বৈদ্যনাথের গলার স্বর আমূল পালটে গিয়েছে এখন। এ স্বর প্রতিপত্তিশালী কর্পোরেট কর্তাকে সৌজন্যমিশ্রিত পুলিশি প্রশ্নের নয়। জালে জড়িয়ে যাওয়া অপরাধীকে উদ্দেশ করে এ স্বর এখন আত্মবিশ্বাসী আইনরক্ষকের। সব খুলে বলা ছাড়া উপায় ছিল না প্রদীপের।
পুরোটাই ঠান্ডা মাথায় পরিকল্পনা। সিঙ্গাপুরে বেড়াতে যাওয়ার আগেই। দুটো কারণ ছিল। এক, লীনার টাকাপয়সার বায়নাক্কা সামলাতে সামলাতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন প্রদীপ। মুক্তির পথ খুঁজছিলেন। দুই, বিয়ের বছরদুয়েক পর থেকেই লীনার ‘কুছ পরোয়া নেহি’ জীবনযাপন। কখন কোন ক্লাবে কোন পুরুষের ঘনিষ্ঠ হচ্ছেন, কোন পার্টি থেকে কখন বেরিয়ে পুরুষসঙ্গীকে নিয়ে চলে যাচ্ছেন মৈনাক-এর ফ্ল্যাটে, খবর ঠিকই পেয়ে যেতেন প্রদীপ। সামাজিক পরিচিতির পরিধিটা নেহাত ছোট ছিল না তাঁর। স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া ছিল প্রায় নিত্যনৈমিত্তিক। লীনা বদলাননি নিজেকে, প্রদীপও আর্থিক দিক থেকে স্ত্রীকে কোণঠাসা করার চেষ্টা করেছেন ক্রমশ। এবং একটা সময় সিদ্ধান্ত নিয়েছেন স্ত্রী-কে পৃথিবী থেকেই সরিয়ে দেওয়ার।
সিঙ্গাপুরে বেড়াতে যাওয়াটা লোক-দেখানো। সপ্তাহদুয়েক আগেই যিনি স্ত্রী-র সঙ্গে বিদেশ ঘুরে এলেন, তিনি হঠাৎ খুন করতে যাবেন কেন সহধর্মিণীকে, এই ধারণা তৈরি করতে। তাজ বেঙ্গল-এ লাঞ্চের বুকিং-ও একই কারণে। স্ত্রী-র সঙ্গে যাঁর লাঞ্চে যাওয়ার কথা হয়ে আছে, তিনি সেদিনই খুন করবেন অক্লেশে, বিশ্বাসযোগ্য?
প্রদীপ প্রাথমিক জেরায় বলেছিলেন, কথা ছিল, লীনা বাড়ি থেকে ট্যাক্সিতে ক্যামাক স্ট্রিটের অফিসে আসবেন। মিথ্যে বলেছিলেন। কথা বরং ছিল, ফ্ল্যাটের তদারকিতে লীনা মৈনাক-এর ফ্ল্যাটে যাবেন। সেখানে পৌনে দুটো-দুটো নাগাদ প্রদীপ চলে আসবেন অফিস থেকে। লীনাকে তুলে লাঞ্চ করতে যাবেন একসঙ্গে।
প্রদীপ এসেছিলেন কথামতো, সময়মতো। হাতে ছিল ফোলিও ব্যাগ। যার ভিতরে ছিল কাপড়ের টুকরো, প্লাস্টিকের ছোট প্যাকেট একটা আর নারকেল দড়ি। লীনার ফ্ল্যাটে গিয়ে টুকটাক কিছু কথাবার্তার পর আচমকাই আক্রমণ করেছিলেন স্ত্রী-কে। প্রদীপ, আগে লিখেছি, যথেষ্ট স্বাস্থ্যবান ছিলেন। হতচকিত লীনার সাময়িক প্রতিরোধকে আয়ত্তে আনতে বেশি সময় লাগেনি। শ্বাসরোধ করে মেরেছিলেন স্ত্রী-কে। তারপর বিবস্ত্র করে দিয়েছিলেন লীনাকে। এটা কেন? প্রদীপের মুখেই শুনুন— ‘রাগে। ওকে সবার সামনে লিটারালি বেআব্রু করে দিতে চেয়েছিলাম। অনেকে তো জানতই ওর চরিত্রের স্বরূপ। এবার দেখুক। সবাই দেখুক।’
