পুলিশের চাকরিতে কম দিন হল না মানিকতলা থানার বড়বাবু দ্বিজেন চ্যাটার্জির। অসংখ্য মৃতদেহ দেখেছেন। দুর্ঘটনায় ধড় থেকে আলাদা হয়ে যাওয়া শরীর দেখেছেন অনেক। দুমড়ে-মুচড়ে দলা পাকিয়ে যাওয়া বডি দেখেছেন একাধিক। তদন্তের স্বার্থে বহুবার ডাক্তারবাবুর পাশে দাঁড়িয়ে দেখেছেন ময়নাতদন্তের কাটাছেঁড়া। দেহ, সে যতই বিকৃত হোক, স্নায়ু বিন্দুমাত্রও চঞ্চলতা দেখায়নি কখনও।
সঙ্গী সাব-ইনস্পেকটর তাই অবাকই হন একটু। দ্বিজেন ঠায় তাকিয়ে আছেন পড়ে থাকা হাফডজন দেহের দিকে। একটু এগিয়ে যান যমজ মেয়েদুটির গলার ফাঁস পরীক্ষা করতে। মুখের উপর ঝুঁকে কয়েক সেকেন্ড দেখার পরই পিছিয়ে আসেন। ফ্যাকাশে হয়ে আসে চোখমুখ। অস্ফুটে অধস্তন সহকর্মীকে বলেন, ‘ডিসি ডিডি-কে ধরো।’ মোবাইল এগিয়ে দেন নিজের।
—স্যার, রিং হচ্ছে। ধরুন, ডিসি ডিডি সাহেব…
ফোন হাতে নিয়ে কোনওমতে ‘নমস্কার স্যার, এত রাতে ডিস্টার্ব করার জন্য সরি স্যার’ বলার পরই বিদ্রোহ করে বহুপরীক্ষিত স্নায়ু। হাউহাউ করে কেঁদে ফেলেন ডাকসাইটে ওসি। জড়ানো গলায় শুধু বলতে পারেন, ‘একবার আসুন স্যার, শুধু দেখে যান, বাচ্চা মেয়েগুলোকে এভাবে… এতদিনের চাকরিতে এমন কখনও দেখিনি স্যার…।’
ঘড়ি দেখেন গোয়েন্দাপ্রধান। পৌনে চারটে। পোড়খাওয়া ওসি কীসে এতটা বিচলিত হয়ে পড়লেন, যে পুরো বাক্যটা শেষ করতে না পেরে কেঁদেই ফেললেন? এখনই যাওয়া দরকার স্পটে। বিছানা ছেড়ে উঠতে না উঠতেই মোবাইল বেজে উঠল আবার। এবার লালবাজার কন্ট্রোল রুম, ‘স্যার, মুরারিপুকুরে মাল্টিপল মার্ডার। ওসি স্পটে আছেন। ডিসি যাচ্ছেন। প্রবলেম হচ্ছে একটু। লোক জমে গেছে। বডি বার করতে সমস্যা হতে পারে। ডিসি হেডকোয়ার্টার স্পটে RAF পাঠাতে বলেছেন। ফোর্স যাচ্ছে স্যার।’
সংক্ষিপ্ত উত্তর দিয়ে ফোন কেটে দেন গোয়েন্দাপ্রধান, ‘হ্যাঁ, শুনেছি, ওসি-র সঙ্গে কথা হয়েছে। আমি যাচ্ছি। ওসি হোমিসাইডকেও যেতে বলুন। আর, পারলে সিপি সাহেবকে জানিয়ে রাখুন ইনসিডেন্টটা।’
গোয়েন্দাপ্রধানের গাড়ি যখন ঢুকছে মুরারিপুকুরে, ঘড়িতে ভোর সাড়ে চারটে। নাকি লেখা উচিত, রাত সাড়ে চারটে? সময়টাই এমন, যখন রাত আর ভোর সহবাস করে দৈনন্দিন।
.
রহস্যপিপাসুর সনাতন চাহিদা এ কাহিনি মেটাবে না, স্বীকার্য শুরুতেই। একটা অপরাধ ঘটবে, থাকবে একাধিক সন্দেহভাজন, প্রত্যেকেরই থাকবে অপরাধী হওয়ার সম্ভাব্যতা, পাঠক আগাগোড়া থাকবেন দ্বিধাদীর্ণ, আর গোয়েন্দা শেষ পৃষ্ঠায় যবনিকা উত্তোলন করবেন রহস্যের, এ কাহিনি এই পরিচিত ছকের অনুসারী নয়। বরং উলটো। শুরুতেই জানা হয়ে যাচ্ছে, কে খুনি। ‘কে করেছিল’ নয়, কেন করেছিল, এবং কীভাবে করেছিল, সেটাই উপজীব্য এ মামলার। যা আজও হিমশীতল নৃশংসতার বিরলতম দিকচিহ্ন হয়ে আছে কলকাতা পুলিশের ইতিহাসে।
মানিকতলা থানা, কেস নম্বর ৩৮২। তারিখ, ১৭ ডিসেম্বর, ২০০০। ধারা, ৩০২/৩০৭। খুন এবং খুনের চেষ্টা।
.
