পারিপার্শ্বিক প্রমাণ হিসাবে প্রত্যাশিতভাবেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব পেয়েছিল পার্ক থেকে উদ্ধার হওয়া চাবির গোছা। লীনার তালাবন্ধ ফ্ল্যাটের চাবি কী করে প্রদীপের কাছে এল, আর কেনই বা সেটা লুকিয়েচুরিয়ে ফেলে এলেন পার্কে, জবাব ছিল না এ প্রশ্নের। ড্রাইভার ইসমাইল তাঁর বয়ানে স্বীকার করেছিল পার্কে যাওয়ার কথা। পার্কের নিরাপত্তারক্ষীদের বয়ান নেওয়া হয়েছিল। একজন মনে করতে পেরেছিলেন সেদিনের কথা। গাড়ি এসে থেমেছিল, একজন ব্যাগ নিয়ে নেমেছিলেন, ফিরে এসেছিলেন কিছুক্ষণের মধ্যে খালি হাতে। এজলাসে প্রদীপকে চিহ্নিত করেছিলেন ওই রক্ষী।
কী পড়ে থাকে আর? লীনার ডায়েরিতে লিপিবদ্ধ থাকা অসুখী দাম্পত্যের বিবরণ বিবেচিত হয়েছিল খুনের ‘মোটিভ’ হিসাবে। ডায়েরির হাতের লেখা যে লীনারই, চিহ্নিত করেছিলেন ভাই অমিত। সর্বোপরি, জীবিত অবস্থায় লীনাকে শেষ দেখা গিয়েছিল প্রদীপের সঙ্গে। দেখেছিলেন লিফটম্যান বরুণ, যখন প্রদীপ ফ্ল্যাটের বেল বাজিয়েছিলেন ২৯ তারিখ দুপুরে, লীনা খুলেছিলেন দরজা এবং প্রদীপ ঢুকে গিয়েছিলেন ফ্ল্যাটে। সাক্ষ্যপ্রমাণের ভাষায় একে বলে হয় ‘last seen alive together’, যা এই ধরনের মামলায় (যেখানে কোনও প্রত্যক্ষদর্শী নেই অপরাধের) প্রমাণ হিসাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আদালতের রায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন প্রদীপকুমার সেন। দণ্ডিত হয়েছিলেন যাবজ্জীবন কারাবাসে। এখন পরলোকগত।
সম্পর্কের রসায়ন ভারী বিচিত্র। বিনিয়োগের রসায়ন। কোথাও পুঁজি স্রেফ বিশ্বাস, কোথাও-বা নির্ভরতা। কোথাও হয়তো ভালবাসা, কোথাও অন্য কোনও অনুভূতি। ঈর্ষা-ক্ষোভ-দ্বেষ, বা অন্য কিছু।
প্রদীপ-লীনার সম্পর্কেও বিনিয়োগ ছিল উভয়ত। অব্যক্ত হিসেব ছিল পারস্পরিক। নারীবিষয়ে প্রদীপের দুরারোগ্য দুর্বলতা লীনা বিলক্ষণ বুঝেছিলেন। এবং প্রৌঢ়ত্বের স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকা প্রদীপকে বিয়ে করতে রাজি হয়েছিলেন একটাই কারণে। নিজে গভীর আসক্ত ছিলেন জেটগতির দিনযাপনে। সেই জীবনযাত্রায় অর্থবান এবং সামাজিক প্রতিপত্তিশালী স্বামী দীর্ঘস্থায়ী অনুঘটক হয়ে দেখা দেবেন, এই নিশ্চিন্ততায়।
আর প্রদীপ? রিপুর তাড়না চরিতার্থ করাই ছিল পাখির চোখ। ‘শরীর শুধু শরীর, তোমার মন নাই লীনা’ বলার কথা দুঃস্বপ্নেও ভাবেননি কখনও। বলবেন, এমন প্রত্যাশাও লীনার ছিল না।
প্রেম ছিল না ওঁদের। চাওয়া-পাওয়ার হিসেব ছিল। যা দু’জনেই ভালবাসার আব্রু দিয়ে ঢেকে রাখার চেষ্টা করেছিলেন বিয়ের পরের কয়েক মাস। কিন্তু যে সম্পর্কের ইট-বালি-চুন-সুরকিতে শুধুই দেওয়া-নেওয়া, তাতে ফাটল ধরা ছিল অবধারিতই। ‘কী পাইনি তার হিসাব মিলাতে’-ই ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন উভয়েই।
পরিণতি? পড়লেন তো!
