পাঁচ, কাল সকালেই একবার বসতে হবে ওসি হোমিসাইডের সঙ্গে। আলোচনা প্রয়োজন। ডিসি ডিডি তো নিজেই স্পটে এসেছিলেন, ছিলেন অনেকক্ষণ। ফোন করেছেন সন্ধে থেকে অন্তত তিনবার। সিপি-ও খোঁজ নিয়েছেন ওসি হোমিসাইডের কাছে। সবে তো প্রথম দিন। যত দিন যাবে, দ্রুত ‘ডিটেকশন’ করার চাপ উত্তরোত্তর বাড়বে, বুঝতে অসুবিধে হয় না আশিকের।
.
—অনেকগুলো খটকা স্যার… মেলানো মুশকিল…
আশিককে একটু চিন্তিত লাগে ওসি হোমিসাইডের।
—হুঁ… শুনছি, তার আগে বলো মোটিভটা কী মনে হচ্ছে?
—অ্যাপারেন্টলি তো মার্ডার ফর গেইন। স্টোররুমের আলমারি থেকে টাকাপয়সা নিয়ে গেছে।
—কত গেছে?
—এগজ়্যাক্ট অ্যামাউন্টটা বলা মুশকিল। অনিল প্রতি মাসে মা-কে কুড়ি হাজার হাতখরচা দিতেন। মহিলার মাসিক খরচ খুব বেশি ছিল না। নাতি-নাতনিকে এটা-ওটা কিনে দেওয়া, ঠাকুরঘরের টুকিটাকি জিনিস কেনা, বাড়ির কাজের লোকের মধ্যে ত্রিলোকি-রাজেশ-লক্ষ্মীর খুচরো সাধ-আহ্লাদ মেটানো। বাকিটা ছোট ছোট কাপড়ের পুঁটলিতে জমাতেন। অনিল বলছিলেন, লাখখানেক লাখ দেড়েকের মতো তো গেছেই।
—মিসলিড করার পসিবিলিটিটা মাথায় রেখেছ তো? কারণ হয়তো অন্য কিছু, তদন্তটা গুলিয়ে দেওয়ার জন্য লুঠপাট…
—হ্যাঁ, স্যার, সেটা তো মাথায় আছে… অন্য অঙ্ক থাকতেই পারে… আজ সকালেই এক পরিচিত অ্যাডভোকেটের ফোন এসেছিল… কাগজে খুনের খবরটা পড়ে কল করেছিলেন…
—কী বললেন?
—বললেন, পারিবারিক সম্পত্তির সিংহভাগ যে বড়ছেলের নামে ‘প্রোবেট’ করে গিয়েছেন ভগবতীপ্রসাদ গোয়েঙ্কা, সেটা নিয়ে বিস্তর ক্ষোভ আছে ছোটছেলে সুনীলের…
—স্বাভাবিক…
—হ্যাঁ… সম্পত্তির ভাগ চেয়ে নাকি মামলা করার কথা ভাবছিলেন…
—বুঝলাম, কিন্তু ললিতাদেবীর মৃত্যুতে কি মামলায় কোনও সুবিধে হত সুনীলের?
—এমনিতে হওয়ার কথা নয়, তবু একটু কথা বলা দরকার ওই অ্যাডভোকেটের সঙ্গে… উনি আজ কলকাতার বাইরে আছেন… কাল সন্ধেবেলা যাব…
—হ্যাঁ… আর ওই খটকার কথা কী বলছিলে…
—রান্নাঘরের দরজাটা স্যার…
—মানে?
—বলছি স্যার। পোস্টমর্টেম রিপোর্ট বলছে, খুনটা হয়েছে রাত তিনটে থেকে চারটের মধ্যে।
—তো?
—রোজ ভোর পাঁচটা-সাড়ে পাঁচটায় উঠে ললিতা রান্নাঘরের দরজা খুলে ঠাকুরঘরে যেতেন। মানে, ১২ অগস্টের ভোরে রান্নাঘরের দরজা খোলার স্কোপই ছিল না। তার আগেই মৃত্যু।
—হুঁ…
—অথচ জয়শ্রী সকালে সাড়ে সাতটা-আটটা নাগাদ উপরে গিয়ে দেখেছিলেন, রান্নাঘরের দরজা খোলা। ভিতর থেকে কেউ খুলে দিয়েছিল, এবং সেটা রাত তিনটের আগে। কে খুলল? কারা খুলল? যে বা যারা খুলল, তারা ভিতরে ঢুকল কী করে?
