লীনার যে ডায়েরি পুলিশ পেয়েছিল ফ্ল্যাট থেকে, তাতেও ধরা ছিল অসুখী দাম্পত্যের রোজনামচা। কখনও ইংরেজিতে লিখতেন, কখনও কখনও বাংলায়। লেখার সিংহভাগ জুড়ে প্রদীপের বিরুদ্ধে ক্ষোভ, চাকরি ছেড়ে দেওয়ার আক্ষেপ এবং টাকাপয়সার টানাটানির বৃত্তান্ত। ভাড়া বাড়ানোর জন্য বাড়িওয়ালার তাগিদ ক্রমে অসহনীয় হয়ে ওঠার উল্লেখও রয়েছে ডায়েরির পাতায়।
বাড়িওয়ালার পরিচয় প্রয়োজন এখানে। ডাক্তার স্বয়ম্ভু মুখার্জি। থাকেন মৈনাক থেকে ঢিলছোড়া দূরত্বে, ওল্ড বালিগঞ্জ রোডে। ফ্ল্যাট থেকে দুর্গন্ধ বেরচ্ছে দেখে আবাসিকরা ৩ জুলাই বিকেলে ডা. মুখার্জিকে ফোন করেছিলেন। তিনিই ফোনে যোগাযোগ করেন কড়েয়া থানার সঙ্গে।
ডা. মুখার্জি জানালেন, হ্যাঁ, অনেকদিন বাড়ির ভাড়া বাড়াননি লীনা। বারবার বললেও কর্ণপাত করতেন না। কয়েক বছর আগে উচ্ছেদের মামলাও করেছিলেন। কিন্তু বাড়িওয়ালা-ভাড়াটের মামলা যেমন চলতে থাকে অনন্তকাল, এক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। মাসের পর মাস, বছরের পর বছর। ভাড়া নিয়ে লীনার সঙ্গে কয়েক বছর আগে বাদানুবাদ হয়েছিল, কিন্তু ওই পর্যন্তই।
শুধু ‘ওই পর্যন্তই’ যে নয়, শীঘ্রই জানতে পারলেন বৈদ্যনাথ। স্রেফ বাদানুবাদ নয়, বাড়িওয়ালা-ভাড়াটের সম্পর্ক চূড়ান্ত তিক্ততায় পৌঁছেছিল বছর সাতেক আগে। মৈনাক-এর আবাসিকদের মিটিংয়ে স্বয়ম্ভু চোটপাট করেছিলেন লীনার বেপরোয়া জীবনযাপন নিয়ে। ফ্ল্যাটে যখন-তখন একাধিক পুরুষের যাতায়াত নিয়ে গলা চড়িয়েছিলেন, ‘আমার ফ্ল্যাটে এসব নোংরামো চলবে না!’ তুমুল তর্কাতর্কি হয়েছিল। লীনা পালটা বলেছিলেন, ‘আমার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আপনি বলার কে? ফ্ল্যাটের ভাড়ার টাকা গুনে দিচ্ছি, ব্যস! আমার জীবন আমি যেমন খুশি কাটাব। আপনি কে নাক গলানোর?’
এই অশান্তির কিছুদিন পরই লীনার বাড়িতে পুলিশ এসেছিল এক রাতে। ফ্ল্যাটে মধুচক্র চলছে, এই অভিযোগের তদন্তে। লীনাকে নিয়েও যাওয়া হয়েছিল থানায়, জিজ্ঞাসাবাদের জন্য। কাগজেও বেরিয়েছিল ঘটনার খবর। লীনার দৃঢ় ধারণা ছিল, পুলিশে অভিযোগটা স্বয়ম্ভুরই মস্তিষ্কপ্রসূত। এ নিয়েও ঝগড়াঝাঁটি হয়েছিল বিস্তর।
উচ্ছেদের মামলার কাগজপত্র ঘেঁটে বৈদ্যনাথ দেখলেন, লীনা যে দুশ্চরিত্রা এবং বাড়িতে দেহব্যবসা চালাচ্ছেন, সোজাসাপটা এমন অভিযোগ করেছিলেন স্বয়ম্ভু। পিটিশনের সঙ্গে ছিল ফ্ল্যাটে পুলিশি অভিযানের খবরের পেপারকাটিং।
স্বয়ম্ভু প্রথমে এসব কিছুই বলেননি। বরং জানিয়েছিলেন, উৎসাহ হারিয়েছিলেন মামলা নিয়ে। খবরই রাখেন না আর। জানতে চেয়েছিলেন বৈদ্যনাথ, ‘ঝামেলা যে কথা-কাটাকাটির থেকে অনেকটা বেশিই গড়িয়েছিল, বলেননি কেন আগে?’ সামান্য অসহিষ্ণু উত্তর এসেছিল, ‘অনেকদিন আগের কথা, মনেও ছিল না। আর এসব এই কেসে প্রাসঙ্গিক কি? বাড়িওয়ালা-ভাড়াটেতে এসব ঝামেলা তো হয়েই থাকে। আপনি কি বাই এনি চান্স আমাকে সন্দেহ করছেন? খোঁজ নিয়ে দেখতে পারেন, ২৯ তারিখ সারাদিন বাড়িতেই ছিলাম।’