প্রণম্য শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ‘চিড়িয়াখানা’ উপন্যাসে এক জায়গায় লিখেছিলেন, ‘টেলিফোনের সহিত যাঁহারা ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত তাঁহারা জানেন, টেলিফোনের কিড়িং কিড়িং শব্দ কখনও কখনও ভয়ংকর ভবিতব্যতার আভাস বহন করিয়া আনে। যেন তারের অপর প্রান্তে যে-ব্যক্তি টেলিফোন ধরিয়াছে, তাহার অব্যক্ত হৃদয়াবেগ বিদ্যুতের মাধ্যমে সংক্রামিত হয়।’
মানিকতলা থানায় যে ফোনটা এসেছিল রাত সোয়া তিনটে নাগাদ, তাতেও যেন আভাস ছিল ভয়ংকর ভবিতব্যের। ফোনের অন্য প্রান্ত থেকে এক হিন্দিভাষী ভদ্রলোক উত্তেজিত কণ্ঠে জানিয়েছিলেন ডিউটি অফিসারকে, ‘সার, জলদি ফোর্স ভেজিয়ে ইঁয়াহা। 16/J/Q মুরারিপুকুর রোড মে, ইয়াহাঁ পাঁচ লেড়কি অউর এক অউরত কা খুন হো গয়া।’ ভদ্রলোক যেখান থেকে ফোনটা করছেন, সেখানে যে পরিস্থিতি খুব একটা শান্ত নেই, কথোপকথনের মাঝেই ভেসে আসা চিৎকার-চেঁচামেচিতে দিব্যি বুঝতে পেরেছিলেন অফিসার।
থানার লাগোয়া কোয়ার্টারেই থাকেন ওসি। ঘণ্টাদেড়েক হল থানা ছেড়ে বাড়ি গেছেন। ডিউটি অফিসার ঘুম ভাঙালেন ফোনে, জানালেন খবরটা। ‘পাঁচ লড়কি অউর এক অউরত?’ অনেক উড়ো ফোন আসে থানায় রাতের দিকে। কিন্তু ছ’টা খুন? খবরটা ঠিক হোক, ভুল হোক, দেরি করার মানে হয় না। তৈরি হয়ে নিতে যতটুকু সময়, ওসি-র গাড়ি ছুটল মুরারিপুকুরের দিকে। এবং নির্দিষ্ট ঠিকানায় পৌঁছেই দ্বিজেন বুঝলেন, খবরে ভুল নেই।
তিনতলা বাড়ি। তৃতীয় তলাটা অসম্পূর্ণ। ওই গভীর রাতেও অন্তত শ’তিনেক লোকের জমাট ভিড় বাড়ির গেটের সামনে। পুলিশের গাড়ি দেখেই যে ভিড়টা আরও উত্তেজিত হওয়ার অক্সিজেন পেয়ে গেল নিমেষে। কী হয়েছে, সেটা জানতে গেলে তো ঢুকতে হবে বাড়িতে। সেই ঢোকাটাই সমস্যা হয়ে দাঁড়াল ভিড়ভাট্টা-হইহল্লার মধ্যে। বিস্তর ঠেলেঠুলে কোনওমতে বাড়িটায় ঢুকতে ঢুকতেই দ্বিজেন মোবাইল ফোনে ধরলেন লালবাজার কন্ট্রোল রুম। ‘সিচুয়েশন গ্রেভ অ্যাট মুরারিপুকুর। রিইনফোর্সমেন্ট নিডেড আর্জেন্টলি। প্লিজ় ইনফর্ম সিনিয়র অফিসার্স।’
একতলায় এগারোটা ঘর, দু’পাশে সার দিয়ে। জনাবিশেক লোকের ভিড় উত্তর দিকের শেষ ঘরের সামনে। ঘরের দরজা খোলা। সঙ্গী অফিসারকে নিয়ে দ্বিজেন ঢুকলেন। এবং ঢুকে যা দেখলেন, লিখেছি শুরুতেই। মেঝেতে এক মহিলার দেহ প্রাণহীণ, খাটে পঞ্চকন্যার। বিহ্বল ওসি কেঁদে ফেললেন দৃশ্যের অভিঘাতে, ‘বাচ্চা মেয়েগুলোকে এভাবে… এতদিনের চাকরিতে এমন কখনও দেখিনি স্যার…!’
