কখন হয়েছিল খুনটা? দ্বিধাহীন জানালেন ডাক্তারবাবু, ২৫ তারিখ সকাল সাড়ে দশটা থেকে দুপুর দুটোর মধ্যে। দেহ উদ্ধার হয়েছিল ২৯ তারিখ বিকেলে। বিনোদকে খুন করা হয়েছিল তার প্রায় ৯৬ ঘণ্টা আগে!
খুনিদের সন্ধান শুরু করলেন সুশান্ত। বিকেল থেকে প্রায় মাঝরাত, কালীঘাট থানা এলাকায় ঘাঁটি গেড়ে পড়ে থাকলেন। বিনোদের পরিবারের লোকজন, স্থানীয় মানুষ এবং ওই অঞ্চলের পরিচিত সোর্সদের সঙ্গে কথাবার্তা বলে যা তথ্য সংগ্রহ করলেন, সংক্ষেপে এরকম।
বর্মণ পরিবার আদতে বিহারের। কিন্তু প্রায় চার পুরুষ ধরে বসবাস কলকাতায়। কালীঘাটের ২, হিউম রোডের বাড়িতে। সোনারুপোর গয়নার পারিবারিক ব্যবসা ছিল বর্মণদের। বিনোদ বর্মণরা ছিলেন ছ’ভাই। বিনোদ সবার বড়। ব্যবসার দেখাশোনার পাশাপাশি কাজ করতেন ব্রিটানিয়া কোম্পানিতে। ২০০৩ সালে চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর পুরোপুরি মনোনিবেশ করেছিলেন ব্যবসায়।
মেজোভাই দিলীপ মারা গেছেন। সেজো ঘনশ্যাম তিরিশ বছর আগে বিবাগী হয়ে নিরুদ্দেশ। চতুর্থ ভাই অশোকের ব্যবসায়িক বুদ্ধির কিছু অভাব ছিল। স্বতন্ত্র দায়িত্ব নিতে গিয়ে প্রচুর টাকা লোকসান করেছিলেন। বিনোদকে সাহায্য করতেন ব্যবসার টুকিটাকি কাজে। কিন্তু ইদানীং সেটুকুও করতে পারতেন না ঘনঘন অসুস্থ হয়ে পড়ায়। পঞ্চম ভাইয়ের নাম প্রদীপ। ব্যবসার কাজে যে শ্রম এবং মনোযোগ প্রয়োজন, দুটোর কোনওটাই আয়ত্ত করে উঠতে পারেননি প্রদীপ। হাল ছেড়ে দিয়ে শেষ পর্যন্ত দিন গুজরান বাস্তুহারা বাজারে মাছ কেটে। ছোটভাই স্বপন জন্ম থেকেই বিকলাঙ্গ।
অসুস্থ বৃদ্ধা মা গোদাবরী দেবী মারা গিয়েছিলেন এই মাসের শুরুতেই। মা এবং বিকলাঙ্গ ছোটভাই স্বপনের চিকিৎসার সমস্ত খরচ বহন করতেন বিনোদই। ভাইদের মধ্যে আর্থিক সচ্ছলতা শুধু তাঁরই ছিল। প্রদীপ-অশোকের সংসারেও টানাটানি হত যখন, বড়দা বিনোদই ছিলেন সহায়।
বিনোদের স্ত্রী বেশ কয়েক বছর যাবৎ মানসিক ব্যাধিতে আক্রান্ত। চিকিৎসা চললেও উন্নতি হয়নি বিশেষ। একমাত্র পুত্র রাজেশ ব্যবসার হাল ধরুন, আপ্রাণ চেয়েছিলেন বিনোদ। সে চাওয়া পূর্ণ হয়নি। ব্যবসার কাজে নিয়মিত সময় দেওয়ায় তীব্র অনীহা ছিল রাজেশের। বরং প্রবল উৎসাহ ছিল ব্যবসার টাকা মদ-মাংস-মোচ্ছবে উৎসর্গ করায়। শেষমেশ সমস্ত ব্যবসায়িক দায়দায়িত্ব থেকে বাধ্য হয়েই রাজেশকে অব্যাহতি দেন বিনোদ। মাসে মাসে রাজেশের জন্য নামমাত্র হাতখরচ বরাদ্দ করেছিলেন। অগত্যা রাজেশ শুরু করেন অটো চালানো। বিয়ে করেছেন বছরদুয়েক আগে। এখনও নিঃসন্তান।
বিনোদের বন্ধুমহলে কারা ছিলেন? দুটো নাম পেলেন সুশান্ত, যাদের সঙ্গে বিনোদের বিশেষ ঘনিষ্ঠতা ছিল। মন্টু দাস এবং প্রবাল দস্তিদার। দু’জনেই বিনোদের সমবয়সি, বয়স ষাট ছুঁইছুঁই। দু’জনেই কালীঘাটে বিনোদের পাড়ারই বাসিন্দা বহু বছর ধরে।
