রাতেই আশিকের নেতৃত্বে রাজেশকে নিয়ে টিম রওনা দিল ওড়িশায়। গ্রামের বাড়ি থেকে উদ্ধার হল সেই ভিআইপি সুটকেস। যার মধ্যে ভরতি টাকার বান্ডিল। সব মিলিয়ে এক লক্ষ আটান্ন হাজার। পাওয়া গেল রক্তমাখা শার্ট, যার দুটো বোতাম নেই। কলকাতায় ফিরে রাজেশের বয়ান অনুযায়ী অশোকা রোডের ফুটপাথ সংলগ্ন একটা ঝোপ থেকে পাওয়া গেল স্টোররুমের সেই চাবি। ফরেনসিক পরীক্ষায় প্রমাণিত হল, রাজেশের ওড়িশার বাড়ি থেকে পাওয়া শার্টের বোতাম আর ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া দুটো বোতাম একই পোশাকের। কী বাকি থাকে আর পারিপার্শ্বিক প্রমাণের? কী বাকি থাকে আর অভিযুক্তের দোষী সাব্যস্ত হওয়ার?
শাস্তি হয়েছিল যাবজ্জীবন কারাবাসের। আশিকের তদন্ত প্রশংসা কুড়িয়েছিল আদালতের।
মার্ডার ফর গেইন। টাকার জন্য খুন। লাভের জন্য খুন। লাভ কি হয় আদৌ? হয় ‘গেইন’ আদৌ?
আইন তো যথাসময়ে এসে কড়া নাড়েই দরজায়।
পুনশ্চ: অনিল এবং সুনীল, এই নামদুটি পরিবর্তিত।
২.০৭ বিপুলা এ পৃথিবীর যতটুকু জানি
[বিনোদ বর্মণ হত্যা
সুশান্ত ধর, সহ নগরপাল, গোয়েন্দাবিভাগ। ২০০৪ সালে পেয়েছেন ভারত সরকারের ‘ইন্ডিয়ান পুলিশ মেডেল’। ২০১১ সালে সম্মানিত হয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর ‘প্রশংসা পদক’-এ।]
—বাবা!
নিস্তব্ধতা ভেঙে একটা আর্তচিৎকার। তারপর হাঁটু মুড়ে মাটিতেই বসে পড়ে অঝোর কান্না। পোড়খাওয়া পুলিশ অফিসাররাও থামাতে পারছিলেন না তিরিশ বছরের যুবককে। যাঁর বাবার দেহ ততক্ষণে বাইরে আনা হয়েছে মাটি খুঁড়ে। যুবক কেঁদে চলেছেন জন্মদাতার দেহ আঁকড়ে ধরে।
‘দেহ’ মানে যতটুক অবশিষ্ট রয়েছে আর। পচন ধরেছে। কাদামাটির প্রলেপ সর্বাঙ্গে। বালতি বালতি জল দিয়ে ধুয়েমুছে কিছুটা পরিষ্কার হল অবয়ব। দেখে যতটা আন্দাজ করা যায়, মৃতের বয়স ষাটের কাছাকাছি হবে। হাফ প্যান্ট আর স্যান্ডো গেঞ্জি গায়ে। মাথার বাঁ দিকে দুটো গভীর ক্ষত। মুখ বাঁধা একটুকরো কাপড় দিয়ে। গলায় ফাঁসের দাগ স্পষ্ট। ডান হাতে উল্কিতে আঁকা ত্রিশূল। বাঁ হাতের উল্কিতে লেখা, ‘বিনোদ’।
কালীঘাট থানার বড়বাবু মোবাইল বার করেন পকেট থেকে। ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টকে এখনই জানানো দরকার। ফোনে ধরেন ওসি হোমিসাইডকে।
—স্যার, বডি রিকভার্ড হয়েছে একটা। সেমি-ডিকম্পোজ়ড। ঈশ্বর গাঙ্গুলি স্ট্রিটে। মাটির নীচে পোঁতা ছিল। গলায় ‘লিগেচার মার্ক’ আছে। হেড ইনজুরি ভিজিবল। মার্ডার।
ফোন রেখে দুটো কাজ করেন ওসি হোমিসাইড। এক, ডিডি-র ফটোগ্রাফি সেকশনে নির্দেশ, ফটোগ্রাফার যাতে যত দ্রুত পৌঁছে যায় স্পটে। দুই, ফরেনসিক সায়েন্স ল্যাবরেটরির ডিরেক্টরকে ফোন করে ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিয়ে অনুরোধ, ‘স্যার, একটা টিম যদি তাড়াতাড়ি পাঠানো যায়, দেখুন প্লিজ়।’
