—স্যার…
—একটা কথা বলি শোনো তোমায়। আমরা যখন ব্যারাকপুরের পুলিশ ট্রেনিং কলেজে প্রবেশনার ছিলাম, একজন আইপিএস অফিসার গেস্ট লেকচারার হিসেবে ইনভেস্টিগেশনের উপর একটা ক্লাস নিয়েছিলেন। শার্লক হোমসের রেফারেন্স দিয়েছিলেন একটা। নোট করে নিয়েছিলাম। মনে গেঁথে আছে এখনও।
—কী স্যার?…
—আর্থার কোনান ডয়েলের একটা উপন্যাস আছে, পড়েছ কিনা জানি না, ‘The Sign of the Four’। যেখানে হোমস এক জায়গায় বলছেন, ‘When you have eliminated the impossible, whatever remains, however improbable, must be the truth.’
—স্যার….
—যা যা অসম্ভব, যা যা হতেই পারে না, সেগুলো একটা একটা করে বাদ দাও। যা পড়ে থাকবে, সেটা যতই কল্পনাতীত মনে হোক, সত্যি হতে বাধ্য। এক্ষেত্রেও যা যা অসম্ভব, বাদ দাও একটা একটা করে। এই এলিমিনেশনটা করতে সময় লাগবে, কিন্তু ধৈর্য হারিয়ো না। একটা সময় দেখবে, যেটা ভাবোইনি কখনও, সেটাই আসলে ঘটেছে। সেটাই সত্যি!
আশিক শোনেন চুপচাপ। মাথা নেড়ে বেরিয়ে আসেন। ফের গন্তব্য আলিপুর। যেতে যেতে ভাবেন, আবাসনের পুরো কম্পাউন্ডটা আঁতিপাঁতি করে তল্লাশি করা হয়েছিল ঘটনার দিন। কিছুই পাওয়া যায়নি। গল্পের গোয়েন্দা হলে নির্ঘাত খুঁজে পেতেন আধপোড়া সিগারেটের টুকরো, কাদায় পায়ের ছাপ কিংবা নিদেনপক্ষে কোনও হুমকি-চিরকুট! কল্পনার শার্লক হোমসের তত্ত্বকথা শুনতে ভাল। বাস্তব অনেক রুক্ষ জমির।
জিজ্ঞাসাবাদ আজও সারাদিন ধরে চালিয়ে যাওয়াই যায়। চালাতে হবেও। কিন্তু ‘লিড’ তো দরকার একটা এগোনোর। কাউকে চেপে ধরতে গেলে, সে বাড়ির লোকই হোক বা কাজের লোক, একটা সূত্র তো দরকার। সেটা কোথায়?
সূত্র অমিলই থাকল। তথ্যসংগ্রহের কাজ যা যা বাকি ছিল, করলেন আশিক। আবাসনের বাসিন্দাদের অনেকের সঙ্গে কথা বললেন দীর্ঘক্ষণ। অজানা কোনও তথ্য আর উঠে এল কই?
১৩ তারিখ রাত্রে আবাসন থেকে বেরনোর সময় ইলেকট্রনিক মিডিয়ার জনাকয়েক সাংবাদিক ছুটে এসে ‘বুম’ ধরলেন আশিকের মুখের সামনে। পাশ কাটিয়ে গাড়িতে ওঠার সময় আশিক শুনতে পেলেন, ‘আপনারা দেখলেন দিনভর তদন্তের পর ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের অফিসাররা বেরিয়ে এলেন অ্যাপার্টমেন্ট থেকে। আমাদের প্রশ্নের উত্তরে মুখে কুলুপ এঁটেছে পুলিশ। খুনের পর প্রায় আটচল্লিশ ঘণ্টা হতে চলল, অথচ …’
পরের দিন, ১৪ অগস্টের দুপুরে যখন শ্রীনিকেত-এ পৌঁছলেন আশিক, ততক্ষণে আটচল্লিশ ঘণ্টা সত্যিই পেরিয়ে গিয়েছে ললিতা-হত্যার পর। ছুটিতে থাকা দুই কাজের লোক ফিরে এসেছেন। অমলেশ দুপুরে। রাজেশ বিকেলের দিকে। যাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করে নতুন কিছু পাওয়া গেল না। অন্যরা যা বলেছিলেন, ওঁরাও তাই বললেন… ললিতার ব্যবহার মাঝেমাঝে রুক্ষ হলেও আদতে সহৃদয় প্রকৃতির মহিলা ছিলেন।
অমলেশের গলা বুজে এল ললিতার কথা বলতে গিয়ে।
—আমার স্ত্রী-র অপারেশনের জন্য ছুটিতে গিয়েছিলাম। হাজার তিরিশেক টাকার মতো খরচ হত। দিদা বলে ডাকতাম ওঁকে। ধার চেয়েছিলাম কিছু। পাঁচ হাজার এক কথায় দিয়ে দিয়েছিলেন।
—কোথায় অপারেশন হল স্ত্রী-র? কী অসুখ?
