ডিসি ইএসডি (ইস্টার্ন সাবার্বান ডিভিশন) এবং ডিসি ডিডি যখন এসে পৌঁছলেন, ততক্ষণে নিজেকে সামলে নিয়েছেন দ্বিজেন। খুঁটিয়ে দেখে নিয়েছেন দশ বাই বারোর ঘরটা। সহজেই চোখে পড়েছে জানালার পাশে রাখা একটা কাগজের টুকরো। আঁকাবাঁকা হাতের লেখায় যা ছিল সেই কাগজে, তুলে দিলাম নীচে।
‘হাম বীরেশ পোদ্দার আপনি ইচ্ছা সে পুরে পরিবার কো মার ডালা। ইস মে বাকি লোগো কা কোই কসুর নেহি হ্যায়। কৃপয়া সাজা দে, মারনে কা কারণ দিগ্বিজয় শর্মা কা মেরি পরিবার ইয়ানি মেরি বিবি সে গলত সম্পর্ক।’
(‘আমি বীরেশ পোদ্দার নিজের ইচ্ছেয় আমার পুরো পরিবারকে মেরে ফেলেছি। এতে অন্য কারও কোনও দোষ নেই। আমাকে শাস্তি দেওয়া হোক। মারার কারণ হল দিগ্বিজয় শর্মার সঙ্গে আমার স্ত্রী-র অবৈধ সম্পর্ক।’)
কাগজের নীচে ইংরেজিতে সই, ‘Biresh Poddar’। তা এই বীরেশ কই? বউ-বাচ্চাদের মেরে স্বীকারোক্তি লিখে পালিয়েছেন? যাঁরা ভিড় জমিয়েছিলেন ঘরের সামনে, তাঁরা সমস্বরে হইহই করে উঠলেন, ‘দিগ্বিজয় কো মারকে ভাগ গয়া!’
ঘটনাপ্রবাহ যা জানা গেল, এরকম। একতলায় এগারোটা ঘরের মধ্যে দশটায় ভাড়া থাকতেন সব মিলিয়ে সাতটি পরিবার। একটা ঘর খালি ছিল। উত্তর দিকের দুটো মুখোমুখি ঘরে ভাড়া থাকতেন বীরেশ পোদ্দার এবং দিগ্বিজয় শর্মা। বছর চল্লিশের বীরেশ আদতে বিহারের বাসিন্দা। বড়ভাই নরেশের সঙ্গে জীবিকার সন্ধানে কলকাতায় চলে আসেন বছর পনেরো আগে। দুই ভাই মিলে ক্যানাল ওয়েস্ট রোডে একটা ছোট ঘর ভাড়া নিয়ে কাঠের কাজকর্মের কারবার শুরু করেন।
নরেশ সপরিবারে থাকেন উলটোডাঙার কাছে। আর বীরেশ মুরারিপুকুরের এই বাড়ির ভাড়াটিয়া কলকাতায় আসার পর থেকেই। স্ত্রী রীতা এবং পাঁচ কন্যাকে নিয়ে বসবাস। রিমা-প্রীতি-স্মৃতি-ভাবনা-শ্বেতা। রিমা বড়, এগারো বছর। প্রীতি আর স্মৃতি মেজো আর সেজো, যথাক্রমে দশ আর আট বছরের। ভাবনা আর শ্বেতা যমজ, চার পেরিয়ে সবে পাঁচ ছুঁয়েছে।
প্রতিবেশী দিগ্বিজয় শর্মা মধ্যচল্লিশ। বড়বাজারের এক বেসরকারি সংস্থায় ছোটখাটো চাকুরে। বিবাহিত, একমাত্র ছেলে কৌশলের বয়স আঠারো। কলেজে পড়ে, বাবার সঙ্গেই থাকে। স্ত্রী থাকেন দেশের বাড়িতে, বিহারে।
একতলাতেই অন্য ঘরগুলোয় যাঁরা ভাড়া থাকতেন, তাঁদের মধ্যে দু’জন, সত্যদেও পাণ্ডে এবং রামচল জয়সওয়াল, জানালেন, রাত আড়াইটে নাগাদ বাইরে থেকে প্রবল চিৎকারে ঘুম ভেঙে যায় ওঁদের। প্যাসেজে সারারাতই আলো জ্বলত এ বাড়িতে। গেট বন্ধ হয়ে যেত সাড়ে এগারোটা নাগাদ। তালার কমন চাবি থাকত সব আবাসিকের কাছেই। কারও রাতে বেরনোর প্রয়োজন হলে তালা খুলে বেরতেন। ফিরে এসে গেট আবার তালাবন্ধ করে দিতেন।
