যিনি এই বিছানায় শুতেন, শুয়েছিলেন গত রাতেও, সেই ললিতাদেবী গোয়েঙ্কা কোথায়? সত্তর বছরের বৃদ্ধা কোত্থাও নেই। অন্য ঘরগুলোয় নেই। রান্নাঘরে নেই। শোওয়ার ঘরের লাগোয়া বাথরুমে নেই। হলঘরের এক কোনায় আর একটা বাথরুম। যেটা কখনও ব্যবহার হয় না। খুলে দেখা হল। নেই।
ছাদে-বারান্দায়-টেরেসে-ঠাকুরঘরে? নেই। একটা জায়গাই দেখার পড়ে আছে। স্টোররুম। তালা ঝুলছে দরজায়। যেমন ঝোলে রোজ। শোওয়ার ঘরের ড্রেসিং টেবলের ড্রয়ারে চাবি থাকে। ‘থাকে’ নয়, থাকত। দ্রুত আবিষ্কৃত হল, স্টোররুমের চাবি ড্রয়ারে নেই।
অনিল গোয়েঙ্কার মুখ রক্তশূন্য হয়ে যায় এবার। চাবিটা কোথায় গেল স্টোররুমের? মা কোথায়? তা হলে কি…? মোবাইলে আলিপুর থানার নম্বর যখন ডায়াল করছেন, হাত কাঁপতে শুরু করেছে।
—একবার আপনাদের আসতে হবে বড়বাবু। মা-কে কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না। স্টোররুমের চাবি মিসিং। বেডরুমটা ডিস্টার্বড। ব্লাড স্টেইনস আছে বেডে। একবার যদি আসেন এখনই… প্লিজ়…
পুলিশ পৌঁছল, স্টোররুমের তালা ভাঙা হল এবং ভিতরের দৃশ্য দেখে মুহূর্তে সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়লেন ললিতা গোয়েঙ্কার পুত্রবধূ জয়শ্রী। অনিল দাঁড়িয়ে রইলেন স্তব্ধ হয়ে। মুখে হাত ঢেকে ডুকরে কেঁদে উঠলেন সুনীল।
মেঝে রক্তে থইথই। বৃদ্ধা পড়ে আছেন নিষ্প্রাণ। মুখে কাপড় গোঁজা। কপালে গভীর ক্ষতচিহ্ন। গলার নলিটা কাটা। যা দিয়ে কাটা হয়েছে সম্ভবত, সেই ছুরিটা পড়ে আছে পেটের উপর। যে ফুল-ফুল খয়েরি-সাদা ম্যাক্সিটা মহিলার শরীরে, সেটার রং প্রায় পুরো বদলে গিয়ে লালে লাল। রক্তপাত হয়েছে প্রচুর। দুটো সাদা বেডশিট পড়ে আছে দুমড়ানো-মুচড়ানো। রক্তের দাগ যাতে যত্রতত্র।
স্টোররুমে দুটো বড় আলমারি। দুটোই লন্ডভন্ড। হাতড়ানো হয়েছে বেপরোয়া। কী থাকত আলমারিগুলোয়? অনিল জানালেন, মায়ের জমানো টাকাপয়সা থাকত ছোট ছোট কাপড়ের পুঁটলিতে। যার একটাও আলমারিতে নেই এখন। মৃতদেহের পাশে একটা একশো টাকার নোটের বান্ডিল পড়ে আছে হেলাফেলায়। যে বা যারা খুনটা করল, পালানোর সময় তাড়াহুড়োয় নিতে ভুলে গেছে?
প্রায় সাত হাজার বর্গফুটের ফ্ল্যাটের প্রতিটি ইঞ্চি-সেন্টিমিটারের তন্নতন্ন তল্লাশিতে ঘণ্টা দুয়েক লেগে গেল আলিপুর থানার পুলিশের। যাদের সঙ্গে যোগ দিলেন গোয়েন্দাবিভাগের হোমিসাইড শাখার অফিসাররা। দ্রুত চলে এলেন ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা। খোঁজাখুঁজিতে উল্লেখ করার মতো জিনিস বলতে পাওয়া গেল দুটো কালো রংয়ের প্লাস্টিকের বোতাম। পড়ে ছিল খাটের নীচে এক কোনায়। খুনি বা খুনিদের সঙ্গে ধস্তাধস্তি হয়েছিল মহিলার? সাধ্যমতো প্রতিরোধ করেছিলেন, এবং আততায়ী বা আততায়ীদের কারও শার্ট থেকে বোতাম দুটো ছিঁড়ে গিয়েছিল টানাটানিতে?