—মধ্যমগ্রামের নার্সিংহোমে স্যার। গলব্লাডারে স্টোন। পেটে অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছিল। এখন ঠিক আছে।
রাজেশও কেঁদে ফেললেন ‘মা-জি’-র কথা বলতে গিয়ে।
—মা-জি আমাকে ছেলের মতো ভালবাসত। বকাঝকা করলে পরে গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে দিত। কলকাতার বাইরে তীর্থে গেলে আমি সঙ্গে যেতাম। আমাকে ছাড়া যেতই না। হিন্দি সিনেমা দেখতে আমি খুব ভালবাসি। নতুন ছবি রিলিজ় হলে নিজে টাকা দিত টিকিটের। বসুশ্রীতে অজয় দেবগনের ‘Yuva’ দেখার টাকা দিয়েছিল এই তো গত মাসে।
দ্বিতীয় দফার জেরায় ত্রিলোকি তথ্য দিলেন আর একটা। গৃহকর্মী সীতার সঙ্গে নাকি লিফটম্যান লক্ষ্মণের বিশেষ ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল ইদানীং। প্রায়ই লক্ষ্মণ এই ফ্ল্যাটে আসত। যেটা ললিতা বিন্দুমাত্র পছন্দ করতেন না। সীতাকে নাকি সপ্তাহখানেক আগে এ নিয়ে বকাঝকাও করেছিলেন। লক্ষ্মণকে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে বলেছিলেন চেঁচিয়ে। এই ব্যাপারটার আরও গভীরে যাবেন, ঠিক করলেন আশিক। প্রেমে বাধা বড় বিপজ্জনক জিনিস। প্রণয়ী-প্রণয়িনীর হিতাহিত জ্ঞান লোপ পায় অনেক সময়। তেমন কিছু ঘটেছিল?
সন্ধে হয়ে গেল প্রশ্নোত্তর-পর্ব মিটতে মিটতে। আলিপুর কোর্টের অ্যাডভোকেটের সঙ্গে ওঁর ভবানীপুরের বাড়িতে দেখা করতে আশিক বেরলেন সাড়ে পাঁচটা নাগাদ। তার আগে সুনীল গোয়েঙ্কাকে এক প্রস্থ জিজ্ঞাসাবাদ হয়ে গেছে। সুনীলের কথাবার্তায়, আচার-আচরণে কণামাত্র অস্বাভাবিকতা খুঁজে পাননি আশিক। মায়ের এহেন মৃত্যুতে পুত্রের যেমন শোকগ্রস্ত হওয়ার কথা, তেমনই। আশিকও তোলেননি ‘প্রোবেট’-এর কথা। আগে দেখা যাক ওই উকিলের সঙ্গে কথা বলে, সম্পত্তি নিয়ে মামলা-মোকদ্দমার ব্যাপারটা কতটা এগিয়েছে, আদৌ এগিয়েছে কি না।
হাজরা মোড়ের সিগন্যালে গাড়ি থামল। দু’ মিনিট গেল, চার মিনিট গেল, থেমেই আছে। কী ব্যাপার? গাড়ি থেকে নেমে একটু এগিয়ে গিয়ে দেখে এল ড্রাইভার।
একটা বড় মিছিল যাচ্ছে স্যার। ট্র্যাফিক সার্জেন্ট বললেন, গাড়ি ছাড়তে কম করে হলেও আরও মিনিট দশ।
