আর এমনই কপাল, না লীনা-প্রদীপ, না স্বয়ম্ভু, কেউই ব্যবহার করতেন না মোবাইল। চার বছর আগে, ’৯৫-এ, ভারতে এসে গিয়েছে মোবাইল ফোন। রাস্তাঘাটে সবারই হাতে হাতে ফোনের অভ্যেস চালু হতে তখনও ঢের দেরি। তবু, সামাজিক অবস্থানের বিচারে ওঁদের তিনজনের কাছে থাকতেই পারত মোবাইল। থাকলে তদন্তে সুবিধে হত অনেক। যাক, ছিল না যখন, কী আর করা?
ঘটনার পরের দুই সপ্তাহে প্রদীপ-স্বয়ম্ভু তো বটেই, আবাসনের কর্মীদের সবাইকে লালবাজারে ডেকে দফায় দফায় জেরা করেছেন বৈদ্যনাথ। অন্তত চারবার তো বটেই। তবু সিদ্ধান্ত নিলেন সবাইকে আর একবার তলব করার। পঞ্চমবার রুটিনমাফিক ডেকে পাঠানোর সময় জানতেন না, রহস্যভেদ দ্রুত হতে চলেছে অভাবিত ঘটনাপ্রবাহে।
২৯ জুলাই। লালবাজারের ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের দোতলা। ঘড়িতে সাড়ে এগারোটা। সকাল দ্রুত পা চালাচ্ছে দুপুরের দিকে। নিজের ঘরে আছেন বৈদ্যনাথ। সঙ্গে এক সহকারী অফিসার। পাশের একটা ঘরে অপেক্ষায় প্রদীপকুমার সেন, ডা. স্বয়ম্ভু মুখার্জি, মৈনাক-এর কেয়ারটেকার দিলীপ আর লিফটম্যান বরুণ। দিলীপ-বরুণ ফিরে গেলে বাকিদের আসার কথা পালা করে।
প্রথমে প্রদীপ। বৈদ্যনাথ ইচ্ছে করেই সবাইকে বসিয়ে রেখেছেন ঘণ্টাখানেক। মিস্টার সেনের ডাক পড়ল প্রায় পৌনে একটায়। এত দেরি হওয়ায় বেশ ধৈর্যচ্যুত দেখাচ্ছে ভদ্রলোককে। বিরক্তি গোপনের চেষ্টাও করলেন না বিশেষ। চেয়ার টেনে বৈদ্যনাথের মুখোমুখি বসতে বসতেই বললেন, ‘মিস্টার সাহা, এই নিয়ে পাঁচবার হল। একই কথা আর কতবার জানতে চাইবেন আপনারা? এক মাসও হয়নি আমার স্ত্রী মারা গেছেন। মেন্টালি ভীষণ ডিস্টার্বড আছি। অফিসের কাজও শিকেয় উঠেছে। তার মধ্যে বারবার লালবাজারে এভাবে আসতে হলে…।’
বৈদ্যনাথ স্ট্র্যাটেজি ঠিক করেই রেখেছিলেন। শুরু থেকেই চালিয়ে খেলবেন আজ। একদম কৃষ্ণমাচারি শ্রীকান্তের স্টাইলে।
—সরি মিস্টার সেন। আমারই কি ভাল লাগছে বারবার এভাবে ডাকতে? আপনারা কেউই পুরো সত্যিটা বলছেন না বলেই ডাকতে হচ্ছে। উপায় কী?
প্রদীপও ঝাঁঝিয়ে উত্তর দেন।
—কোন সত্যিটা বলিনি? কোনটা?
বৈদ্যনাথকে এবার উত্তেজিত দেখায় সামান্য।
—আমাকে বলে দিতে হবে, কোনটা? ডায়েরির মাত্র কয়েকটা পাতা নিয়ে আপনাকে প্রশ্ন করেছি এতদিন। বাকিগুলোর কথা তুলিইনি। এই ভেবে, যে আপনি নিজেই বলবেন হয়তো।
টেবিলে রাখা লীনার ডায়েরিটা হাতে তুলে নিয়ে বলে চলেন বৈদ্যনাথ।
—খুন হওয়ার দিনতিনেক আগে আপনার মিসেস কী লিখেছিলেন ডায়েরিতে, শুনবেন?
