দশ এবং এগারো তলা মিলিয়ে সবসময়ের কাজের লোক আটজন। শিবু মাহাতো। রান্না করেন। এ বাড়িতে আছেন তা সাত-আট বছর হল। বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। বাড়ি উত্তর ২৪ পরগনায়।
আশিস-অমলেশ। দুই ভাই। মূলত বাড়ির রোজকার বাজারহাটের দায়িত্বে। ওঁরাও বেশ কয়েক বছর ধরে আছেন গোয়েঙ্কা পরিবারে। হুগলিতে বাড়ি।
ত্রিলোকি সিং। বাড়ির সবচেয়ে পুরনো গৃহকর্মী। বয়স পঞ্চাশ পেরিয়েছে। আদতে উত্তরপ্রদেশের বাসিন্দা। নির্দিষ্ট কোনও দায়িত্ব নেই সেভাবে। বাকি গৃহকর্মীদের কাজের তদারকিই মূল কাজ। ব্যাংকের কাজ, চেক জমা দেওয়া, টাকা তুলে আনা, ইলেকট্রিক বিল জমা দেওয়া, এসবে ত্রিলোকির উপরই ভরসা করেন অনিল।
খগেন এবং রাজেশ। ললিতাদেবীর দেখাশুনোর দায়িত্ব ছিল এঁদের উপর। খগেনের বয়স বছর তিরিশ, বাড়ি ক্যানিং লাইনে। রাজেশের বয়স বাইশ-তেইশ। বাড়ি ওড়িশায়। দু’জনে প্রায় একসঙ্গেই কাজে ঢুকেছিলেন। বছর চারেক আগে।
সীতা এবং লক্ষ্মী। দুই মহিলা গৃহকর্মী। কাজের মধ্যে, ঘরদোর পরিষ্কার করা, কাপড় কাচা, বাসন মাজা, টুকটাক ফাইফরমাশ খাটা ইত্যাদি। সীতার বয়স কুড়ির কোঠায়, বাড়ি হাওড়ায়। অবিবাহিতা। লক্ষ্মী মাঝবয়সি, বিবাহিতা। লক্ষ্মীকান্তপুরের বাসিন্দা। সীতা-লক্ষ্মী রাত্রে শুতেন দশতলায়, অনিলের ফ্ল্যাটের বারান্দার লাগোয়া একটা ঘরে।
ঘটনার রাতে, ১১/১২ অগস্ট, আটজন কাজের লোকের মধ্যে ছ’জন উপস্থিত ছিলেন। অমলেশের স্ত্রী-র একটি অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন ছিল। দেড় মাসের ছুটি নিয়েছিলেন। জুলাই মাসের ৮ তারিখ থেকে। ফের কাজে যোগ দেওয়ার কথা অগস্টের একুশ-বাইশ নাগাদ।
রাজেশের বাড়ি থেকে ফোন এসেছিল সপ্তাহখানেক আগে। বাবা অসুস্থ। এক সপ্তাহের ছুটি নিয়ে বাড়ি গিয়েছিল ৮ অগস্ট। চলে আসার কথা পনেরো-ষোলো তারিখের মধ্যে।
অনিল-জয়শ্রী এবং কাজের লোকদের সঙ্গে দফায় দফায় প্রশ্নোত্তরে জানা গেল, ললিতাদেবীর সবচেয়ে বিশ্বাসভাজন ছিলেন তিনজন। কে কে?