খোঁজ নেওয়ার বাকি ছিল অনেক। দিনের মধ্যে নিয়ম করে চার-পাঁচ ঘণ্টা মৈনাক-এ কাটাচ্ছিলেন বৈদ্যনাথ। কাজ কি একটা? আবাসনে মোট চুয়ান্নটা ফ্ল্যাট। প্রত্যেকটা ফ্ল্যাটের বাসিন্দাদের নাম-ঠিকানা-পেশা ইত্যাদির তালিকা তৈরি করা। খুনের দিন কে কোথায় ছিলেন, কী করছিলেন, তার ‘ইনফর্মেশন শিট’ বানানো ঘণ্টার পর ঘণ্টার প্রশ্নোত্তরে। লীনার ফ্ল্যাটের মেরামতিতে যে মিস্ত্রিরা আসত-যেত, তাদের খোঁজ করে জেরা। এবং অপরাধের কোনও পূর্ব-ইতিহাস কারও আছে কিনা, যাচাই করে নেওয়া। ক্লাব-পার্টি-নাচাগানা-হইহই ছিল লীনার স্বভাবজাত। বন্ধুবৃত্তে কে কে ছিলেন তাঁর, কে কতটা ঘনিষ্ঠ ছিলেন তাঁদের মধ্যে, সে ব্যাপারে খবর জোগাড় করা বিনিদ্র দৌড়ঝাঁপে।
তদন্তের সনাতনী ব্যাকরণ মেনেই এগোচ্ছিলেন বৈদ্যনাথ। যে ব্যাকরণ বলে, তথ্যই শক্তি। কোনও তথ্যই তুচ্ছ নয়, এই ভেবে এগোও। যথাসাধ্য তথ্য মজুত করো। এবং তারপর কোন কোনটা জরুরি বা প্রাসঙ্গিক নয় একেবারেই, সেগুলো চিহ্নিত করো। সরিয়ে ফেলো চিন্তাস্রোত থেকে। ছবিটা আপনিই পরিষ্কার হয়ে আসবে। ছোট হয়ে আসবে তদন্তের বৃত্তটা, ভাবনা হবে স্বচ্ছতর।
বৃত্ত ছোট হওয়া দূরে থাক, রহস্য জটিলতর হল আবাসনের কর্মীদের জেরাপর্বে। মৈনাক-এর নিরাপত্তাব্যবস্থার সংক্ষিপ্ত বিবরণ শুরুতে দিয়েছি। দুটো জিনিস যোগ করার। এক, আবাসনে কোনও সিসি টিভি ছিল না। ঢোকা-বেরনোর কোন প্রযুক্তি-প্রমাণ পাওয়ার প্রশ্ন নেই। দুই, যাঁরা আবাসনের বাসিন্দা, তাঁদের ‘ভিজিটর্স রেজিস্টার’-এ নাম না লেখালেও চলত। কিন্তু বহিরাগত হলে কোন ফ্ল্যাটে কার সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছেন, রেজিস্টারে লেখা বাধ্যতামূলক। আবাসিকের সঙ্গে কোনও বহিরাগত এলে? নিয়মনাস্তি।
কেয়ারটেকার এবং অন্য নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে বৈদ্যনাথ বুঝলেন, ব্যবস্থা নিশ্ছিদ্র তো নয়ই। বরং ঢিলেঢালা, দায়সারা। ব্যাট-প্যাডের মধ্যে দিয়ে বল গলে যাওয়ার মতো ফাঁক যথেষ্ট।
কেয়ারটেকারের নাম দিলীপ চ্যাটার্জি। একজন সহকারী আছেন, জয়প্রকাশ শর্মা। লিফটম্যান একজনই। নাম, বরুণ রায়। দিলীপ-জয়প্রকাশকে সাহায্য করার জন্য রয়েছেন একজন কর্মী, শংকর পণ্ডিত। নিরাপত্তারক্ষী মাত্র তিনজন। ভানু ব্যানার্জি, শম্ভু বড়ুয়া এবং অসিত পণ্ডিত। তিন শিফটে আট ঘণ্টা করে ডিউটি। সকাল ছ’টা থেকে দুপুর দুটো। দুটো থেকে রাত দশটা। দশটা থেকে সকাল ছ’টা পর্যন্ত নাইট শিফট। একজন লিফটম্যানের পক্ষে চব্বিশ ঘণ্টা ডিউটি করা অসম্ভব। বরুণ মৈনাক-এ থাকেন দুপুর দুটো থেকে রাত দশটা পর্যন্ত। বাকি সময় পালা করে লিফটম্যানের ভূমিকায় থাকেন জয়প্রকাশ-শংকর।
