প্রতি ব্লকে দুটো করে লিফট। দু’জন করে লিফটম্যান ব্লকপিছু। যাঁরা দুটো শিফটে কাজ করেন। সকাল ছ’টা থেকে দুপুর দুটো। দুপুর দুটো থেকে রাত দশটা। চারজন স্থায়ী সাফাইকর্মী রয়েছেন। রয়েছেন একজন ইলেকট্রিশিয়ান এবং একজন প্লাম্বার। হাউসিং-এর অফিসে আছেন একজন কেয়ারটেকার আর তাঁর একজন সহযোগী।
নিরাপত্তারক্ষীরা শিফটে কাজ করেন রাতদিন সাতদিন। দু’জন করে থাকেন সকাল ন’টা থেকে রাত ন’টা। পরের শিফট রাত থেকে সকাল, বারো ঘণ্টা টানা। দিনের শিফটে একজন সুপারভাইজ়ারও থাকেন।
এই আবাসন তৈরি করেছিলেন ভগবতীপ্রসাদ গোয়েঙ্কা। ব্লক এ-তে দশ আর এগারো তলাটা নিজের পরিবারের জন্য রেখে বাকি ফ্ল্যাটগুলো বেচে দিয়েছিলেন। এগারো তলায় থাকতেন সস্ত্রীক। দশতলার দুটো ফ্ল্যাট লিখে দিয়েছিলেন দুই ছেলের নামে। বড় অনিল, ছোট সুনীল। আগেই লিখেছি, ব্লক দুটোর বাকি ফ্লোরগুলোর প্রতিটায় ছিল চারটে করে ফ্ল্যাট। গোয়েঙ্কাদের বাদ দিলে মোট ফ্ল্যাটের সংখ্যা আশি।
পি. ও। প্লেস অফ অকারেন্স। ঘটনা যেখানে ঘটেছে। যে-কোনও তদন্তে ঘটনাস্থল তদন্তকারীর কাছে মন্দির-মসজিদ-চার্চের মতো। তীর্থস্থানস্বরূপ। সাধকের ধৈর্য নিয়ে দেখতে হয়। পূর্ণাঙ্গ খানাতল্লাশির পর ফ্ল্যাটটা ভাল করে ঘুরে দেখছিলেন আশিক।
এগারো তলার যে ফ্ল্যাটে ললিতাদেবী থাকতেন, বলেছি আগে, তার নম্বর 10D & 10E। পাশাপাশি দুটো ফ্ল্যাটের পুরোটা নিয়েই বসবাস করতেন মহিলা। দুটো ফ্ল্যাট মিলিয়ে আটটা বড় ঘর, দুটো বড় হল, ডাইনিং রুম, একটা রান্নাঘর। প্রশস্ত বারান্দা যেখানে শুরু হচ্ছে, তার পাশেই বড় স্টোররুম। যেখানে আবিষ্কৃত হয়েছিল বৃদ্ধার দেহ।
দশতলায় দুটো ফ্ল্যাট। 9E এবং 9F। অনিল থাকেন 9E-তে। সুনীল 9F-এ।
অনিলের ফ্ল্যাটের ভিতর থেকে এগারো তলায় মায়ের ফ্ল্যাটে উঠে যাওয়ার একটা সিঁড়ি আছে। অনিল সপরিবারে উপরে মায়ের সঙ্গেই খাওয়াদাওয়া করতেন। রান্নাবান্নার সরঞ্জাম এগারো তলাতেই থাকত।
ছাদে ‘সার্ভেন্টস কোয়ার্টার’। যে ছাদের মালিকানা সম্পূর্ণত ছিল গোয়েঙ্কাদের। বাড়ির কাজের লোকদের জন্য ছাদ থেকে নেমে এগারো তলার রান্নাঘরে ঢোকার একটা দরজা ছিল। সেই দরজা খোলা থাকত দিনভর। রান্নাঘরের ওই দরজা দিয়েই ফ্ল্যাটে ঢুকত স্থায়ী কাজের লোকেরা। রাতের খাওয়ার পাট সাধারণত সাড়ে ন’টার মধ্যে চুকে যেত গোয়েঙ্কা পরিবারের। তারপর জয়শ্রী রান্নাঘরের দরজায় ভিতর থেকে ছিটকিনি দিয়ে দিতেন।
ললিতার নিত্যনৈমিত্তিক রুটিন? ভোর পাঁচটা থেকে সাড়ে পাঁচটার মধ্যে উঠে ঠাকুরঘরে চলে যেতেন। তার আগে দরজা খুলে দিতেন রান্নাঘরের। গৃহকর্মীরা নির্দিষ্ট সময়মতো এসে দশ এবং এগারো তলার কাজ শুরু করত। দুপুর দুটো থেকে বিকেল পাঁচটা অবধি ছিল কাজের লোকদের বিশ্রামের সময়।
ললিতার দেহ উদ্ধার হল ১২ অগস্ট সকালে। তার আগের রাতে মহিলা কিছু খাননি। একাদশী ছিল। রাত ন’টার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। উপরের ফ্ল্যাটে রোজকার মতো সকাল সাড়ে সাতটা-পৌনে আটটা নাগাদ উঠে এসেছিলেন জয়শ্রী। জলখাবারের তদারকি করতে। এসে দেখেছিলেন, শাশুড়ি ফ্ল্যাটে নেই। ওলটপালট বিছানায় রক্তের দাগ। তারপর আতঙ্কিত ফোন অনিলকে, ‘মা-কে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। শিগগির বাড়ি এসো।’
.