‘এভাবে আর পারছি না আমি। সিঙ্গাপুরে গিয়ে আমাকে হোটেলের রুমের মেঝেতে শুতে বাধ্য করল প্রদীপ। আমার সঙ্গে বেড শেয়ার করতে নাকি ওর ঘেন্না করে। আমি নাকি রাস্তার মেয়ে। একটা সামান্য পারফিউম কিনতে চেয়েছিলাম গতকাল। মুখের উপর বলল, একটা পয়সাও খরচ করবে না আমার জন্য। বিদেশে বেড়াতে এনেছে, এই ঢের।’
একটু থামেন বৈদ্যনাথ, শান্ত ভাবে চোখে চোখ রাখেন প্রদীপ সেনের।
—কী সেনসাহেব, আরও শুনবেন? আমি আরও বলতে পারি। কিন্তু শুনতে আপনার ভাল লাগবে না…
প্রদীপ সেনের চোখমুখ এতক্ষণে রাগে থমথমে। থামিয়ে দেন প্রশ্নকারীকে।
—না, ভাল লাগছেও না। আর শুনতেও চাই না আমি। কারণ, লীনা চিরকালই মিথ্যেবাদী ছিল, ড্যাম লায়ার! শুনুন মিস্টার সাহা, পুরোটাই মিথ্যে ছিল ওর…
—কোনটা মিথ্যে? এই ডায়েরির লেখাগুলো মিথ্যে? টাকাপয়সা দিতেন না, জামাকাপড় দিতেন না, প্রতি মুহূর্তে অপমান করতেন, এগুলো মিথ্যে? সিঙ্গাপুরে একটা পারফিউম কিনতে চেয়েছিলেন বলে পাঁচটা কথা শুনিয়েছিলেন, মিথ্যে?
—দিতাম না, বেশ করতাম। আমার কাছে সাদা হাতি পোষার মতো হয়ে গিয়েছিল লীনা। টাকা, টাকা আর ওনলি টাকা। আমি তো তবু ওর শখ মেটাতে এতগুলো টাকা খরচ করে সিঙ্গাপুর নিয়ে গিয়েছিলাম। অন্য কেউ হলে করত না। আর পারফিউম, জামাকাপড়? ওর সবকিছু, এমনকী মৈনাক-এ যে আন্ডারগার্মেন্টস পরে গিয়েছিল সেদিন, সেগুলোও সিঙ্গাপুরের lingerie shop থেকে কেনা।
শেষ বাক্যটা বলেই আচমকা থেমে যান প্রদীপ। দৃশ্যতই অপ্রস্তুত। বৈদ্যনাথ নিমেষে বোঝেন, অপরাধীর যুক্তি-তক্কো-গপ্পোর বাসরঘরে এই সেই কাঙ্ক্ষিত ছিদ্র, যা নজরে আসা মাত্রই কালসর্প হয়ে ঢুকে পড়তে হয় তদন্তকারীকে, বিন্দুমাত্র কালবিলম্ব না করে।
—তাই? কী করে জানলেন ওই আন্ডারগার্মেন্টস পরেই সেদিন নিজের ফ্ল্যাটে গিয়েছিলেন লীনা? আধঘণ্টা থেকে কথাবার্তা বলেই তো চলে এসেছিলেন। ওটাই আপনার সঙ্গে শেষ দেখা, শেষ কথা। ওই সময়ের মধ্যে শারীরিক মিলন না হয়ে থাকলে নিশ্চিত হচ্ছেন কী করে অন্তর্বাসের ব্যাপারে? হয়েছিল?
স্রেফ ঢিল ছুড়েছিলেন বৈদ্যনাথ, একরকম মরিয়া হয়েই। যেটা পড়ে শুনিয়েছিলেন ডায়েরি থেকে, সেটা বানানো। সিঙ্গাপুরের ব্যাপারে কোনও এন্ট্রিই ছিল না ডায়েরিতে। হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে আত্মঘাতী মন্তব্য করে বসবেন প্রদীপ, তিন সপ্তাহের দুর্ভেদ্য রক্ষণকে ভঙ্গুর দেখাবে রাতারাতি, ভাবতে পারেননি বৈদ্যনাথ। ক্রমশ অসহায় দেখাতে থাকে প্রদীপকে, আমতা-আমতা করে কিছু বলতে চেষ্টা করেন।
—না মানে…
—মানে একটাই হয় মিস্টার সেন। আপনি উকিল-টুকিলকে ফোন করতে পারেন। কোনও অসুবিধে নেই। আপনাকে অ্যারেস্ট করা হচ্ছে। সারা দিন সারা রাত পড়ে আছে। তবে যত তাড়াতাড়ি সত্যিটা স্বীকার করবেন, ততই ভাল। পুলিশি আদরযত্নের প্রয়োজন হবে না, আই অ্যাম শিয়োর। তা ছাড়া আপনার বয়স হয়েছে…
