—মনে করার কী আছে? ফার্স্ট ওয়াইফ ছিল সুনন্দা। আমাদের এক ছেলে, এক মেয়ে। দু’জনেই বাইরে চাকরি করে। সুনন্দার সঙ্গে ডিভোর্স হয়েছে বছরচারেক আগে। বনিবনা হচ্ছিল না আমাদের। মিউচুয়াল কনসেন্টে ডিভোর্স।
—লীনা তো আপনার পিএ ছিলেন বিয়ের আগে, না?
—হ্যাঁ। বিয়ের পর চাকরি ছেড়ে দিয়েছিল। আমিই জোর করেছিলাম। ভাড়াবাড়িটাও ছেড়ে দিতে বলেছিলাম। রাজি হয়নি।
—সম্পর্ক কেমন ছিল আপনাদের?
—টাকাপয়সা নিয়ে মাঝে মাঝে অশান্তি হত। লীনা হাইপ্রোফাইল লাইফ পছন্দ করত। আমি মাসে মাসে হাতখরচের জন্য যথেষ্ট টাকা দিতাম। কিন্তু লীনার তাতে কুলোত না। এই নিয়ে মাঝে মাঝে ঝগড়া হত কখনও কখনও। মিটেও যেত। উই ওয়্যার ইন লাভ উইথ ইচ আদার। ইন ফ্যাক্ট, গত মাসের শুরুর দিকে সপ্তাহখানেকের জন্য সিঙ্গাপুর বেড়াতে গিয়েছিলাম আমরা। দারুণ কেটেছিল ছুটিটা।
—কাউকে সন্দেহ হয়? কে মারতে পারে মিসেস সেনকে?
—নো ক্লু। অ্যাবসোলিউটলি নো ক্লু। আমি জাস্ট ভাবতেই পারছি না…
—২৯ জুন, মানে মার্ডারের দিন, স্ত্রী-র সঙ্গে শেষ কখন দেখা হয়েছিল? আর ওইদিন আপনার মুভমেন্টটা একটু ডিটেলে জানা দরকার।
—সার্টেনলি। সেদিন আমাদের একসঙ্গে লাঞ্চ করার কথা ছিল তাজ বেঙ্গলে। আড়াইটে নাগাদ টেবিল বুক করেছিলাম।
—হুঁ…
—আমি রোজকার মতো সাড়ে ন’টা নাগাদ অফিস বেরলাম। কথা ছিল, লীনা ট্যাক্সি নিয়ে অফিসে চলে আসবে দেড়টা নাগাদ। সেখান থেকে তাজে যাব। লীনা যখন পৌনে দুটো পর্যন্ত এল না, বাড়িতে ফোন করলাম। কাজের লোক বলল, মেমসায়েব দশটার একটু পরে বেরিয়ে গেছেন।
—তারপর?
—হপ্তায় দু’-একদিন লীনা মৈনাক-এ যেত ইদানীং। ফ্ল্যাটের রিনোভেশন হচ্ছিল। মিস্ত্রিদের যাওয়া-আসা ছিল। নতুন করে সাজাচ্ছিল ফ্ল্যাটটা। আমি ভাবলাম ওখানেই গেছে হয়তো। আসতে দেরি হচ্ছে কোনও কারণে।
—আচ্ছা…
—গাড়ি নিয়ে নিজেই মৈনাক-এ গেলাম। এই দুটো-সোয়া দুটো হবে তখন। খুব বৃষ্টি হচ্ছিল সেদিন। লীনা ফ্ল্যাটেই ছিল। বলল, রিপেয়ার ওয়ার্ক সব ঠিকঠাক হয়েছে কিনা, আরও কিছু খুঁটিনাটি কাজ আছে কিনা, দেখতে এসেছিল। বৃষ্টি হচ্ছিল বলে বেরতে পারেনি।
—সেদিনই শেষ দেখা ওঁর সঙ্গে?
—হ্যাঁ। এত বৃষ্টি হচ্ছিল যে বলার নয়! আমরা লাঞ্চ ক্যানসেল করলাম। লীনা থেকে গেল ঘরটা গোছগাছ করবে বলে। আমার অফিসে কাজ ছিল। ফিরে এলাম আধঘণ্টা পর। সেই শেষ দেখা ওর সঙ্গে।
—লীনা আর বাড়ি ফেরেননি?
