কার বাড়ি? স্থানীয় মানুষের থেকে জানা গেল, বাড়ির মালিকের নাম বিনোদ বর্মণ। এই বাড়িটা কিনেছেন বছরের শুরুর দিকে। তবে এখানে থাকেন না। কোথায় থাকেন? কালীঘাট শ্মশানের কাছে হিউম রোডে। এক অফিসার সঙ্গে সঙ্গেই গেলেন হিউম রোডে। এবং মিনিট কুড়ির মধ্যে ফিরলেন বছর তিরিশের এক যুবককে নিয়ে। কে ইনি? রাজেশ বর্মণ, এই বাড়ির মালিক বিনোদের একমাত্র ছেলে। পেশায় অটোচালক। বাড়ির সামনে ওই ভিড়ভাট্টা আর ভিতর থেকে দুর্গন্ধের বহর দেখে দৃশ্যতই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন রাজেশ। হাত চেপে ধরেন ওসি-র।
—স্যার, বাবা গত ২৫ তারিখ বেলা ১১টা নাগাদ আমাদের হিউম রোডের বাড়ি থেকে বেরিয়ে আর ফেরেনি। বাবা রোজ সকালে ঘণ্টাখানেকের জন্য এখানে আসত দেখভাল করতে। তারপর ব্যবসার কাজ সেরে রাতে ফিরত। সে-রাতে ফেরেনি দেখে এখানে এসেছিলাম খোঁজ করতে। তালা বন্ধ ছিল। আমরা ভাবছিলাম, হয়তো ব্যবসার জরুরি কোনও কাজে কলকাতার বাইরে গেছে। মাঝেমাঝেই যেতে হত। কিন্তু পরের দিনও যখন ফিরল না, তখন মিসিং ডায়েরি করেছি আপনাদের থানায়। রাতের দিকে। খুব ভয় করছে স্যার।
—তালাগুলোর ডুপ্লিকেট চাবি আছে আপনাদের বাড়িতে?
—না স্যার, চাবি এক সেটই ছিল। বাবা নিজের কাছে রাখত।
ওসি তাকান সঙ্গী সাব-ইনস্পেকটরের দিকে। যিনি বোঝেন, এখন কী করণীয়। তালাটা ভাঙতে হবে।
ভাঙা হল গ্রিলে লাগানো তিনটে তালা। ভিতরের দরজার তালাও। পুলিশ ঢুকল ভিতরে। দু’কামরার বাড়ি। একটা বাথরুম। আসবাবপত্র বিশেষ নেই। চেয়ার-টেবিল একটা করে, খাট একটা। যাতে সাদামাটা বেডশিট আর একটা বালিশ শুধু। বেশ বোঝা যায়, বাড়ি ফাঁকাই পড়ে থাকত। নিয়মিত বসবাস করত না কেউ। ব্যবহৃত হত না খাট-বিছানা।
গন্ধের উৎসের হদিশ ঘরে মিলল না। মিলল বাড়ির পিছন দিকে। বাউন্ডারি ওয়াল আর ঘরের গাঁথনির মাঝে একফালি লম্বা জায়গায়। যার একটা অংশে মাটি আলগা হয়ে আছে। উপরে থিকথিক করছে পোকা।
খোঁড়ার ব্যবস্থা করতে আধঘণ্টার মতো লাগল। মাটি কাটার লোক ডাকা হল। জোগাড় হল কোদাল-শাবল-ঝুড়ি। মাটি একটু খুঁড়তেই বেরল এক পুরুষের মৃতদেহ। কাদামাটি মাখা সারা শরীরে। পলকের দেখাতেই চিনলেন রাজেশ। দু’হাতে মুখ ঢেকে বসে পড়লেন মাটিতে।
—বাবা!
ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা এলেন। খুঁটিয়ে দেখলেন সব। জানালেন, যা বোঝা যাচ্ছিল সাদা চোখেও। খুনি বা খুনিরা গর্ত যেটা খুঁড়েছিল, সেটা গন্ধ ঢাকা দেওয়ার মতো গভীর ছিল না। আড়াই ফুট বাই ছয়-সাত ফুটের মতো খুঁড়ে মৃতদেহ শুইয়ে দেওয়া হয়েছিল। তারপর মাটি চাপা দেওয়া হয়েছিল আলগা ভাবে, তাড়াহুড়োয়। প্রমাণ লোপাটের কাজটা মোটেই পরিপাটি হয়নি। গর্তটা যদি আরও বেশ কিছুটা গভীরে খোঁড়া হত লম্বায়-চওড়ায়, সময় নিয়ে উপরে পর্যাপ্ত মাটি চাপা দেওয়া হত, পচনশীল দেহের গন্ধ এভাবে ছিটকে আসত না বাইরে। পচেগলে মাটির সঙ্গে মিশে গিয়ে একটা সময়ের পর পড়ে থাকত হাড়গোড়।
অপরাধের ঘটনাস্থল আদ্যোপান্ত খুঁটিয়ে দেখাটা তদন্তের গোড়ার কথা। সবাই জানে। তবে ওই গোড়ার রুটিনমাফিক কাজটায় এতটুকু ঢিলে দেওয়ার বিলাসিতা দেখানো যায় না। দেখালে ভুগতে হয় চার্জশিট দেওয়ার সময়। অপরাধের কিনারা করে ফেলেও হিমশিম খেতে হয় প্রমাণ জোগাড়ে। যে প্রমাণ হয়তো নাগালের মধ্যেই থাকত, ‘প্লেস অফ অকারেন্স’-এর তল্লাশিতে আরও বেশি মনোযোগী হলে।
মনোযোগে খামতি রাখল না পুলিশ। সন্ধে হয়ে গেছে। ড্রাগন লাইট নিয়ে ওসি হোমিসাইড আঁতিপাঁতি তল্লাশি শুরু করলেন বাড়ির। ‘কষ্ট করলে কেষ্ট’ বলতে মিলল একটা প্লাস্টিকের বোতাম। গর্ত যেখানে খোঁড়া হয়েছিল, তার ফুট দশেক দূরে। মৃতের শার্ট ছিঁড়ে গিয়ে ছিটকে পড়েছিল? খুনি বা খুনিদের সঙ্গে ধস্তাধস্তির সময়? বোতাম ছাড়াও সংগ্রহ করা হল ঘরের দেওয়ালে ছোপ ছোপ বাদামি দাগের স্যাম্পল। নিশ্চয়ই শুকিয়ে যাওয়া রক্ত?
সময় লাগল তল্লাশি প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হতে। বিনোদ বর্মণের দেহ যখন বেরল মোমিনপুরের কাঁটাপুকুর মর্গের উদ্দেশে, রাত গড়িয়ে প্রায় সাড়ে এগারোটা। ইতিমধ্যে গোয়েন্দাপ্রধান এবং ডিসি সাউথ ঘুরে গেছেন অকুস্থল। ফোনে সব জানানো হয়েছে নগরপালকে। যিনি পত্রপাঠ কেসের তদন্তের ভার দিয়েছেন গোয়েন্দা বিভাগকে। রহস্যভেদের দায়িত্ব পেয়েছেন হোমিসাইড বিভাগের তৎকালীন সাব-ইনস্পেকটর সুশান্ত ধর (বর্তমানে গোয়েন্দা বিভাগেরই অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার হিসাবে কর্মরত), যিনি লালবাজার থেকে কালীঘাট আসার পথে সঙ্গী হয়েছিলেন ওসি হোমিসাইডের।
ময়নাতদন্ত হতে হতে পরের দিন দুপুর গড়িয়ে গেল। এই জাতীয় খুনের মামলায় অনেক ক্ষেত্রেই পোস্টমর্টেমের সময় তদন্তকারী অফিসার নিজেই উপস্থিত থাকেন। সুশান্তও ছিলেন। ময়নাতদন্ত জানাল, মাথায় কোনও ভারী জিনিসের আঘাতে খুন, ‘ante-mortem and homicidal’। এটুকু অনুমেয়ই ছিল। বাড়তি যেটা ডাক্তারবাবু বললেন, সেটাও মৃতদেহ আবিষ্কারের সময়ই আন্দাজ করা গিয়েছিল। এই খুনে ‘খুনি’ নয়, ‘খুনিরা’ যুক্ত। মৃত বিনোদের শারীরিক গঠন ছিল যথেষ্ট মজবুত। তাঁকে কাবু করে, নিশ্বাস বন্ধ করে মারার পর গর্ত খুঁড়ে পুঁতে দেওয়া, একার পক্ষে প্রায় অসম্ভবই।
