জাল কেটে বেরনোর রাস্তা ছিল না। বীরেশ তবু আদালতে সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছিলেন পুলিশকে দেওয়া বয়ান। জোরগলায় দাবি করেছিলেন আগাগোড়া, ‘আমি নির্দোষ।’ সমস্ত প্রমাণ বিপক্ষে, তবু একচুলও নড়েননি সে দাবি থেকে।
বিচারসিদ্ধান্তের আনুগত্য থাকে শুধু প্রমাণের প্রতি। অভিযুক্তের সারবত্তাহীন দাবির প্রতি নয়। ধোপে টেকেনি বীরেশের দাবি, দায়রা আদালত দীর্ঘ বিচারপর্বের পর ২০০৬ সালে বীরেশকে দোষী সাব্যস্ত করেছিলেন। যাবজ্জীবন কারাবাস, না ফাঁসি, জল্পনা তুঙ্গে উঠেছিল সেসময়।
বিচারক সরাসরি প্রশ্ন করেছিলেন বীরেশকে, ‘যা অপরাধ করেছেন, কী সাজা হওয়া উচিত বলে মনে হয় আপনার?’ বীরেশ বলেছিলেন ‘আমার বয়স এখন ৪৬। আমার কোনওরকম অপরাধের কোনও অতীত রেকর্ড নেই। আপনি যদি মনে করেন ফাঁসি দেবেন, দিন। আমি বারবার বলে এসেছি, আমি নির্দোষ। এখনও তাই বলছি।’
ফাঁসি হয়নি। সাজা হয়েছিল যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের। হাইকোর্টে সাজা রদের আবেদন করেছিলেন বীরেশ। লাভ হয়নি। শাস্তি বহাল থেকেছিল।
অপরাধ-মনস্তত্ত্ব নিয়ে বিশ্বজুড়ে কত যে গবেষণা হয়ে এসেছে কয়েক শতক ধরে, কত যে নতুন চিন্তাপ্রবাহ প্রতিনিয়ত সমৃদ্ধ করে চলেছে অপরাধবিজ্ঞানকে, হিসেব রাখা কঠিন। আমার-আপনার থেকে কোথায় কতটা আলাদা ভয়ংকর অপরাধীদের মস্তিষ্কের গঠন, ব্রেনের আকৃতির তারতম্য কীভাবে আলাদা করে দেয় সামান্য ছিঁচকে চোরের সঙ্গে সিরিয়াল কিলারের মনোজগতের, সে নিয়ে বিদগ্ধ অধ্যয়ন জারি রয়েছে দেশে-বিদেশে।
তবে কিনা, বিষয়টা তো দিনের শেষে মন। কে আর কবে মনের পাসওয়ার্ড সম্পূর্ণ ভেদ করতে পেরেছে গবেষণায়-আলোচনায়-পরীক্ষানিরীক্ষায়? আর এ তো বিরল অপরাধীর মন, যেখানে সন্দেহের বীজ সযত্ন পরিচর্যায় ক্রমশ আক্রোশের মহীরুহে পরিণত হয়। এবং ঘটে যায় এমন অপরাধ, যা লজ্জায় ফেলবে সুদূরতম কল্পনাকেও। কী উপাদানে তৈরি হয় বীরেশ পোদ্দারদের মনোজগৎ? যা প্ররোচিত করে ঠান্ডা মাথার পরিকল্পনায় অচিন্তনীয় অপরাধে, বাধ্য করে অপরাধের স্বীকারোক্তি-লিখনে, এবং আইনের কাছে পরাভূত হওয়ার প্রাক্কালে সেই স্বীকারোক্তিকেই নির্দ্বিধায় খণ্ডনে?
