প্রতিবেশীদের জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেল, বীরেশ-রীতার দাম্পত্য সম্পর্ক মসৃণ ছিল না। ঝগড়াঝাঁটি লেগেই থাকত। রীতার পরিবারের লোকজন থাকতেন কাঁকুড়গাছি এলাকায়। রীতার দাদা চন্দ্রশেখর জানালেন, বীরেশ প্রায়ই মারধর করতেন রীতাকে। সন্দেহ করতেন, দিগ্বিজয়ের সঙ্গে বোধহয় স্ত্রীর অবৈধ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। সন্দেহই, প্রমাণ ছিল না কিছু। মাঝেমাঝে রীতা রাগারাগি করে বাচ্চাদের নিয়ে চলে আসতেন দাদার বাড়িতে। কান্নাকাটি করতেন দাদা-বউদির কাছে।
কয়েকদিন পরে বীরেশই এসে ফিরিয়ে নিয়ে যেতেন স্ত্রীকে। রীতাও ফিরে আসতেন মুরারিপুকুরে। কী-ই বা উপায় ছিল ফিরে আসা ছাড়া? যখন কিশোরী ছিলেন, বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। পড়াশুনোর সুযোগ হয়নি। সম্পূর্ণভাবে স্বামীর উপর নির্ভরশীল ছিলেন। আর রীতার দাদা চন্দ্রশেখরও যে আর্থিকভাবে খুব সচ্ছল ছিলেন, এমনও নয়। পাঁচটা বাচ্চাকে নিয়ে কতদিনই বা থাকা যায় দাদা-বউদির সংসারে?
ফিরে আসতেন, কিছুদিন সব ঠিকঠাক চলত। তারপর ফের সন্দেহ, ফের অশান্তি, ফের মারধর। যথাপূর্বং তথাপরম।
নিশ্চিত জানা হয়ে গিয়েছিল, অপরাধী কে। বাকি ছিল গ্রেফতারি। বীরেশ সহজে ধরা দিলেন না। ভোগালেন সপ্তাহদুয়েক। ঘটনা ২০০০ সালের। মোবাইল ব্যবহার করার মতো ট্যাঁকের জোর ছিল না বীরেশের। তাই প্রযুক্তির সাহায্যে পলাতকের অবস্থান জানার প্রশ্ন ছিল না। বীরেশের ভাই নরেশের কাছে জানতে চাওয়া হল বিহারে যাবতীয় আত্মীয়স্বজনের নাম-ঠিকানা ইত্যাদি। জেনে নেওয়া হল, কোথায় কোথায় আশ্রয় নিতে পারেন পালিয়ে।
তিনটে টিম করা হল। যাঁরা ১৭ তারিখ দুপুরেই বেরিয়ে পড়লেন বিহারে। সম্ভাব্য সমস্ত আস্তানায় রেইড করা হল দিনের পর দিন। আজ সমস্তিপুর, কাল গয়া, পরশু জামুই, তরশু ঘাটশিলা। আত্মীয়বন্ধুদের বাড়িতে এক-দু’-দিন করে থাকছিলেন বীরেশ। পুলিশ পৌঁছনোর আগেই ডেরা বদলে ফেলছিলেন। প্রায় দশ-বারো দিন ধরে বিহারের পূর্ব-পশ্চিম-উত্তর-দক্ষিণ চষে ফেলেও নাগাল পাওয়া গেল না বীরেশের। ফিরে এলেন হতোদ্যম অফিসাররা।
বীরেশের মোবাইল না থাকলেও দাদা নরেশের ছিল। যে ফোনের উপর নজরদারি চালু হয়ে গিয়েছিল ঘটনার পরের দিন বিকেল থেকেই। অফিসাররা যেদিন ফিরে এলেন বিহার থেকে, তার পরের দিনই ফোন-নজরদারিতে ইঙ্গিত মিলল, টাকা ফুরিয়ে গেছে বীরেশের। দু’-এক দিনের মধ্যেই কলকাতায় আসার সম্ভাবনা। দেখা করতে পারেন দাদার সঙ্গে। জাল পাতা হল শহরের স্টেশনে-বাস টার্মিনাসে-ফেরিঘাটে। ৩১ ডিসেম্বর বর্ষশেষের সন্ধেয় বাবুঘাটে গোয়েন্দাদের হাতে ধরা পড়লেন স্ত্রী এবং পাঁচ কন্যাকে খুন করে ফেরার হয়ে যাওয়া বীরেশ।
জেরাপর্বে বীরেশ কোনও রাখঢাকের রাস্তায় গেলেন না। কয়েক লাইনে লিখে গিয়েছিলেন যে স্বীকারোক্তি, সেটাই বললেন বিস্তারে। যখনই রীতাকে কোনও কারণে কথা বলতে দেখতেন দিগ্বিজয়ের সঙ্গে, তীব্র অশান্তি হত সংসারে। ছোটখাটো ঘটনা নিয়েও স্বামী-স্ত্রীর খিটিমিটি লেগেই থাকত। এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অবধারিত ভাবে বীরেশ টেনে আনতেন দিগ্বিজয়ের সঙ্গে সম্পর্ককে। ঘটনার মাসখানেক আগে যেমন। সন্ধেবেলা বাড়ি ফিরে বীরেশ দেখলেন, একটা মাঝারি মাপের সুটকেস এক কোণে রাখা।
—রীতা, এটা কার? কোত্থেকে এল?