ময়নাতদন্ত হতে হতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল। প্রত্যাশিত রিপোর্ট, গলায় ছুরির আঘাত এবং মাথায় গভীর ক্ষত থেকে অবিরাম রক্তক্ষরণ মৃত্যু ঘটিয়েছে, ante-mortem and homicidal। ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা মৃতদেহ দেখে যা অনুমান করেছিলেন, পোস্টমর্টেম রিপোর্ট সহমত হল তাতে। খুনটা ঘটেছে রাত তিনটে থেকে চারটের মধ্যে। ললিতা ভারী চেহারার ছিলেন, খুনি একাধিক হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।
‘একাধিক’ যে হতেই পারে, বোঝাই যাচ্ছিল। দেহ বেডশিটে মুড়ে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল স্টোররুমে। একের পক্ষে অসম্ভব নয়। কিন্তু কঠিন। ‘এক’ না ‘একাধিক’, ভাবার আগে প্রাথমিক তথ্যসংগ্রহের প্রয়োজন। রাত দশটা অবধি আবাসনে কাটালেন আশিক। যা যা জানলেন, যা যা শুনলেন, যা যা বুঝলেন জিজ্ঞাসাবাদে এবং কানাঘুষোয়, বাড়ি ফেরার পথে সাজিয়ে নিচ্ছিলেন মাথায়।
ললিতাদেবীর দুই ছেলের পারস্পরিক সম্পর্ক ভ্রাতৃসুলভ ছিল না। না থাকার কারণ? ভগবতীপ্রসাদ গোয়েঙ্কা বড়ছেলেকে বেশি দায়িত্ববান মনে করতেন বলেই সম্ভবত যাবতীয় সম্পত্তি ‘প্রোবেট’ করে গিয়েছিলেন অনিলের নামে। অগাধ সম্পত্তির মালিকানা পেয়েছিলেন অনিল। ছোটছেলে সুনীলকে ব্যবসার যৎসামান্য অংশীদারিত্ব নিয়েই খুশি থাকতে হয়েছিল।
অর্থের সড়কপথেই অনর্থের প্রবেশ ঘটে থাকে সচরাচর। অনর্থ বলতে যা বোঝায়, এক্ষেত্রে তেমন কিছু হয়নি অবশ্য। তবে ভায়ে-ভায়ের সম্পর্কে যে ফাটল ধরেছিল, সেটা অজানা ছিল না কারও। পরলোকগত স্বামীর সিদ্ধান্তে ললিতার নীরব সমর্থন ছিল। বড়ছেলের সংসারের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে গিয়েছিলেন। অনিলের দুই স্কুলপড়ুয়া পুত্র-কন্যা ঠাকুমার অনিঃশেষ স্নেহের ভাগিদার হয়েছিল। উৎসব-অনুষ্ঠান ছাড়া দুই ভাইয়ের পরিবারের মধ্যে যোগাযোগ ছিল না বললেই চলে। সুনীল থাকতেন নিজের মতো, সপরিবার।
