—স্যার, ঘুম আসত না রাতের পর রাত। সামান্য ব্যবসা করি, কীভাবে বিয়ে দেব
পাঁচ-পাঁচটা মেয়ের? আর রাগ হত রীতার উপর। পাঁচটাই মেয়ে, একটা ছেলে হতে পারত না?
পালটা কী-ই বা বলা যেত প্রস্তরযুগীয় মানসিকতায় আচ্ছন্ন এই অল্পশিক্ষিত যুবককে? পৃথ্বীরাজ পরের প্রশ্নে গিয়েছিলেন।
—স্ত্রীকে মারলেন কেন, বুঝলাম। কিন্তু নিজের বাচ্চা মেয়েগুলোকে ওভাবে …
কথা শেষ করতে দেন না বীরেশ।
—আমি আর পারছিলাম না বউ আর পাঁচ-পাঁচটা মেয়ের বোঝা টানতে। আর, নিজের বাচ্চা কে বলল স্যার? নিজের কিনা সেটা নিয়েই ধন্দে থাকতাম সবসময়।
পৃথ্বীরাজ বোঝেন, এই লোকের সঙ্গে তর্ক বৃথা। কথায় কথাই বাড়বে শুধু। তার চেয়ে বরং জিজ্ঞেস করা যাক সে-রাতের ঘটনাক্রম।
—আমি ঠিক করে ফেলেছিলাম স্যার, বউ-বাচ্চাদের তো মারবই, দিগ্বিজয়কেও বাঁচতে দেব না। কাঠের কাজ করি। নানা ধরনের ছুরি ব্যবহার করতে হয়। একটা ধারালো ছুরি বাড়িতে এনেছিলাম সেদিন। আর কিনে এনেছিলাম একপাতা ঘুমের বড়ি।
—কী বড়ি?
—ভ্যালিয়াম-৫ স্যার। ঘুমের ওষুধ তো প্রেসক্রিপশন ছাড়া ডাক্তাররা দিতে চাইবে না, জানতাম। এক বন্ধুর কাকা ডাক্তার ছিলেন। উলটোডাঙার কাছে চেম্বার। বন্ধুকে ধরলাম। ওর সঙ্গে গেলাম ডাক্তারবাবুর কাছে। বললাম, গত দু’সপ্তাহ ধরে রাতে ঘুম হচ্ছে না। অস্থির লাগছে সারাদিন। একটা উপায় করুন রাতে ঘুমোনোর। ডাক্তারবাবু প্রেশার দেখলেন। ঘুমের ওষুধ দিতে চাইছিলেন না। আমি খুব কাকুতিমিনতি করায় রাজি হলেন। ওষুধ কিনে বাড়ি ফিরলাম।
—তারপর?
—আমরা সকলেই রাতে দুধ খেয়ে শুতাম। রীতা যখন বাচ্চাদের জন্য বিছানা করছে, আমি ওর গ্লাসে দুটো ঘুমের বড়ি ফেলে দিলাম। বাচ্চাদের হাতে এক একটা করে বড়ি দিয়ে বললাম, এগুলো ভিটামিন ট্যাবলেট। ওরা চুপচাপ খেয়ে নিল। আমরা সাড়ে দশটা-পৌনে এগারোটা নাগাদ শুয়ে পড়লাম। আমি আর রীতা মেঝেতে শুতাম। মেয়েরা খাটে। আমি জেগে থাকলাম, কখন সবাই ঘুমিয়ে পড়ে, তার অপেক্ষায়।
—বলতে থাকুন।
বীরেশ বলতে থাকলেন নির্বিকার। বর্ণনা থাকুক তাঁরই বয়ানে, একটানা।
—ওরা সবাই ঘুমিয়ে পড়ল কিছুক্ষণ পরেই। আমি উঠলাম। সব ঠিক করে রেখেছিলাম আগে থেকেই। প্রথমে রীতাকে মারলাম। উলের চাদর ছিল একটা ওর। আলনায় রাখা ছিল। সেটা দিয়ে ফাঁস দিলাম গলায়। নাকের কাছে হাত নিয়ে গিয়ে দেখলাম, নিশ্বাস পড়ছে না।
খাটে উঠলাম এবার। আমাদের খাটটা ঘরের ডানদিকের দেওয়ালে লাগানো ছিল। একদম বাঁদিকে রিমা শুত। বড়মেয়ে। ওকে মারলাম ওরই ওড়নার ফাঁস দিয়ে।
তারপর প্রীতি, মেজো। কয়েকদিন হল একটু ঠান্ডা লেগেছিল ওর। গলায় মাফলার ছিল। ওটাই চেপে ধরলাম গলায়।
প্রীতির পাশে ছিল স্মৃতি। পাশ ফিরে শুয়েছিল। ঘুমে কাদা, সোজা করে দিলাম। আলনায় রাখা মাফলার দিয়ে গলাটা চেপে ধরলাম।
দেওয়ালের দিকে পাশাপাশি শুত শ্বেতা আর ভাবনা। যমজ ওরা। বড়মেয়ে রিমার ওড়নাগুলোর কয়েকটা রাখা থাকত আলনায়, কয়েকটা ঝুলত দরজার হুকে। দুটো ওড়না নিলাম। তাই দিয়ে প্রথমে শ্বেতা। তারপর ভাবনা। তারপর ছুরিটা নিয়ে দিগ্বিজয়ের ঘরে নক করলাম।…
এবার বীরেশকে থামিয়ে দেন পৃথ্বীরাজ। স্ত্রী-সন্তানদের হত্যার এই নিস্পৃহ ধারাবিবরণী একটানা শোনা দুঃসাধ্য হয়ে উঠছিল। কেস ডায়েরি লেখার প্রয়োজনে প্রায়ই দেখতে হয় বাচ্চাগুলোর মৃতদেহের ছবি। যতবার দেখেন, কান্না জমে গলার কাছে। আর এ বাবা হয়ে কী অনায়াসে বলে যাচ্ছে!
