অন্যদিকে, খুনের দিনের গতিবিধি সম্পর্কে প্রদীপের বয়ান মিলে যাচ্ছে লিফটম্যান-কেয়ারটেকারের বিবরণের সঙ্গে। আনুমানিক যে সময়ে খুন বলে চিকিৎসকরা জানাচ্ছেন, প্রদীপ সেই সময়সীমার মধ্যে লীনার ফ্ল্যাটে গিয়েছিলেন। সর্বসমক্ষেই গিয়েছিলেন। তাজ বেঙ্গলে খোঁজ নিয়ে জানা যাচ্ছে, সত্যিই সেদিন লাঞ্চ বুকিং ছিল সেনদম্পতির। এবং সে-রাতে সত্যিই ফোন ডেড হয়ে গিয়েছিল লীনার মায়ের বাড়িতে। নিজে মহিলার সঙ্গে কথা বলে জেনেছেন বৈদ্যনাথ। ফোলিও ব্যাগে কী ছিল? উত্তরে বলেছেন, অফিসের কাগজপত্র। হতেই পারে। অবিশ্বাসের কোনও কারণ নেই। সর্বোপরি নিজেই লালবাজারে এসে খোদ নগরপালের সঙ্গে দেখা করে তদন্তপ্রক্রিয়া চালু করেছেন প্রদীপ। না হলে তো স্রেফ ‘মিসিং ডায়েরি’-র অনুসন্ধানেই সময় চলে যেত রুটিনমাফিক। কিছুই তো সেভাবে লুকোনোর চেষ্টা করেননি, বৈবাহিক অশান্তির তীব্রতাটা বাদ দিয়ে।
অবশ্য সম্ভাব্য অপরাধীর এই ‘কিছুই তো লুকোচ্ছি না’-র প্রবণতা নতুন কিছু নয়। অনেকই হয়। পুলিশকে বিপথে চালিত করতে সব তাস আগেভাগেই দেখিয়ে দেওয়ার চালাকি, যাতে সন্দেহের সূচিমুখ একটা সময়ের পর ধাবিত হয় অন্য দিকে। আর এ তো কল্পনার গোয়েন্দাকাহিনি বা সিনেমা নয়, যে পুলিশ যাকে প্রাথমিক তদন্তে অপরাধী মনে করছে, শেষ বিচারে তার দোষী হওয়ার সম্ভাবনা শূন্য। এ তো ‘ফিকশন’ নয়, যে কোনও মহাপ্রতিভাধর গোয়েন্দা মধ্যপথে আবির্ভূত হবেন এবং শেষে পুলিশি ধারণাকে দুরমুশ করে ছাড়বেন। এবং দেখা যাবে, পুলিশ যা ভেবেছিল, সবই স্থূলবুদ্ধির প্রতিফলন মাত্র। সুতরাং প্রদীপ সেনকে ক্লিন চিট দেওয়াটা আহাম্মকি হবে। কিন্তু যদি প্রদীপ খুনটা করে থাকেন, প্রমাণ কই? সন্দেহের বশে তো আর খুনের মামলায় কাউকে আদালতে চালান করা যায় না, যখন ন্যূনতম প্রমাণটুকুও নেই হাতে। আর যদি প্রদীপ খুনি না হন, তা হলে কে? অন্য কেউ? না, অন্য কারা?
‘অন্য কেউ’ বলতে ডাক্তার স্বয়ম্ভু মুখার্জির নাম মাথায় আসতে বাধ্য। আপাতদৃষ্টিতে মনে হবে, সন্দেহের আওতার বাইরে। কিন্তু সত্যিই কি তাই? হ্যাঁ, ‘অ্যালিবাই’ যথেষ্ট মজবুত। খুনের দিনে, খুনের সম্ভাব্য সময়ে বাড়িতেই ছিলেন, যাচাই করে জানা গিয়েছে নিঃসংশয়। কিন্তু এমনও তো হতে পারে, খুনটা নিজে করেননি। করিয়েছেন। মোটিভ তো ছিলই। ফ্ল্যাটের দখল ফিরে পাওয়া এবং নতুন করে ভাড়া দেওয়া বা বেচে দেওয়া। অমন জায়গায় ফ্ল্যাট অনায়াসে বিক্রি হবে বিশাল অঙ্কের টাকায়। ভাড়া দিলেও পাবেন, লীনা যা দিতেন, তার অন্তত তিনগুণ।
ফ্ল্যাটের প্রসঙ্গেই কিছু খটকা। লীনার জীবনযাপন নিয়ে যে তাঁর সঙ্গে এত বিশ্রী কাদা ছোড়াছুড়ি হয়েছিল, এটা প্রাথমিক কথাবার্তায় চেপে গেলেন কেন? মামলা নিয়ে কোনও আপসরফা হয়েছিল লীনার সঙ্গে? হলে কেমন রফা? কী সেই রফাসূত্র?
