অপেক্ষা ছাড়া কী আর করার? আশিক আনমনা তাকিয়ে থাকেন গাড়ির বাইরে। বসুশ্রীর ইভনিং শো শুরু হওয়ার মুখে। লোক ঢুকছে। সিনেমার পোস্টারের দিকে তাকান আশিক। ‘Yuva’.. starring Ajay Devgan, Abhishek Bachchan..।
এই ছবিটার কথাই বলছিল রাজেশ ছেলেটা। অজয় দেবগনের ফ্যান, কোনও ছবিই নাকি মিস করে না। নিজের ওই বয়সটার কথা মনে পড়ে আশিকের। অমিতাভ বচ্চনের একটা ছবিও মিস করতেন না তখন। এখনও করেন না। বিগ বি-র কত ছবি যে এই বসুশ্রীতেই দেখেছেন। তবে এই হলে দেখা যে ছবিটা মনে সবচেয়ে বেশি দাগ কেটেছিল, তার প্রতিটা দৃশ্য এখনও মুখস্থ বলতে পারবেন। ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’।
মিছিল হাজরা মোড় পেরিয়ে গেছে। সিগন্যাল গাঢ় সবুজ। গাড়িঘোড়া চলতে শুরু করেছে ফের। যখন গাড়ি যদুবাবুর বাজার পেরোচ্ছে, হঠাৎই আশিক তরঙ্গস্রোত টের পান মস্তিষ্কের ধূসর কোষগুলোয়। যাকে Hercule Poirot বলতেন, ‘the little grey cells’।
—এই, গাড়ি ঘোরাও!
ড্রাইভার অবাক দৃষ্টিতে তাকান পিছন ফিরে। অধৈর্য আশিক ফের নির্দেশ দেন।
—বলছি তো গাড়ি ঘোরাও!
গাড়ি ফের দক্ষিণমুখী। থেমেছে গিয়ে সেই হাজরা মোড়েই। আশিক সোজা গিয়ে ঢুকেছেন বসুশ্রীতে, ম্যানেজারের ঘরে। পুলিশ দেখে ম্যানেজার সামান্য হতচকিত। উঠে পড়েছেন চেয়ার ছেড়ে।
—কী ব্যাপার স্যার?
—তেমন কিছু না, একটা ব্যাপার জানার ছিল।
—বলুন না স্যার… আপনার জন্য চা-কফি কিছু…
—না না, দরকার নেই… সামান্য ব্যাপার… আচ্ছা, এই ‘Yuva’ বলে সিনেমাটা কতদিন ধরে চলছে এখানে?
—এই তো গত সপ্তাহ থেকে স্যার, মানে গত শুক্রবার ৬ তারিখ থেকে। রিলিজ় হয়েছে মাসদুয়েক আগে। অন্য একটা ছবি ভাল চলছিল। ‘Yuva’ লেগেছে গত সপ্তাহ থেকে।
আশিকের হৃদ্স্পন্দন বেড়ে যায় হঠাৎ। তা হলে কি যা ভাবছেন, তা-ই? আজ শনিবার, ১৪ তারিখ। ছবি রিলিজ় করেছে ৬ তারিখ। মানে বসুশ্রীতে ছবিটা দেখতে গেলে ৬ থেকে ১৩-র মধ্যে দেখতে হবে রাজেশকে। রাজেশ ছুটিতে ওড়িশা গিয়েছিল ৮ তারিখ। ফিরেছে আজ বিকেলে। তা হলে ছবিটা দেখল কবে? যদি ছয় বা সাত তারিখে দেখে না থাকে, তা হলে ৮ থেকে ১৩-র মধ্যে দেখেছে। কিন্তু বলল তো গত মাসে বসুশ্রীতে দেখেছে! কী করে সম্ভব? ছুটিতে ওড়িশায় যাওয়ার গল্পটা তা হলে ডাহা মিথ্যে? ওই সময়টার মধ্যে কোনও একদিন অন্তত কলকাতায় ছিল? বাবার অসুখের নাম করে ছুটি নিয়ে কেন ছিল শহরে? মিথ্যে বলল কেন? যার একটা মিথ্যে ধরা পড়ে গেছে, তাকে আর বিশ্বাস করা চলে না।