কেসের কিনারা হয়ে গেছে। অপরাধী ধরা পড়ে গেছে। তবু যে প্রশ্নের উত্তর না পেলেই নয়, সেটা করেই ফেলেন পৃথ্বীরাজ। পারা যাচ্ছিল না আর।
—সন্দেহ করতেন স্ত্রীকে, বুঝলাম। কিন্তু বাচ্চাগুলো তো কোনও দোষ করেনি। ওদের এভাবে মেরে ফেললেন ঘুমের মধ্যে? একটুও কষ্ট হল না? আর মারলেনই যদি, স্বীকারোক্তি লিখে গেলেন কেন? আজ নয় কাল, আমরা তো ধরতামই আপনাকে।
আবেগের ন্যূনতম বহিঃপ্রকাশ ছিল না বীরেশের উত্তরে।
—স্বীকারোক্তিটা ঝোঁকের মাথায় লিখেছি। ওটা উচিত হয়নি। আর মেয়েগুলোকে বাঁচিয়ে রেখেই বা কী লাভ হত স্যার? আমি তো ভেবেছিলাম, বিহারে পাকাপাকিভাবে পালিয়ে যাব। ব্যবসা করব কিছু। কী লাভ হত ওদের বাঁচিয়ে রেখে? কে দেখত ওদের? দাদার নিজের সংসার ছিল, সম্ভব হত না পাঁচটা মেয়ের ভার নেওয়া। বেঁচে থাকলে ওদের অসুবিধেই হত। উপায় ছিল না এ ছাড়া। তা ছাড়া ওই যে বললাম, আমারই যে মেয়ে সেটাই তো…
আর সহ্য করতে পারেন না পৃথ্বীরাজ, ফের থামিয়ে দেন বীরেশকে। বোঝেন, এই লোক বাহ্যত সুস্থ, আসলে গভীর মনোবিকারগ্রস্ত। পরকীয়াজনিত সন্দেহে স্বামী খুন করেছে স্ত্রীকে, এমন ঘটনা অনেকই ঘটে। কিন্তু স্ত্রী এবং পাঁচটা নিষ্পাপ মেয়েকে এভাবে প্ল্যান করে মারার পরও কীভাবে কেউ সেই নিধনবৃত্তান্ত শোনাতে পারে নির্বিকার? কথাবার্তায় না আছে লেশমাত্র অনুতাপ, না আছে শোকের সামান্যতম চিহ্ন।
চার্জশিট পেশ করলেন পৃথ্বীরাজ। দিগ্বিজয়কে ছুরি মারার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন দু’জন। দিগ্বিজয় স্বয়ং, আর তাঁর ছেলে কৌশল। দিগ্বিজয় ভয়ংকর জখম হয়েও প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন দ্রুত চিকিৎসা শুরু হওয়ায়। বীরেশের পালানোর সাক্ষী ছিলেন দুই প্রতিবেশী, সত্যদেও আর রামচল। বীরেশের হাতের লেখার নমুনার সঙ্গে মিলে গিয়েছিল স্বীকারোক্তির চিরকুটের হস্তাক্ষর। প্যাসেজে পড়ে থাকা রক্তমাখা ছুরিতে পাওয়া গিয়েছিল বীরেশের আঙুলের ছাপ। বাড়ির পিছনের উঠোন থেকে উদ্ধার হয়েছিল ভ্যালিয়াম ৫-এর খালি স্ট্রিপ। যে ওষুধের দোকান থেকে বীরেশ কিনেছিলেন ওষুধ, সেই ‘Popular Drug House’-এর দোকানদার চিহ্নিত করেছিলেন অভিযুক্তকে।