দরজা খুলে বাইরে এসে সত্যদেও আর রামচল দেখেন, দিগ্বিজয় এক হাতে নিজের পেট চেপে ধরেছেন। রক্তে ভেসে যাচ্ছে শার্ট। আর অন্য হাতে কলার চেপে ধরে আছেন বীরেশের। দিগ্বিজয়ের ছেলে কৌশল তারস্বরে চেঁচাচ্ছে, ‘পিতাজি কো মার ডালা!’ দিগ্বিজয়ের হাত ছাড়িয়ে দৌড়ে ঝটিতি মূল গেট দিয়ে বেরিয়ে যান বীরেশ। গেট খোলা ছিল। নিশ্চয়ই বীরেশই খুলে রেখেছিলেন ঘটনা ঘটানোর আগে। যাতে দ্রুত পালাতে সুবিধে হয়।
দিগ্বিজয় কোথায়? সত্যদেও-রামচলের হইহইয়ে অন্য ভাড়াটেরাও বেরিয়ে এসেছিলেন। দু’তলায় থাকতেন বাড়ির মালিক শ্যামল সাহা, নেমে এসেছিলেন। দু’-তিনজন একটা ট্যাক্সি জোগাড় করে রক্তাক্ত দিগ্বিজয়কে নিয়ে ছুটেছিলেন আর জি কর হাসপাতালে। সেখানেই এখন আইসিইউ-তে চিকিৎসাধীন সে।
বীরেশের ঘরে বাইরে থেকে শিকল তোলা ছিল। শিকল খুলে ভিতরের ওই মর্মান্তিক দৃশ্য দেখে এক প্রতিবেশী ফোন করেছিলেন মানিকতলা থানায়।
অকুস্থল থেকে পুলিশের বাজেয়াপ্ত করা জিনিসের তালিকায় রইল হিন্দিতে লেখা বীরেশের স্বীকারোক্তি-চিরকুট, ঘরগুলির মধ্যবর্তী প্যাসেজে বইতে থাকা রক্তস্রোতের ‘স্যাম্পল’, দিগ্বিজয়কে আক্রমণে ব্যবহৃত ছুরি, এবং কিছু রুটিন টুকিটাকি।
দেহগুলো ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো দরকার। কিন্তু পারলে তো? সকাল হয়ে গেছে। লোকের ভিড় বেড়েছে আরও। পাঁচ-সাতশো এলাকাবাসীর বিক্ষুব্ধ জমায়েত বাড়ির সামনে। দাবি, এভাবে ছ’জনকে খুন করে পালিয়ে গেছেন বীরেশ, তাকে গ্রেফতার না করা পর্যন্ত একটাও দেহ বাড়ির বাইরে বেরবে না। আগে গ্রেফতার, তারপর অন্য কিছু।
সিনিয়র অফিসাররা জনতাকে আপ্রাণ বোঝানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলেন। ডিসি হেডকোয়ার্টার, যিনি শহরের আইনশৃঙ্খলার দায়িত্বে থাকেন, ততক্ষণে চলে এসেছেন লালবাজারে। মুরারিপুকুরে পৌঁছে গিয়েছে RAF। পরিস্থিতি ক্রমশ ঘোরালো হচ্ছে দেখে সামান্য বলপ্রয়োগ করতেই হল পুলিশকে। জনতাকে হঠিয়ে দিয়ে বার করা হল দেহগুলি। মৃতা মায়ের সঙ্গে পুলিশ ভ্যানে করে মর্গের উদ্দেশে রওনা দিল পাঁচ বোন। রিমা-প্রীতি-স্মৃতি-ভাবনা-শ্বেতা। ঘুমের মধ্যেই যারা কয়েক ঘণ্টা আগে পাকাপাকিভাবে পাড়ি দিয়েছে ঘুমের দেশে।
পোস্টমর্টেম রিপোর্ট জানাল, যা জানাই ছিল। ‘Death was caused due to effects of strangulation, ante-mortem and homicidal in nature.’
ঘটনা এতটাই চাঞ্চল্যকর, প্রাথমিক তদন্ত থানা শুরু করলেও গোয়েন্দাবিভাগের উপর দায়িত্ব পড়াটা অনিবার্যই ছিল। তদন্তকারী অফিসার নিযুক্ত হলেন গোয়েন্দাবিভাগের হোমিসাইড শাখার তৎকালীন সাব-ইনস্পেকটর পৃথ্বীরাজ ভট্টাচার্য, যিনি বর্তমানে গোয়েন্দাবিভাগেই কর্মরত ইনস্পেকটর হিসাবে।