যতটা না সমাপতন, তার থেকে ঢের বেশি কাজ করেছিল তদন্তকারীর সহজাত অনুসন্ধিৎসু প্রবৃত্তি। গাড়িতে ফিরতে ফিরতে বসুশ্রীতে দেখা ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’ স্মৃতিতে ফিরে এসেছিল আশিকের, প্রিয় সেই দৃশ্যটা চোখের সামনে ভেসে উঠেছিল হঠাৎ, মনে পড়েছিল সংলাপটা। এবং মনে পড়তেই যদুবাবুর বাজারের কাছে গাড়ি থামিয়ে দিয়েছিলেন আশিক, ড্রাইভারকে বলেছিলেন গাড়ি ঘোরাতে।
ছবিটা যখন দেখেছিলেন, তখন বোধহয় ক্লাস নাইন বা টেন। শেষ দৃশ্যে মছলিবাবার বেশধারী ফেলুদা নয়, মগনলালের ডেরায় লালমোহনবাবুর দিকে তাক করে সেই ‘knife throwing’-এর দমবন্ধ করা সিনটাও নয়, কিশোর আশিকের সবচেয়ে ভাল লেগেছিল ছবির অন্য একটা জায়গা। যেখানে ঘোষালবাড়ির কর্মী বিকাশের মিথ্যে ধরে ফেলেছিল ফেলুদা। একটা নির্দিষ্ট সময়ে কোথায় ছিলেন, জানতে চাওয়ায় বিকাশ বলেছিলেন, গান শুনছিলেন রেডিয়োতে। আখতারি।
ফেলুদার সন্দেহ হওয়াতে যাচাই করেছিল আকাশবাণীর প্রোগ্রাম তালিকা থেকে। ওইসময় আখতারি হচ্ছিলই না। আশিকের দারুণ লেগেছিল মিষ্টির দোকানে ফেলুদার চেপে ধরা বিকাশকে, কোমরে আগ্নেয়াস্ত্র ঠেকিয়ে নিয়ে যাওয়া যন্তরমন্তরের ছাদে, সেই সংলাপ সহ, ‘যার একটা মিথ্যে ধরা পড়ে গেছে, তাকে আর বিশ্বাস করা চলে না।’
রাজেশেরও একটা মিথ্যে ধরা পড়ে গেছে, তাকেও আর বিশ্বাস করা চলে না। উকিলের বাড়ি আর যাওয়া হল না আশিকের। গাড়ি ঘুরিয়ে সোজা ‘শ্রীনিকেত অ্যাপার্টমেন্টস’। রাজেশ ছিল ছাদের সার্ভেন্টস কোয়ার্টারে। আশিক এগারো তলায় নামিয়ে আনলেন। কোন ভণিতা না করে চোখে চোখ রাখলেন রাজেশের।
—Yuva সিনেমাটা কেমন লেগেছিল?
হঠাৎ এ প্রশ্নে কিছুটা থতমত খেয়ে যায় রাজেশ।
—মানে?
—বলছি, কেমন লেগেছিল?
—ভাল স্যার…
—কবে দেখলি?
—এই তো গত মাসে স্যার। আপনাকে বললাম তো বিকেলে, বসুশ্রীতে।
আর কিছু জিজ্ঞাসা করার ছিল না আশিকের। কলার চেপে ধরে হিড়হিড় করে ফ্ল্যাটের বাইরে লিফটে। নীচে নেমে গাড়িতে তুলে সোজা লালবাজার। গাড়িতে একটা শব্দও ব্যয় করলেন না আশিক। বেশ বুঝতে পারছিলেন, ঘামতে শুরু করেছে পাশে বসা রাজেশ। মুখচোখ থেকে ব্লটিং পেপার দিয়ে যেন রক্ত শুষে নিয়েছে কেউ।
কতশত ধুরন্ধর অপরাধীর লালবাজারের ইন্টারোগেশন রুমে হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যেতে দেখেছেন আশিক, ইয়ত্তা নেই। তুলনায় এ ছোকরা তো নেহাতই চুনোপুঁটি! হাতি-ঘোড়া যেখানে তলিয়ে যায়, মশা সেখানে কী করে জল মাপবে? খুচরো চড়-থাপ্পড় খরচ হল একটা-দুটো, এবং বলতে শুরু করল রাজেশ। গোয়েন্দারা শুনতে থাকলেন ললিতাদেবীর হত্যার রুদ্ধশ্বাস নেপথ্যকথা।
