—আমার বাবার কোনও অসুখ-টসুখ হয়নি স্যার। গ্রামের বাড়ির এক বন্ধুকে বলেছিলাম, যে বাড়িতে কাজ করি, সেখানে ছুটি কিছুতেই দিতে চায় না। তুই ফোন করে বলবি, বাবার অসুখ। তা হলে এক সপ্তাহের জন্য বাড়ি আসতে পারব।
—তারপর?
—স্যার, বাড়িতে আমি যাইনি। নরেন্দ্রপুরে আমাদের এক দূরসম্পর্কের মাসি থাকেন। বউবাজারে একটা বাড়িতে কাজ করেন। ওঁর বাড়িতে গিয়ে উঠেছিলাম আট তারিখ। আমাকে ঘরের চাবি দিয়ে মাসি সকালে বেরিয়ে যেত কাজে। আমি বেরলে চাবিটা জানালা দিয়ে হাত গলিয়ে কাছের একটা টেবিলের উপর রেখে দিতাম। আমার ফেরার আগে মাসি চলে এলে হাত ঢুকিয়ে চাবিটা নিয়ে দরজা খুলত।
—বেশ ..
—পরের দিন, ভবানীপুরের একটা দোকান থেকে একটা ভিআইপি সুটকেস কিনলাম। তার পরের দিন Yuva দেখলাম বসুশ্রীতে। এগারো তারিখ ভোরে অ্যাপার্টমেন্টে ঢুকলাম।
—এগারো তারিখ ভোরে?
—হ্যাঁ স্যার, এগারো তারিখ।
—কীভাবে ঢুকলি?
—স্যার, গেট দিয়ে ঢুকতে পারব না জানতাম। নাইটগার্ড দু’জনের একজন জেগে থাকত, একজন ঘুমোত পালা করে। গেটে তালা দিয়ে রাখত রাত বারোটার পর। ঢোকার রাস্তা ছিল না।
—তা হলে?
—বাড়িটার চারদিকে বেশ কিছু উঁচু গাছ আছে, নিশ্চয়ই দেখেছেন স্যার। পশ্চিম দিকে বেশি। আমি আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছিলাম, গাছে উঠে ওখান দিয়ে পাঁচিল টপকাব। টপকে বাড়ির ভিতর যাওয়ার সময় পাঁচিলের তারে লেগেছিল পায়ে।
—দেখা …কোথায় লেগেছিল?
ট্রাউজার হাঁটু অবধি তুলে ক্ষতচিহ্ন দেখায় রাজেশ। ফের বলতে শুরু করে।
—ওই সময়টায় লিফটম্যান থাকে না, কেয়ারটেকারের অফিসের সামনে খাটিয়ায় অচ্ছেবর ভাইয়া ঘুমিয়ে থাকে। কেউ কোত্থাও থাকে না। সোজা সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেলাম ছাদে। অন্য কাজের লোকেরা তখন সবাই ঘুমোচ্ছে।
—তারপর?
—ছাদে উঠে সিঁড়ি দিয়ে নেমে এগারো তলার রান্নাঘরের সামনে নেমে এলাম। জানতাম, মা-জি ভোরে উঠবে। পাঁচটা সাড়ে পাঁচটা নাগাদ দরজা খুলে দিয়ে পুজোয় বসবে। সাড়ে ছ’টা পর্যন্ত ঠাকুরঘরে পুজো করবে। বারান্দা থেকে কালীঘাট মন্দিরের চুড়ো দেখা যেত। পুজো শেষ হলে দশ মিনিট বারান্দায় দাঁড়িয়ে ওদিকে তাকিয়ে প্রণাম করত মা-জি। দরজা খুলে গেল সাড়ে পাঁচটায়। মিনিট দশেক অপেক্ষা করে ঢুকে পড়লাম ভিতরে।
—হুঁ…
—বসার ঘরে এসে হলঘরের কোনায় যে বাথরুমটা সবসময় বন্ধ থাকত, সেটার ছিটকিনি খুলে ঢুকে পড়লাম। ভিতর থেকে বাথরুমের দরজা বন্ধ করে দিলাম।
—বাথরুমে?
—লুকোনোর ওটাই সবচেয়ে ভাল জায়গা ছিল স্যার। ওই বাথরুমটা বহু বছর ব্যবহার হয় না। ওর মধ্যে কেউ থাকতে পারে, কেউ ভাবতেও পারবে না, জানতাম।
—তারপর?