২.০৫ এ কাহিনির শিরোনাম হয় না
[বীরেশ পোদ্দার মামলা
পৃথ্বীরাজ ভট্টাচার্য, ইনস্পেকটর, গোয়েন্দাবিভাগ।]
ঠিক যেন ‘শোলে’! স্থান-কাল-পাত্রে দূরতম মিলও নেই। মিল নেই পটভূমিতেও। তবু মনে পড়ে যেতে বাধ্য রমেশ সিপ্পির কালজয়ী ব্লকবাস্টারের সেই দৃশ্য।
পাশাপাশি শোয়ানো পাঁচটি মৃতদেহ। সাদা কাপড়ে মোড়া। দীর্ঘদিন পর পাওয়া ছুটিতে দেশের বাড়ি ফিরছেন জাঁদরেল পুলিশ অফিসার সঞ্জীবকুমার, রামগড়ে নিজের গ্রামে যিনি সর্বজনমান্য ঠাকুরসাব। যিনি সদ্য গ্রেফতার করে জেলে পুরেছেন দুর্ধর্ষ ডাকাত গব্বর সিং-কে। স্টেশনে বাড়ির লোকজন নেই কেউ, দেখে অবাকই হয়েছেন। কেউ এল না? আশ্চর্য!
বাড়ি পৌঁছনোর পর বিস্ময় বদলে গেছে স্তব্ধতায়। পাতা পড়ছে না চোখের। পাশাপাশি পাঁচটি দেহ শুয়ে নিথর। দুই ছেলে, একমাত্র মেয়ে, পুত্রবধূ। এবং আট বছরের নাতি। জেল পালিয়ে যাদের খুন করে গেছে গব্বর, ভয়ংকরতম বদলা নিয়েছে গ্রেফতারির। পরিবার নিশ্চিহ্ন। অক্ষত শুধু ছোটছেলের স্ত্রী, আর বহু বছরের গৃহভৃত্য। যাঁরা গব্বরের হত্যালীলার সময় পুজো দিতে গিয়েছিলেন মন্দিরে।
গৃহভৃত্য কাঁদছেন মনিবের পা জড়িয়ে ধরে। ছোটবউ বাড়ির দালানে বসে আছেন শোকস্তব্ধ। এতদিন পরে বাড়ি আসছেন, পরিবারের প্রতিটি সদস্যের জন্য ঠাকুরসাব কিছু-না-কিছু কিনে এনেছিলেন। দু”হাত থেকে খসে পড়তে থাকে সেই উপহারগুচ্ছ। একটার পর একটা।
দমকা হাওয়া আসে। উড়িয়ে নিয়ে যায় চারটি দেহের উপর থেকে সাদা কাপড়। তিন সন্তান এবং পুত্রবধূর গুলিবিদ্ধ দেহে একে একে চোখ রাখেন বাক্রুদ্ধ ঠাকুরসাব। পঞ্চম দেহের উপরের কাপড় তখনও উড়ে যায়নি হাওয়ায়। নাতির দেহের উপর থেকে নিজেই কাপড় সরান ধীরে। শোক ততক্ষণে বদলে গেছে উন্মত্ত ক্রোধে।
.
মুরারিপুকুরের দশ বাই বারোর একচিলতে ঘরের মধ্যে দাঁড়িয়ে ‘শোলে’ মনে পড়ে যায় ওসি মানিকতলার। বাহ্যত মিল নেই কোনও, তবু। ওটা সিনেমার পরদা, এটা ঘোর বাস্তব। ওটা ঘটেছিল খোলা আকাশের নীচে, এটা ঘটেছে চার দেওয়ালের মধ্যে। ওটায় ঘাতক ছিল বন্দুকের গুলি, এটায় গলার ফাঁস। রামগড়ে নিহতের সংখ্যা ছিল পাঁচ। এখানে মেঝেতে একটা, আর খাটের উপর পাশাপাশি পড়ে আছে পাঁচটা দেহ। ওটায় লাশগুলোর মুখ ঢাকা ছিল কাপড়ে। এখানে নেই।
মেঝেতে প্রাণহীন দেহ এক মহিলার। গলায় উলের চাদরের প্যাঁচ। বয়স তিরিশের নীচেই হবে। খাটে ফুলের মতো পাঁচটি বাচ্চা মেয়ে। যেন ঘুমোচ্ছে নিশ্চিন্তে। কারও গলায় ওড়নার ফাঁস, কারও গলায় মাফলারের। বয়স? সবচেয়ে বড় যে, সে কিছুতেই বারোর বেশি নয়। সবচেয়ে ছোট দু’জনকে দেখলেই বোঝা যাচ্ছে যমজ। বয়স খুব বেশি হলে পাঁচ-ছয়।
