মোদ্দা কথা, লোক যেহেতু কম, পরিস্থিতি অনুযায়ী সবার কাজটাই সবাই কমবেশি করে থাকে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে। ২৯ এবং ৩০ তারিখ যাঁরা ডিউটিতে ছিলেন, সবার সঙ্গে কথা বলা হল বিস্তারিত। বাড়তি তথ্য বলতে, ২৯ তারিখ যখন এসেছিলেন মি. সেনের হাতে একটা মাঝারি সাইজের ফোলিও ব্যাগ ছিল। বেরনোর সময়ও ব্যাগটা সঙ্গে ছিল। আবাসিকদের ছাড়া অন্য কারও গাড়ি ভিতরে পার্ক করার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা ছিল মৈনাক-এ। ২৯ তারিখ প্রবল বৃষ্টি হচ্ছিল বলে প্রদীপ কেয়ারটেকার অফিসে এসে অনুরোধ করেন গাড়ি ভিতরে রাখতে দেওয়ার জন্য। ড্রাইভার ইসমাইল ভিতরেই পার্ক করেছিল প্রদীপের ছাইরঙা মারুতি এস্টিম।
লিফটে বরুণ দশতলায় পৌঁছে দিয়েছিলেন প্রদীপকে। নামিয়েও এনেছিলেন আধঘণ্টা পর। পরের দিন, ৩০ তারিখ সকালে প্রদীপ যখন এসেছিলেন, লিফটের দায়িত্বে ছিলেন শংকর। বরুণ-শংকর দু’জনের বিবরণের সঙ্গে প্রদীপের বয়ান মিলে গেল হুবহু। সেনসাহেবের আচরণে কোনও অস্বাভাবিকতা চোখে পড়েছিল? ‘না তো!’ দু’জনেই বললেন একবাক্যে। লীনা ২৯ তারিখ সেই যে সকাল দশটায় এসেছিলেন, তারপর দুপুর-বিকেলের মধ্যে আর বেরিয়েছিলেন? সেই একবাক্যেই উত্তর, ‘না, দিদিমণি তো আর বেরননি। বেরলে তো দেখতেই পেতাম।’
কী দেখতে পেতেন ওঁরা আর কী না পেতেন, সে অবশ্য বৈদ্যনাথ বুঝে গিয়েছিলেন খুনের দিনদুয়েকের মধ্যেই। মৃতদেহ উদ্ধার হয়েছিল ৩ তারিখ। সাদা পোশাকে বৈদ্যনাথ ৫ তারিখ রাতে কাউকে কিছু না বলে একাই ঢুঁ মেরেছিলেন মৈনাক-এ। দেখেছিলেন, কেয়ারটেকার অফিসের সামনে নাইট শিফটের নিরাপত্তারক্ষী খুব মন দিয়ে চেয়ারে বসে ঢুলছেন। যে কেউ ঢুকে আবার বেরিয়ে যেতে পারে, চোখেও পড়বে না ঢুলুনিতে আচ্ছন্ন রক্ষীর। শুধু মূল গেটটা টপকাতে হবে। যেটা কোনও ব্যাপারই নয় মোটামুটি শারীরিক সক্ষম যে কারও পক্ষে।
এই যখন অবস্থা, কী করে পুরোপুরি ভরসা করা যায় এদের কথায়? কী করে একশো শতাংশ নিশ্চিত হওয়া যায়, ২৯ তারিখ অন্য কোনও বহিরাগত যাননি লীনার ফ্ল্যাটে, মিস্টার সেন ছাড়া? এরা কিছু বললেই ‘ভিজিটর্স রেজিস্টার’ দেখাচ্ছে। সব ওতে নোট করা থাকে।
কী নোট করা থাকে, খুঁটিয়ে দেখতে গিয়েই ঘোরতর খটকা। এটা কী হল? ২৯ তারিখ দুপুর সোয়া দুটোয় মিস্টার সেন এসেছিলেন, এন্ট্রি আছে। কিন্তু চারটে থেকে সাড়ে ছ’টার মধ্যে দুটো এন্ট্রি পড়া যাচ্ছে না। জলে ধুয়েমুছে গেছে, হাজার চেষ্টাতেও উদ্ধার করা যাচ্ছে না নাম দুটো। আগে-পরের দিনগুলো নিয়ে কোনও সমস্যা নেই। শুধু খুনের দিন এবং সম্ভাব্য সময়ের এন্ট্রিতেই জল পড়ে গেল? কী করে?