—ভেবেই রেখেছিলাম, খুনটা রাতে করে পরদিন ভোরে বেরিয়ে যাব। সারাদিন ওই বাথরুমেই থাকলাম।
আশিক এবং সঙ্গীরা স্তব্ধ হয়ে যান। বলে কী! এভাবেও প্ল্যান করা যায়!
—সঙ্গে একটা চটের ব্যাগ ছিল। মাসির বাড়ি থেকে একটা বড় কাঠ কাটার ছুরি এনেছিলাম। দু’প্যাকেট বিস্কুট আর কয়েকটা টিফিন কেকও এনেছিলাম। সারাদিনে ওগুলো খেলাম। বাথরুমেই ঘুমোলাম। একটুও সাড়াশব্দ করিনি সারাদিন। অপেক্ষা করে থাকলাম রাতের জন্য।
—বলতে থাক…
—রাত যখন তিনটে, বাথরুম থেকে বেরলাম। মা-জি নিজের শোবার ঘরে ঘুমোচ্ছে। বারান্দায় লোহার পাইপ রাখা ছিল কয়েকটা। একটা নিলাম। আগে মা-জি র মুখ চেপে ধরলাম। জেগে গেল। আমার জামাটা চেপে ধরল। টানাহ্যাঁচড়া হল। পাইপ দিয়ে মা-জির মাথায় মারলাম জোরে। রক্ত বেরচ্ছিল খুব। বেডশিট দিয়ে মুড়লাম মা-জিকে। টেনে টেনে নিয়ে গেলাম। ড্রয়ারে স্টোররুমের চাবি থাকত। সেটা দিয়ে স্টোররুম খুলে ঢোকালাম বডিটাকে।
—হুঁ…
—মা-জির তখনও নিশ্বাস পড়ছিল। ভয় পেয়ে গেলাম, তা হলে কি মরেনি? ছুরিটা চালালাম গলায়। ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরতে লাগল। একটু পরে নাকে হাত দিয়ে দেখলাম, নিশ্বাস বন্ধ হয়ে গেছে।
—এরপর আলমারি খুললি, টাকাপয়সা নিলি, ব্যাগে ভরলি…
—হ্যাঁ স্যার, বেরিয়ে এলাম রান্নাঘর দিয়ে। ছাদে উঠে আবার সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলাম। যেভাবে ঢুকেছিলাম, সেভাবেই বেরলাম। পাঁচিল টপকে। চটের ব্যাগটা আগে ছুড়ে বাইরে ফেললাম। তারপর দেওয়াল টপকে বেরিয়ে এলাম। তখন ভোর পাঁচটা সোয়া পাঁচটা হবে।
—তারপর?
—নরেন্দ্রপুরে মাসির বাড়িতে এলাম। মাসি তখন কাজে বেরিয়ে গেছে। ভিআইপি-তে টাকাপয়সা ভরে হাওড়া স্টেশনে গিয়ে ট্রেন ধরলাম ওড়িশার। পরদিন খুব ভোরে পৌঁছলাম। বাড়িতে সুটকেসটা রেখে এসেছি। বাড়িতে বললাম, একদিনের জন্য এসেছি। ত্রিলোকিদা বিকেলে ফোন করল। বলল, পুলিশ চলে আসতে বলছে। মা-জি খুন হয়ে গেছেন। আমি গতকাল বিকেলের ট্রেন ধরে আজ কলকাতা চলে এলাম।
—স্টোররুমের চাবিটা?
—কয়েকটা বাড়ি পরে একটা ঝোপের মধ্যে ফেলে দিয়েছি। চলুন স্যার, দেখিয়ে দিচ্ছি।
—সে তো যাবই, কিন্তু তোকে তোর মা-জি এত ভালবাসতেন, মারলি কেন?
—টাকার লোভে স্যার। বারোশো টাকা মাইনে পেতাম স্যার। ওতে কিছু হয়? সিনেমায় দেখতাম বড়লোকরা কীভাবে জীবন কাটায়। কত মস্তি। ভাবতাম, সারাটা জীবন কি এই চাকরগিরি করেই কেটে যাবে? কিছুদিন পরে সব ঠান্ডা হয়ে গেলে চাকরিটা ছেড়ে দেব ভেবেছিলাম। ভেবেছিলাম, টাকাটা দিয়ে ব্যবসা শুরু করব কিছু।