রান্নাঘরে লীনার দেহ ঢুকিয়ে রেখে বেরিয়ে এসেছিলেন প্রদীপ। মুখে কাপড় গুঁজে, হাত নারকেল দড়ি দিয়ে বেঁধে। ফোলিও ব্যাগে ভরে নিয়েছিলেন লীনার পোশাকআশাক আর হ্যান্ডব্যাগ। হ্যান্ডব্যাগ থেকে ফ্ল্যাটের চাবিটা নিয়ে বাইরে থেকে তালা বন্ধ করে লিফট ডেকেছিলেন নির্বিকার। আবাসন থেকে বেরিয়ে অফিস ফেরার পথে ড্রাইভার ইসমাইলকে বলেছিলেন আউট্রাম রোড হয়ে যেতে। গাড়িটা দাঁড় করিয়েছিলেন নেচার পার্ক-এর সামনে। ইসমাইল অপেক্ষা করছিল গাড়িতে, আর প্রদীপ ব্যাগ হাতে ঢুকে গিয়েছিলেন পার্কে। চাবিটা একটা প্লাস্টিকের প্যাকেটে মুড়ে ফেলে দিয়েছিলেন ঝোপঝাড়ের মধ্যে। লীনার জামাকাপড় ব্যাগসুদ্ধ ফেলেছিলেন আর-এক প্রান্তে। তারপর সোজা অফিস। পরের দিন থানায় ডায়েরি, আর তারও পরের দিন সশরীরে লালবাজারে এসে কুম্ভীরাশ্রু। পচাগলা মৃতদেহ কয়েকদিনের মধ্যে আবিষ্কৃত হবেই, জানতেন প্রদীপ। প্রশ্নের জবাব দেওয়া তখন মুশকিল হবে, জানতেন। তাই এগিয়েছিলেন আটঘাট বেঁধেই।
স্বীকারোক্তি অনুযায়ী যাওয়া হল নেচার পার্ক-এ। কাগজের মোড়কে চাবিটা পাওয়া গিয়েছিল নির্দিষ্ট জায়গাতেই। কিন্তু পাওয়া যায়নি লীনার পোশাক আর হ্যান্ডব্যাগ। কত লোকেরই তো যাতায়াত ওই পার্কে নিত্যদিন। কেউ হয়তো নিয়ে গিয়েছিল দেখতে পেয়ে।
চার্জশিটের প্রস্তুতি যখন তুঙ্গে, তখনও বৈদ্যনাথ পাননি একটা প্রশ্নের উত্তর। খুনের দিন ‘ভিজিটর্স রেজিস্টার’-এ জলের দাগে দুটো এন্ট্রি মুছে যাওয়াটা। কী ব্যাখ্যা? উত্তর মেলেনি। এমন ব্যাখ্যাতীত সমাপতন বোধহয় কালেভদ্রেই সম্ভব, যা হাজির হয় তদন্তকে বিপথগামী করার সম্ভাব্য উপাদানসমেত।
এ মামলার পরিণতি অনেকাংশেই ছিল পারিপার্শ্বিক প্রমাণ (circumstantial evidence) নির্ভর। খুনের কোনও প্রত্যক্ষদর্শী নেই। শ্বাসরোধ করে হত্যা, খুনে ব্যবহৃত অস্ত্রের প্রশ্ন নেই। অকুস্থলের বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় আঙুলের বা পায়ের ছাপ মেলেনি অভিযুক্তের। অপরাধী কে, সে বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে গেলেও তদন্তকারীকে অসম্ভব যত্নবান হতে হয় এ ধরনের মামলায়, যেখানে প্রমাণ-পরম্পরায় (chain of evidence) সামান্যতম ফাঁকফোকর থাকলেও ভরাডুবি অনিবার্য। এবং এ ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ছিলেন অর্থবান। প্রদীপকুমার সেন যে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে অর্থব্যয় করবেন যথেচ্ছ, জানাই ছিল।
কী ঘটেছিল, কীভাবে এবং কেন, চার্জশিটে উঠে এসেছিল ছবির মতো। বিচারপর্বে অভিযুক্তের আইনজীবীর প্রধান যুক্তি ছিল, ষাট বছরের এক প্রৌঢ়র পক্ষে একা ওইভাবে প্রায় পনেরো বছর কম বয়সের মহিলাকে খুন করা অসম্ভব। এ যুক্তি ধোপে টেকার ছিল না। টেকেওনি। লীনাকে কাবু করার মতো স্বাস্থ্য যে অভিযুক্তের ছিল, রায়ে উল্লিখিত হয়েছিল।