লক্ষ্মী, দীর্ঘদিন আছেন বাড়িতে। যাঁকে খুবই ভালবাসতেন ললিতা। প্রতি পুজোয় হাজার খানেক টাকা বরাদ্দ রাখতেন। এটা-ওটা কিনে দিতেন প্রায়ই।
ত্রিলোকি, যাকে অনেক ছোট বয়স থেকে দেখেছিলেন ললিতা। পরিবারের সদস্যের মতোই স্নেহ করতেন। খোঁজখবর রাখতেন ত্রিলোকির বাড়ির লোকজনের। যে-কোনও আর্থিক সমস্যায় সাহায্য করতেন দরাজহস্ত।
রাজেশ, যাকে প্রায় পুত্রবৎ ভালবাসতেন বৃদ্ধা। মাঝেমাঝেই অসুস্থ হয়ে পড়তেন ললিতা। তখন খাইয়ে দিত এই রাজেশই। বছরখানেক আগে উজ্জয়িনীতে তীর্থে গিয়েছিলেন ললিতা, সঙ্গে গিয়েছিল রাজেশই। অনিল জানালেন, ‘কাজের লোকদের মধ্যে শুধু ত্রিলোকি, লক্ষ্মী আর রাজেশের সঙ্গেই মা খোলামনে কথাবার্তা বলতেন।’
লক্ষ্মী এবং ত্রিলোকির সঙ্গে আলাদা করে অনেকক্ষণ কথা বললেন আশিক। আশাব্যঞ্জক কিছু পাওয়া গেল না। রইল বাকি রাজেশ। ফোন করে খবর পাঠানো হল ওড়িশার বাড়িতে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, ফিরে আসতে বলা হল। ফিরে আসতে বলা হল অমলেশকেও, আরেকজন গৃহকর্মী, যিনি ছুটিতে ছিলেন।
‘সূত্র’ পাওয়ার লক্ষ্যে আবাসনের অন্যান্য স্থায়ী-অস্থায়ী কর্মীদেরও বিশদে জেরা করলেন আশিক। কাউকে বাদ দিলেন না। চার লিফটম্যান, লক্ষ্মণ-হিমাংশু-ইন্দ্রপাল-কৃষ্ণ। চার সুইপার, নিমাই-হিরামন-রামপ্রসাদ-লাল্টু। কেয়ারটেকার অচ্ছেবর সিং এবং তাঁর সহযোগী পল্টু ব্যানার্জি। জেরার ফল? বলার মতো কিছু? ভাবার মতো কিছু? না।
ঘণ্টার পর ঘণ্টা জেরা করা হল গেটের নিরাপত্তারক্ষীদের। আদ্যন্ত খুঁটিয়ে দেখা হল ভিজিটর্স রেজিস্টার, পুরনো গেটপাস। রাত্রে তো নয়ই, কোনও বহিরাগত অতিথি ১১ অগস্টের পুরো দিনটাতেই ব্লক এ-র দশ তলা বা এগারো তলায় আসেননি। অন্যান্য ফ্ল্যাটগুলোর গৃহকর্মীদের আসা-যাওয়ার খতিয়ানেও কোনও অসংগতি নেই গেটপাসে, নেই সন্দেহ উদ্রেক করার মতো কিছু। রাতের শিফটের দুই নিরাপত্তাকর্মী সুনির্মল আর দীপক জোর গলায় দাবি করলেন, কেউ ঢোকেনি রাত্রে। প্রশ্নই নেই।
প্রশ্ন আছে কি নেই, ভাবতেই হত না সিসি টিভি থাকলে। এত সম্পন্ন একটা আবাসনে সিসি টিভি নেই, আশ্চর্য লাগে আশিকের। ‘শ্রীনিকেত অ্যাপার্টমেন্টস’ থেকে ১২ অগস্টের রাত্রে বেরনোর সময় ক্লান্ত আশিক ভাবতে থাকেন, কী কী কাজ বাকি আছে আর।
এক, প্রতিবেশীদের জিজ্ঞাসাবাদ। আজ সময়ই পাওয়া গেল না সেভাবে। গোয়েঙ্কা পরিবারের আভ্যন্তরীণ ব্যাপারে, বিশেষ করে অনিল-সুনীলের পারস্পরিক সমীকরণের বিষয়ে বিস্তারিত জানা দরকার।
দুই, প্রতিটি গৃহকর্মীর ‘ব্যাকগ্রাউন্ড চেক’ প্রয়োজন। প্রত্যেকের বাড়িতে গিয়ে খোঁজখবর করা জরুরি। আবাসনের অন্য কর্মীদের ব্যাপারেও আরও খোঁজ নেওয়ার আছে।
তিন, যে দু’জন ছুটিতে ছিল, তারা কাল বা পরশু বিকেলের মধ্যে এসে পড়বে। বাড়তি তথ্য পাওয়া যেতেই পারে কিছু। যদি পাওয়া যায়, দেখতে হবে।
চার, ওই ফ্ল্যাটেরই শুধু নয়, আবাসনের কর্মীদের যাঁদের যাঁদের মোবাইল ফোন আছে তাঁদের কল রেকর্ডস আনাতে হবে। অন্তত গত সাতদিনের। এবং খুঁটিয়ে দেখতে হবে, দিশা পাওয়া যায় কিনা। আশিটা ফ্ল্যাটের বাসিন্দাদের ঠিকুজিকুষ্ঠি জানতে হবে। সবার মোবাইল নম্বর জোগাড় করে পাঠাতে হবে সার্ভিস প্রোভাইডারের কাছে। CDR (Call Details Records) নিতে হবে।