—বলে যাও…
—এটা পরিষ্কার, খুনি বা খুনিরা ওই রান্নাঘরের দরজা দিয়ে ঢুকেছিল। এ ছাড়া রাস্তা নেই ঘরে ঢোকার।
—যদি না মূল দরজায় কেউ বেল বাজায়, এবং মধ্যরাতে উঠে ললিতাদেবী দরজা খুলে দিয়ে থাকেন…
—সে সম্ভাবনা প্রায় শূন্য স্যার। ললিতা ঘুমিয়ে পড়েছিলেন রোজকার মতো রাত সাড়ে ন’টায়। উপোস ছিল, খাননি। অনিল বলছেন, অচেনা লোক হলে রাতে দরজা খুলতেনই না। আর রাতে কেউ আসতও না।
—অচেনা লোক হলে খুলতেন না, কিন্তু যদি চেনা লোক হয়?
—চেনা লোক বলতে তো অনিলের পরিবার আর সুনীলের পরিবার…
—অনিলের পরিবারের কেউ হলে তা বাইরে থেকে ঢোকার দরকার পড়বে না, দশ থেকে এগারো তলায় ওঠার সিঁড়ি তো আছে ভিতর থেকেই।
—এগজ়্যাক্টলি মাই পয়েন্ট স্যার .. তা হলে পড়ে থাকছেন সুনীল…
—দেখতে গেলে তা-ই, কিন্তু কেন মারবেন মা-কে?
—মেরেছেন তো বলছি না… নিজের মা-কে ওইভাবে ছুরি দিয়ে… টাকাপয়সা নিয়ে… হাইলি আনলাইকলি…
—কিন্তু ধরো যদি উনি বেল বাজালেন, ললিতা ছোটছেলের আওয়াজ শুনে দরজা খুললেন, আর সুনীলের লাগানো ভাড়াটে গুন্ডারা, যারা অপেক্ষায় ছিল বাইরে, কাজটা করল…
—তাতেও ওই মোটিভের ব্যাপারটা অস্পষ্টই থাকছে।
—হুঁ!
—বাড়ির কাজের লোকদের কারও বা কয়েকজন মিলে খুনটা করার সম্ভাবনা সবথেকে বেশি। সবাই নিম্নবিত্ত পরিবারের। মোটিভ? টাকা।
—আরও ডিটেলে খোঁজ নাও সবার ব্যাপারে।
—নেব স্যার, প্রত্যেকের বাড়ির আর্থিক অবস্থা, শখ-আহ্লাদ-নেশা, সব আজ-কালের মধ্যে পেয়ে যাব আশা করছি। লোক লাগানো হয়ে গেছে।
—বেশ…
—স্যার, ওসব ইনফর্মেশন না হয় জোগাড় হয়েই যাবে, কিন্তু রান্নাঘরের দরজার খোলা থাকাটা কিছুতেই মেলাতে পারছি না। কে খুলল, কীভাবে খুলল, কখন খুলল? কে ঢুকল, কীভাবে ঢুকল, কখন ঢুকল? কার বা কাদের সাহায্যে ঢুকল? আর খুনটা করার পর অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বেরল কীভাবে…
—গেটে রাতের সিকিউরিটি গার্ডরা তো বলছে, কাউকে বেরতে দেখেনি…
—হ্যাঁ .. বেরতে গেলেও গেট পাস লাগত… খুনটা করার পর পালাতে তো হবে, পালাল কীভাবে…
—সার্ভেন্টস কোয়ার্টার সার্চ করেও তো কিছু পাওয়া যায়নি বলছ?
—না স্যার। মিলছে না, কিছুতেই মিলছে না ফ্ল্যাটে খুনি বা খুনিদের ঢোকা-বেরনোর অঙ্কটা… মিলছে না… কিছু একটা মিস করছি নির্ঘাত।
আশিকের চিন্তিত চেহারাটা দেখে একটু খারাপই লাগে ওসি হোমিসাইডের। এই ঠান্ডা মাথার স্থিতধী অফিসারটিকে তিনি বিশেষ স্নেহের চোখে দেখেন। চেয়ার ছেড়ে উঠে পিঠে আশ্বাসের হাত রাখেন।
—মিলবে, ঠিক মিলবে। সবে তো একটা দিন হয়েছে। আকাশ থেকে উড়ে এসে তো কেউ রান্নাঘরের দরজা খোলেনি। আততায়ী বা আততায়ীরাই খুলেছে। এখন প্রশ্ন হল, কীভাবে খুলেছে? আর কীভাবে ঢুকেছে?
