু আরও একবার বাজিয়ে নেওয়া দরকার সবাইকে। এবং এই ‘বাজিয়ে নেওয়া’-র কাজটা একটু অন্যভাবে করবেন, ঠিক করলেন সুশান্ত। শুরু হল দ্বিতীয় দফার জেরা।
জেরা নিয়ে কিছু কথা প্রাসঙ্গিক এখানে। বাস্তবের তদন্তের অভিজ্ঞতা যাঁদের আছে, তাঁদের যে কাউকে জিজ্ঞেস করে দেখবেন, জেরা বা জিজ্ঞাসাবাদ হল পৃথিবীর নীরসতম কাজগুলোর একটা। অন্তত তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়ে তো বটেই। শুরুর দিকে সন্দেহের পরিধি থাকে বিস্তৃত। নাম কী, বাবার নাম কী, বাড়ি কোথায়, কে কে আছে বাড়িতে, কী করেন, আগে কী করতেন… এমন গুচ্ছের কেজো প্রশ্নের মাধ্যমে সংগ্রহ তৈরি করতে হয় তথ্যভাণ্ডার। নীরস, কিন্তু জরুরি। ওটাই ভিত, ওটাই বুনিয়াদ। যার উপর বাড়ি উঠবে।
জেরার পদ্ধতি বা ‘Interrogation techniques’ নিয়ে প্রচুর তত্ত্ব আছে অপরাধবিজ্ঞানে। ১৯৭৪ সালে John E. Reid প্রবর্তিত ‘Reid Technique’ একসময় প্রবল সমাদৃত ছিল তদন্তকারীদের কাছে। বিশেষত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। Reid-এর তত্ত্বের নির্যাস হল, জেরায় যত বেশি সম্ভব তথ্য সংগ্রহ করো। তারপর অপরাধের ধরন এবং সন্দেহভাজনদের সঙ্গে সেই তথ্যের যোগসূত্র স্থাপন করো জিজ্ঞাসাবাদে।
কীভাবে? প্রত্যেক সন্দেহভাজনের জীবনধারা এবং চরিত্রবৈশিষ্ট্যের একটা ছবি এঁকে ফেলো মনে মনে। অমুকের আর্থ-সামাজিক অবস্থা কেমন, পারিবারিক জীবনই বা কেমন, কর্মজীবনে কতটা অস্থিরতা, প্রাথমিক প্রশ্নোত্তরে শরীরী ভাষায় কোনও উদ্বেগ ধরা পড়েছে কিনা, চিন্তিত হয়ে পড়লে কোনও মুদ্রাদোষ চোখে পড়ে কিনা, সব মগজে ‘স্টোর’ করে রাখো। সামগ্রিক ভাবে একটা নির্দিষ্ট ধারণা তৈরি করো, যাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে, তার ব্যাপারে। সেই ধারণার ভিত্তিতে পরের পর্যায়ে প্রশ্নমালার গতিপথ নির্ধারণ করো। সে প্রশ্ন কখনও হোক আন্তরিক এবং তথ্যমূলক, কখনও ব্যক্তিবিশেষে হোক প্ররোচনামূলক। প্রতিক্রিয়া লক্ষ করো গভীর মনোযোগে এবং অপেক্ষায় থাকো উত্তরের অসংগতির। পরিভাষায়, ‘factual analysis’ আর ‘behaviour analysis’।
Reid-এর তত্ত্ব নিয়ে বিতর্কও আছে। পালটা তত্ত্ব আছে। অনেকে মনে করেন, এ ভাবে অপরাধীর থেকে স্বীকারোক্তি আদায়ের পদ্ধতি ‘থিয়োরি’ হিসাবে শুনতে ভাল। তবে বাস্তবে কার্যকারিতা নিয়ে সন্দেহ আছে। সংশয় আছে ব্যবহারের বা শরীরী ভাষার তারতম্যের ভিত্তিতে ধারণা তৈরির বিষয়ে। পুলিশের প্রশ্নের মুখে পড়ে সম্পূর্ণ নিরপরাধ মানুষও নার্ভাস হয়ে যেতেই পারেন। হাতের তালু ঘেমে উঠতে পারে। পাল্স রেট বেড়ে যেতে পারে। অস্বাভাবিক কিছু নয়। আকছার হয়ে থাকে, দেখেছি আমরা। জেরার সময় ব্যবহারের পরিবর্তনের উপর মাত্রাতিরিক্ত গুরুত্ব আরোপের পক্ষপাতী নন Reid Technique-এর বিরোধীরা। Reid-এর পদ্ধতিতে তত্ত্বের নিরঙ্কুশ প্রাধান্য নিয়ে বরাবর আপত্তি জানিয়ে এসেছেন অপরাধবিজ্ঞানীদের একটা বড় অংশ।