সম্পর্কের উন্নতি হওয়া সত্ত্বেও খুনটা যদি স্বয়ম্ভুই লোক লাগিয়ে করিয়ে থাকেন, ধরে নিতে হয়, ফ্ল্যাটের মালিকানা প্রাপ্তি কারণ হিসাবে নেহাতই গৌণ। গভীরতর উদ্দেশ্য ছিল কিছু। কী হতে পারে? ‘সম্পর্কের উন্নতি’ মানে কী? কেমন সম্পর্ক? সেই সূত্রেই ব্ল্যাকমেল? বা আরও গুরুতর কিছু? হাজার প্রশ্ন মাথায় ঘুরতে থাকে বৈদ্যনাথের।
খুনটা করানোই যদি হয়ে থাকে, তা হলে কাদের দিয়ে? আবাসনের কর্মীদের এক বা একাধিককে দিয়ে করানোটাই সবচেয়ে সহজ। ফ্ল্যাটের অ-আ-ক-খ থেকে অনুস্বার-চন্দ্রবিন্দু পর্যন্ত নখদর্পণে ওদের। টাকার লোভ বড় সাংঘাতিক জিনিস। হতেই পারে, টাকার বিনিময়ে নিরাপত্তাকর্মীদের কয়েকজনকে, বা হয়তো একজনকেই, হাত করে খুনটা করিয়েছেন স্বয়ম্ভু।
সম্ভাবনা নম্বর তিন, খুনটা স্রেফ ব্যক্তিগত আক্রোশের বশে হয়েছে। এবং করেছেন আবাসনের এক বা একাধিক কর্মী। লীনা মিষ্টভাষী ছিলেন, এমন অভিযোগ জেরার সময় আবাসনের কেউ করেননি। অত্যন্ত রগচটা ছিলেন। মুখে কোনও লাগাম থাকত না রেগে গেলে। বৈদ্যনাথ বিশ্বস্ত সোর্স লাগিয়েছিলেন একাধিক। যারা নানা কাজকর্মের ছুতোয় ভাব জমানোর চেষ্টা করেছে মৈনাক-এর কর্মীদের সঙ্গে। এবং সোর্স মারফত পাওয়া খবর অনুযায়ী, ঘটনার দিনদশেক আগে লিফটম্যান বরুণের সঙ্গে তীব্র বাদানুবাদ হয়েছিল লীনার। লিফট খুলতে দেরি হয়েছিল। যাচ্ছেতাই ভাষায় গালাগালি করেছিলেন লীনা। সে নিয়ে কেয়ারটেকার অফিসে নাকি চর্চাও হয়েছিল বিস্তর।
লীনা নাকি মানুষ বলেই গণ্য করতেন না কর্মীদের, এতটাই নাকউঁচু ছিলেন। কর্মীরাও অত্যন্ত অপছন্দ করতেন বদমেজাজি লীনাকে। পুষে রাখা রাগ জমতে জমতে কি কোনওভাবে এমন পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল, যে একক বা যৌথ ষড়যন্ত্রে একেবারে মেরে ফেলারই সিদ্ধান্ত? ভাবতে একটু কষ্টকল্পিত লাগলেও একেবারেই অসম্ভব কি? আর সবচেয়ে বড় কথা, বৃষ্টির জলে শুধু সেদিনের ওই সময়ের এন্ট্রি দুটোই মুছে গেল? একটু বেশিই কাকতালীয় না?
একটাই দূরতম সম্ভাবনা পড়ে আছে আর। বব শেষাদ্রি। লীনার প্রথম স্বামী। যাঁর কোনও খোঁজই পাওয়া গেল না এদিক-ওদিক অনেক খবর নিয়েও। কেউ কিছু বলতে পারলেন না। এই বব কি কোনওভাবে ফের উদয় হয়েছিলেন লীনার জীবনে? হলেই বা কী, সন্ধান তো পেতে হবে আগে।