বৈদ্যনাথের একেবারেই মনঃপূত হল না কেয়ারটেকার দিলীপবাবুর ব্যাখ্যা, ‘সেদিন সারাদিন ধরে বৃষ্টি হয়েছিল। ভিজিটর্স রেজিস্টার বেশিরভাগ সময় তো বাইরেই থাকে। বৃষ্টির জল অসাবধানে পড়েই হয়তো এন্ট্রিগুলো…।’ শুধু ওই দিনের, ওই সময়েই বৃষ্টিজল? বৈদ্যনাথ রেজিস্টার নিয়ে গেলেন ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের কাছে। ওঁরাও পারলেন না মুছে যাওয়া নামগুলো পড়তে।
বেশ, নাম না হয় পড়া যাচ্ছে না। মাত্র তো দিনকয়েক আগের কথা, মনে করে দেখুন না, মিস্টার সেনের পর আর কে কে এসেছিলেন বাইরে থেকে? ২৯ তারিখ দুপুর চারটে থেকে সন্ধে সাড়ে ছ’টার মধ্যে? লিফটম্যান বরুণ অনেক ভেবে জানালেন, দু’জন এসেছিলেন। একজন দাড়িওলা ভদ্রলোক, মাঝবয়সি। আরেকজন প্রৌঢ়া। কেউই লীনার ফ্ল্যাটে যাননি। প্রথমজন সাততলায় নেমেছিলেন, দ্বিতীয়জন পাঁচে। সঙ্গে বরুণ যোগ করলেন ‘যদ্দূর মনে পড়ছে।’
বরুণের ‘মনে পড়া’য় আস্থা রাখার কোনও কারণ পাচ্ছিলেন না বৈদ্যনাথ। যদি আস্থা রাখেনও তর্কের খাতিরে, বহিরাগত কেউ তো অন্য ফ্ল্যাটের নম্বর এন্ট্রি করে, অন্য তলায় নেমে আরামসে যেতেই পারে লীনার ফ্ল্যাটে। কে দেখতে যাচ্ছে? লিফটে কে কোন তলায় নেমেছিলেন, কী প্রমাণ হয় তাতে?
.
তিন সপ্তাহ পেরিয়ে গেছে খুনের পর। প্রমাণ বা সূত্র মেলেনি কিছু খুনিকে চিহ্নিত করার মতো। এদিকে প্রায়ই সিপি খোঁজ নিচ্ছেন, কিছু হল কিনা? অবসন্ন লাগে বৈদ্যনাথের। সন্ধেবেলায় গেলেন ডিসি ডিডি-র ঘরে। গুরুত্বপূর্ণ মামলায় তদন্তকারী অফিসারকে দৈনন্দিন হালহকিকত জানাতে হয় গোয়েন্দাপ্রধানকে। নিয়ম।
শ্রান্ত চেহারাটা দেখেই গোয়েন্দাপ্রধান বোঝেন, নির্ণায়ক সূত্র এখনও অধরা থাকায় হতাশা ক্রমশ ঘিরে ধরছে বৈদ্যনাথকে। পিঠে হাত রাখেন, ‘লেগে থাকাটাই আসল। দরকারে শূন্য থেকে শুরু করো। দেখবে, হঠাৎ লিড পেয়ে যাবে। ছেড়ো না। লেগে থাকো।’
ঠিকই। লেগে থাকতে হয়। গাভাসকার একবার বলেছিলেন, যে-কোনও পেশায় সফল হতে গেলে তিনটে ‘ডি’ প্রয়োজন। ডিসিপ্লিন, ডেডিকেশন, ডিটারমিনেশন। শৃঙ্খলা, নিষ্ঠা, সংকল্প। সফল তদন্তকারীর অবশ্য সবার আগে দরকার তিনটে ‘পি’। পেশেন্স, পেশেন্স এবং পেশেন্স। অনন্ত ধৈর্য সর্বাগ্রে। মেধা-পরিশ্রম-একাগ্রতা, এসব আসবে অনেক পরে। ধৈর্যই তদন্তকারীর আসল চাঁদমারি। কিছুতেই যখন কিছু হচ্ছে না, নিজেকেই বারবার গুনগুনিয়ে ‘হাল ছেড়ো না বন্ধু’ শুনিয়ে যাওয়া চেতনে-অবচেতনে।
পরের দিন অফিসে এসে শূন্য থেকেই ফের শুরু করেন বৈদ্যনাথ। সন্দেহের বৃত্ত খুব বড় নয়। সন্দেহভাজনের তালিকায় শীর্ষবাছাই নিঃসন্দেহে প্রদীপকুমার সেন। সম্ভাব্য মোটিভ? দাম্পত্য অশান্তির সহ্যসীমা অতিক্রম করা। সম্পর্ক যে তিক্ত থেকে তিক্ততর হয়েছিল, উল্লেখ আছে লীনার ডায়েরিতে। টাকাপয়সা নিয়ে অশান্তি কি চরম পর্যায়ে পৌঁছেছিল? লীনার বন্ধুমহল থেকে জানা যাচ্ছে, শহরের প্রথম সারির বিউটি পার্লারগুলোয় নিয়মিত যাতায়াত ছিল। দিনে তিন-চার প্যাকেট ক্ল্যাসিক সিগারেট খেতেন। অভ্যস্ত ছিলেন মদ্যপানে। চাকরি করতেন না, স্বামীর দেওয়া মাসিক তিন হাজারে চলত কী করে এতসব? অন্য উপার্জন ছিল? থাকলে, কী তার উৎস? কে টাকা দিত, এবং কেন? অন্য পুরুষসঙ্গ, এক বা একাধিক? প্রদীপ জেনে গিয়েছিলেন? যৌন-ঈর্ষা?