জিআই পাইপটা খাটের নীচে এল কোথা থেকে? বারান্দার একধারে চারটে পাইপ পড়েছিল বেশ কিছুদিন যাবৎ। তারই একটা নিয়ে জোরালো আঘাত করা হয়েছিল মৃতার কপালে।
‘Seizure list’-এর তালিকায় ওই লোহার পাইপের সঙ্গে যোগ হল রক্তের দাগ লাগা বালিশ, স্টোররুমে পড়ে থাকা রক্তমাখা এক জোড়া বেডশিট, মৃতার পেটের উপর পড়ে থাকা ছুরি, একশো টাকার নোটের বান্ডিল। আলমারিতে আঙুলের ছাপ? বা খাট-বিছানায়? পাওয়া গেল আবছা, ‘ডেভেলপ’ করার যোগ্য নয়।
অভিজাত আবাসনে সম্পন্ন ব্যবসায়ী পরিবারে সত্তর বছরের বৃদ্ধার নৃশংস খুন। গলাকাটা অবস্থায় দেহ উদ্ধার ফ্ল্যাটের স্টোররুম থেকে। মিডিয়ায় হইচই হবে, স্বাভাবিকই ছিল। যেমন স্বাভাবিক ছিল দেহ উদ্ধারের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তদন্তভার নেওয়া হোমিসাইড বিভাগের। সাব-ইনস্পেকটর আশিক আমেদ (বর্তমানে মেটিয়াবুরুজ থানার ওসি) দায়িত্ব পেলেন রহস্যভেদের।
ললিতাদেবী গোয়েঙ্কা হত্যারহস্য। আলিপুর থানা, কেস নম্বর ১১৭, তারিখ ১২/৮/২০০৪। খুন, লুঠ এবং প্রমাণ লোপাট। ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩০২/৩৯৪/২০১ ধারায়।
.
শ্রীনিকেত অ্যাপার্টমেন্টস। ছিমছাম কোলাহলহীন রাস্তার উপর ভিতরে-বাইরে গাছগাছালির সবুজ আবাসন। দুটো আলাদা ব্লক। ‘এ’ আর ‘বি’। দুটোই এগারো তলা। ব্লক এ-র দশ আর এগারো তলায় দুটো করে ফ্ল্যাট। বাকি প্রতিটা ফ্লোরে চারটে করে ফ্ল্যাট। একতলায় পার্কিং স্পেস রয়েছে পর্যাপ্ত, যেমন থাকে এ ধরনের আবাসনে।
নিরাপত্তায় যথেষ্ট বিনিয়োগ করেছিলেন আবাসিকরা। প্রায় পনেরো ফুটের কাছাকাছি উচ্চতার পাঁচিল। যার উপর তার দেওয়া, ‘barbed wire fencing’।
ঢোকার-বেরনোর একটাই গেট। যেটা পেরিয়ে ঢুকলেই পশ্চিম দিকে ‘security box’। বেসরকারি সংস্থা ‘Royal Securities Pvt Ltd.’-র কর্মীরা থাকেন নিরাপত্তার দায়িত্বে। ব্লক এ-র একতলায় আবাসনের অফিস, ‘শ্রীনিকেত হাউসিং এস্টেট সোসাইটি’।
সিকিউরিটি বক্সে ইন্টারকম আছে। বাইরে থেকে কেউ এসে কোনও ফ্ল্যাটে যেতে চাইলে নিরাপত্তাকর্মী ফোন করে ফ্ল্যাটের বাসিন্দাদের জানিয়ে দেয়, তমুক এসেছেন। সবুজ সংকেত পেলে তবেই প্রবেশাধিকার মেলে বহিরাগত অতিথির। ভিজিটর্স রেজিস্টারে নাম-ঠিকানা লিখে সই করার পর। রোজকার আংশিক সময়ের গৃহকর্মীদের, যাদের মুখ চেনা, ঢোকার ব্যাপারে বাধা নেই।
যাঁরা বিভিন্ন ফ্ল্যাটে স্থায়ী কাজের লোক, তাঁরা যখন ছুটিতে যান, ‘গেট পাস’ নিয়ে বেরতে হয়। বেরনোর সময় সঙ্গে যা যা থাকে ব্যাগ বা সুটকেসে, দেখাতে হয় নিরাপত্তাকর্মীদের। তারপর ছাড়পত্র মেলে বাইরে যাওয়ার। কে কখন বেরল আর ফিরল কবে কখন, সব নোট করা থাকে রেজিস্টারে।