মন্টুবাবু পটুয়াপাড়ায় মূর্তি গড়ার কাজ করেন। কালীঘাটে মায়ের মন্দিরে প্রায় নিত্য যাতায়াত। প্রবালের কালীঘাট মার্কেটে একটা জামাকাপড়ের দোকান আছে ছোট।
মন্টু-প্রবালের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে একটা তথ্য পাওয়া গেল। বিনোদের নারীবিষয়ে স্বাভাবিকের বেশিই দুর্বলতা ছিল। স্ত্রী মানসিক ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার পর থেকে যে দুর্বলতা বেড়েছিল উত্তরোত্তর। নিষিদ্ধ পল্লিতে যাতায়াত ছিল নিয়মিত। দুই আবাল্য বন্ধুর কাছে কিছুই অজানা ছিল না।
ঈশ্বর গাঙ্গুলি স্ট্রিটে যে বাড়িটা বিনোদ বছরের শুরুতে কিনেছিলেন, তার লাগোয়া বাড়িতে বাস রীতা নস্কর নামের এক বছর চল্লিশের মহিলার। যাঁর স্বামী মারা গেছেন বছর পাঁচেক হল। এক ছেলে, হস্টেলে থেকে পড়াশুনো করে, ক্লাস নাইনে। এই রীতার সঙ্গে বিনোদের সম্পর্ক নিয়ে পাড়ায় নাকি কানাঘুষো হচ্ছিল ইদানীং। বিনোদ-রীতাকে নাকি একসঙ্গে স্থানীয় সিনেমাহলে দেখা গিয়েছিল বেশ কয়েকবার, এমন কথাও রটেছিল পাড়ায়।
রীতাকে সেদিন জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারলেন না সুশান্ত। ছেলের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছেন হস্টেলে। পরের দিন সকালের ট্রেনে কলকাতায় ফেরার কথা।
.
১ অক্টোবর, সকাল এগারোটা। লালবাজার।
অফিসে এসেই সোজা ওসি হোমিসাইডের ঘরে ঢোকেন সুশান্ত। তদন্তে এখনও পর্যন্ত যা যা তথ্য এসেছে হাতে, জানাবেন। আলোচনাও প্রয়োজন, কী কী ভাবে এগোনো যায়, সে নিয়ে।
—স্যার, পরিচিত লোকজন হওয়ারই সম্ভাবনা বেশি। বিনোদ যে রোজ সকালে ওই সময় ঈশ্বর গাঙ্গুলি স্ট্রিটের বাড়িতে যেতেন, জানত খুনিরা।
—হুঁ, অ্যাপারেন্টলি তাই মনে হচ্ছে। একেবারে অচেনা-অজানা কেউ দিনের বেলায় এসে ঘরে ঢুকে মেরে পুঁতে দিয়ে যাবে, এটা হাইলি আনলাইকলি। আচ্ছা, ও রাস্তায় তো মোটামুটি মানুষজনের ভিড় লেগেই থাকে। কেউ কিছু দেখেনি? আই মিন, কাউকে ঢুকতে ও-বাড়িতে?
—দেখার তো কথা। তবে খোঁজখবর করার সময়ও তো বিশেষ পাইনি। গতকাল বিকেল থেকে রাত তো বেসিক ইনফর্মেশন নিতেই কেটে গেল।
—সোর্স?
—লাগিয়েছি স্যার। কাল-পরশুর মধ্যে কিছু না কিছু খবর আসবেই।
—আচ্ছা, ধরেই নেওয়া যাক, পরিচিতরা মেরেছে। কারা হতে পারে, ভেবেছ কিছু? মানে, প্রিলিমিনারি আইডিয়া কোনও?
—দেখুন স্যার, একদিনে তো সবটা জানা হয়ে ওঠেনি। পরিচিতির বৃত্তে কারা কারা ছিলেন, ব্যবসায়িক শত্রুতা কিছু ছিল কিনা, সেসব ডিটেলে জানতে আরও দিনদুয়েক তো লাগবেই। তবে যাঁদের কথা এখন পর্যন্ত জানা গেছে, তাঁরা কেউই সন্দেহের বাইরে নয়। মোটিভ সকলেরই ছিল অল্পবিস্তর।