পরের কাজ বলতে গোয়েন্দাপ্রধানকে খবরটা জানানো এবং দু’-তিনজন সহকর্মীকে নিয়ে তড়িঘড়ি গাড়িতে উঠে বসা। ড্রাইভার গৌতম গাড়ি স্টার্ট দিতে দিতে হাতঘড়ির দিকে তাকান। বিকেল চারটে। মানে,আজ বাড়ি ফিরতে ফিরতে হয়তো মাঝরাত হয়ে যাবে।
বহু বছর হয়ে গেল হোমিসাইড বিভাগের গাড়ি চালাচ্ছেন। ওসি যখন এত হন্তদন্ত হয়ে গাড়িতে উঠে বসছেন, নির্ঘাত খুন হয়েছে কোথাও। এবার ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে তদন্ত চলবে। লালবাজারের কর্তারা আসবেন একে একে। সন্ধে পেরিয়ে রাত গড়িয়ে যাবে। সারারাত বাড়ি ফেরা হয়নি, গাড়ি নিয়ে ছুটতে হয়েছে টালা থেকে টালিগঞ্জ, এমন যে কত হয়েছে এতদিনের চাকরিতে। কে জানে আজ কপালে কী আছে?
লালবাজারের গেট পেরিয়ে ডানদিকে টার্ন নিতে নিতে জিজ্ঞেস করেন গৌতম।
—কোথায় স্যার?
—কালীঘাট। হরিশ মুখার্জি রোড ধরো, তাড়াতাড়ি হবে। থানার কাছেই।
থানার কাছে বলেই চাঞ্চল্য আরও বেশি। গাড়ি ঢুকতেই পারল না ঈশ্বর গাঙ্গুলি স্ট্রিটে। আটকে গেল। সরু রাস্তায় জমাট ভিড় স্থানীয় মানুষের। ঠেলেঠুলে ওসি হোমিসাইডকে রাস্তা করে দিলেন কালীঘাট থানার এক কনস্টেবল, যাঁর মুখে রুমাল চাপা দেওয়া, ‘আসুন স্যার, বড়বাবু আর বাকিরা বাড়ির ভিতরে। যা দুর্গন্ধ, টেকা যাচ্ছে না।’
টেকা যে মুশকিল, গলিতে ঢুকতে ঢুকতেই টের পেয়েছিলেন ওসি হোমিসাইড। অবাক হননি। ফোনে তো জেনেইছেন, বডি সেমি-ডিকম্পোজ়ড। পচতে থাকা মনুষ্যদেহের গন্ধে অন্নপ্রাশনের ভাত মুখে উঠে আসারই কথা। বাড়ির ভিতরে ঢুকে যখন ‘বডি’-র উপর চোখ রাখলেন প্রথম, তখনও মৃতদেহের পাশে বসে আছাড়িপিছাড়ি কেঁদে চলেছেন যুবক। ফটোগ্রাফার এসে গেছেন। দেহের ছবি উঠছে বিভিন্ন দিক থেকে। শাটার টেপার ‘ক্লিক ক্লিক’ আওয়াজ ঢাকা পড়ে যাচ্ছে সদ্য পিতৃহারার বিলাপে।
.
বিনোদ বর্মণ হত্যা মামলা। কালীঘাট থানা। কেস নম্বর ১৫৬, তারিখ ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০০৫। ধারা, ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩০২ এবং ২০১। খুন এবং প্রমাণ লোপাট।
২০/৩/সি ঈশ্বর গাঙ্গুলি স্ট্রিটের একটি তালাবন্ধ বাড়ি থেকে দুর্গন্ধ বেরচ্ছে, ফোনে খবর এসেছিল কালীঘাট থানায়। থানার খুব কাছেই ওই রাস্তা। দূরত্ব খুব বেশি হলে আড়াইশো মিটার। ওসি পৌঁছলেন দ্রুত।
একটা ছোট একতলা পাকা বাড়ি। ঢোকার মুখে লোহার গ্রিল। যাতে তিনটে তালা ঝুলছে। ঘরের মধ্যে ঢোকার দরজা গ্রিলের পিছনে। সেই দরজাতেও তালা ঝুলছে একটা। কৌতূহলী জনতা ভিড় জমিয়েছে বাড়ির সামনে।