—দিগ্বিজয় ভাইয়ার। ওর ঘরে কিছু মেরামতির কাজ চলছে। জায়গার অভাব। তাই বিকেলে ভাইয়া এসে বলল, দু’-তিন দিনের জন্য যদি এটা..
—ভাইয়া! ভাইয়া, না সাঁইয়া? সব জানা আছে আমার, এ সুটকেস এখানে থাকবে না। রাস্তায় রাখুক সুটকেস, আমার বাড়ি ছাড়া আর জায়গা পেল না?
সঙ্গে সঙ্গেই উলটোদিকের ঘরে গিয়ে সুটকেস রেখে এসেছিলেন বীরেশ, তপ্ত বাদানুবাদ হয়েছিল স্বামী-স্ত্রীর।
মনে সন্দেহের বীজ দাম্পত্য জীবনের শুরু থেকেই লালন করে এসেছিলেন বীরেশ। বিয়ের তিন মাসের মধ্যেই গর্ভবতী হন রীতা এবং বীরেশের ধারণা হয়, এ সন্তান তাঁর ঔরসজাত নয়। ভুল ভাঙানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছিলেন রীতা।
এরপর একে একে আরও চার কন্যাসন্তানের জন্ম। তাদের একটু একটু করে বড় হয়ে ওঠা। যত বছর গড়িয়েছে, সন্দেহের তীব্রতা প্রশমিত হওয়া দূরে থাক, কোনও কার্যকারণ ছাড়াই বীরেশের ধারণা বদ্ধমূল হয়েছে, সন্তানরা তাঁর নয়। রীতার অবৈধ সম্পর্কের ফসল। এই ধারণায় ঘৃতাহুতি দিয়েছিল গত কয়েক বছরে রীতা-দিগ্বিজয়ের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠা। দিগ্বিজয় ডাকতেন ‘রীতা ভাবি’ বলে। রীতা ডাকতেন ‘ভাইয়া’। বীরেশ মনে করতেন, ওসব লোকদেখানো। আসলে অন্য সম্পর্ক আছে।
—আমি বারবার ওকে বারণ করতাম দিগ্বিজয়ের সঙ্গে কথা বলতে। রীতা শুনত না। তর্ক করত। বলত, ‘বিনা কারণে কথা বন্ধ করব কেন?’ শুনে খুন চেপে যেত মাথায়।
প্রতি সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে মেয়েদের কাউকে না কাউকে আড়ালে ডেকে জিজ্ঞেস করতেন বীরেশ, ‘আজ দিগ্গিচাচা ঘরে এসেছিল? মা ওঘরে গিয়েছিল? গল্প করতে দেখেছিস?’
সন্দেহ ক্রমে জিঘাংসায় পরিণত হওয়া যদি খুনের প্রথম কারণ হয়, দ্বিতীয় ছিল উপর্যুপরি পাঁচ কন্যাসন্তানের জন্ম। দুর্ভাগা দেশ আমাদের, ছেলে কেন হচ্ছে না, সন্তান প্রসবের পর প্রতিবারই এ নিয়ে বীরেশ কাঠগড়ায় তুলতেন রীতাকে। চতুর্থবার যখন যমজ কন্যাসন্তান ভূমিষ্ঠ হল, বীরেশের ধৈর্য বিদ্রোহ করল।