এই লেখা লিখতে গিয়ে মনে হয়েছে বারবার, হয়তো পড়তে পড়তে আপনাদেরও, কিছু অপরাধ তোয়াক্কা করে না ব্যাখ্যার। কিছু অপরাধী হেলায় অগ্রাহ্য করে বিশ্লেষণকে, স্বাভাবিক বিচারবুদ্ধিকে।
সে আপনি যতই গভীরে যান। এই বুঝি তল পাবেন, ফের হারাবেন।
২.০৬ ফেলুদাং শরণং গচ্ছামি
[ললিতা গোয়েঙ্কা হত্যা
আশিক আমেদ, ওসি, মেটিয়াবুরুজ।]
— মা-কে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না… তুমি শিগগির বাড়ি এসো…
অনিল গোয়েঙ্কার মোবাইলটা যখন বেজে উঠল, সকাল তখন কত? এই পৌনে আটটা। ব্যাট-প্যাড পরে মাঠে নামতে যখন রোদের দেরি থাকে কিছু। আবার ভোরের আধো-অন্ধকারও যখন প্যাভিলিয়নের পথে। মাঝামাঝি একটা সময়। ভোর আর সকালের প্রাত্যহিক চুক্তিতে যখন সব ‘শান্তিকল্যাণ’ হয়ে আছে।
মঙ্গল-বৃহস্পতি-রবি, সপ্তাহে তিনদিন টালিগঞ্জ ক্লাবে ভোরবেলা গল্ফ খেলতে আসা অনিলের বহুদিনের অভ্যেস। আজ, বিষ্যুদবারে, যেমন এসেছেন। দু’রাউন্ড খেলার পর সবে একটু জিরিয়ে নিচ্ছেন যখন, গলা ভিজিয়ে নিচ্ছেন ফ্রেশ ফ্রুট জুসে, স্ত্রী জয়শ্রীর ফোন। মা-কে নাকি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না! অনিলের উত্তরে ঠিকরে বেরয় অস্থিরতা-উদ্বেগ-আশঙ্কা।
—কী বলছ কী? খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না মানে? বাথরুমে দেখেছ?
—দেখেছি। নেই। বিছানায় রক্তের দাগ আছে। সব ওলটপালট। মেঝেতেও রক্ত আছে… আমার হাত-পা কাঁপছে… এসো শিগগির…
গল্ফ মাথায় উঠল। দ্রুত গাড়িতে উঠে বসলেন অনিল। ড্রাইভারের প্রতি সামান্য উত্তেজিত নির্দেশ এল।
—ঘর চলো… জলদি!
‘ঘর’, অর্থাৎ ‘শ্রীনিকেত অ্যাপার্টমেন্টস’। ১১, অশোকা রোড, আলিপুর।
অনিল যখন পড়িমরি করে বাড়ি পৌঁছে পা রাখলেন বাড়ির দরজায়, ভিড় জমে গেছে প্রতিবেশীদের। থমথমে মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছেন ছোটভাই সুনীল। দাদাকে দেখেই বললেন, ‘ভাইয়া… কুছ গড়বড় হ্যায়… পুলিশ কো বুলানা চাহিয়ে।’
‘গড়বড়’ যে আছেই, সেটা বুঝতে অবশ্য তেমন বুদ্ধি খরচের দরকার পড়ে না। ফ্ল্যাটে এক চক্কর দিলেই মালুম হয় অনায়াসে।
আসলে দুটো ফ্ল্যাট একসঙ্গে। এগারো তলায়, 10D আর 10E। আয়তনের বিচারে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে মাঝারি সাইজ়ের ফুটবল মাঠের সঙ্গে। সব মিলিয়ে আটটা ঘর। প্রতিটাই পেল্লায় সাইজ়ের। অপর্যাপ্ত বৈভবের চিহ্ন ছড়িয়ে ফ্ল্যাটের এ-মাথা থেকে ও-মাথা। বিরাট হলঘরে সেগুনকাঠের রকমারি আসবাবপত্র। দুর্মূল্য তৈলচিত্র। বাহারি সোফাসেট। সিলিং থেকে ঝুলতে থাকা কারুকাজের ঝাড়লন্ঠন। প্রশস্ত ড্রয়িংরুম পেরিয়ে আরও প্রশস্ত বারান্দা। যার পাশে বিস্তৃত খোলা জায়গা একটা, ‘ওপেন টেরেস’। যেখানে দাঁড়িয়ে চোখ তুলে চাইলে আকাশকে খুব দূরের মনে হয় না।
আটটার মধ্যে সাতটা ঘর যেমন থাকার তেমন। একটা শোওয়ার ঘরের চেহারা শুধু বিধ্বস্ত। বিছানা ওলটপালট। দুটো বালিশ ঝুলছে খাটের এক কোণে। বেডসাইড টেবিল থেকে একটা জলের গ্লাস উলটে পড়েছে মেঝেতে। প্রায় দু’ফুট লম্বা একটা জিআই পাইপ পড়ে আছে খাটের নীচে। বিছানার উপর অন্তত চারটে জায়গায় লাল ছোপছোপ। রক্ত, বোঝা যায় সাদা চোখেই।