—না। বলেছি তো আগে। আমার বাড়ি ফিরতে প্রায় রাত দশটা হয়েছিল। এসে দেখলাম, লীনা ফেরেনি। সারা রাত ফিরল না।
—পুলিশে জানালেন না? মৈনাক-এ গেলেন না কেন রাতেই?
—পুলিশে তো পরদিন দুপুরেই জানালাম। যাদবপুর থানায় মিসিং ডায়েরি করলাম। তেমন গুরুত্ব দিল না থানা। অফিসার বললেন, এনকোয়ারি হবে। একটা ফোটো শুধু নিয়ে রাখলেন।
—বুঝলাম, কিন্তু সে-রাতেই তো মৈনাক-এ যেতে পারতেন?
—ভাবলাম, রাতটা দেখি। লীনার মা থাকেন সুন্দরীমোহন অ্যাভিনিউতে। ভাবলাম, হয়তো ওঁর শরীর হঠাৎ খারাপ হয়েছে। খবর পেয়ে গেছে ওখানে। হয়তো শাশুড়ি জোর করেছেন থেকে যেতে রাতটা। শাশুড়ির শরীরটা ইদানীং ভাল যাচ্ছিল না। প্রতি সপ্তাহেই এক-দু’বার যেত লীনা ওবাড়িতে। ভাবলাম…
—আপনার শাশুড়ির বাড়িতে ফোন নেই? এত কিছু ভেবে না নিয়ে ফোন তো করতে পারতেন একটা।
—করেছিলাম। কানেক্ট করতে পারিনি। জল জমলে শহরের ফোনের কী দশা হয় সে তো জানেনই। আমার অফিসের ফোনও সেদিন দুপুর থেকে ডেড।
—বেশ, তারপর?
—সেই রাতে একফোঁটা ঘুমোতে পারিনি দুশ্চিন্তায়। পরদিন সকালে, এই দশটা নাগাদ আবার গেলাম মৈনাক-এ। দেখলাম, তালা বন্ধ। লীনার কাছেই একমাত্র চাবি থাকত ফ্ল্যাটের। অফিস ফিরে ড্রাইভারকে পাঠালাম সুন্দরীমোহন অ্যাভিনিউয়ে লীনার মায়ের বাড়ি। ওখানেও নেই। আসেইনি। সোজা যাদবপুর থানায় গিয়ে ডায়েরি করলাম। সেদিনও ফিরল না লীনা। পরদিন মাথা কাজ করছিল না আমার। আর কোনও উপায় না দেখে সকাল-সকাল সোজা সিপি সাহেবের কাছেই ছুটলাম। তারপর তো সবটাই জানেন…
দৃশ্যতই ক্লান্ত দেখায় প্রদীপকে। আরও জিজ্ঞাসাবাদ করা দরকার ভদ্রলোককে, ভাবেন বৈদ্যনাথ। আরও তথ্য আসুক হাতে, তারপর দেখা যাবে।
তথ্য এলও পরের কয়েকদিন দৌড়ঝাঁপের পর। যা প্রদীপ বলেননি প্রাথমিক জেরার সময়। প্রথম, লীনার মা জানালেন, মেয়ের সঙ্গে জামাইয়ের সম্পর্ক গত কয়েক মাসে তলানিতে এসে ঠেকেছিল। চাকরি যখন ছেড়েছিলেন, লীনা মাইনে পেতেন মাসিক পনেরো হাজার। আজ থেকে প্রায় বাইশ-তেইশ বছর আগে মাসে হাজার পনেরো মানে অনেক। বিলাসবৈভবের পক্ষে যথেষ্ট। বিয়ের পর চাকরি ছাড়তে বাধ্য হওয়ায় স্বামীর উপর আর্থিকভাবে নির্ভর হয়ে পড়েছিলেন সম্পূর্ণ। প্রদীপ মাস গেলে তিন হাজার দিতেন লীনাকে। সেই নিয়েই সূত্রপাত অশান্তির। দুর্ব্যবহার তো ছিলই। গায়েও হাত তুলতেন মাঝেমাঝেই, মায়ের কাছে অনুযোগ করতেন লীনা।
দ্বিতীয়, নিজের কিছু গয়নাগাটি মেয়ের কাছে রেখেছিলেন লীনার মা। বিয়ের পর সেগুলো ফেরত দিতে চাননি প্রদীপ। লীনা এবং তাঁর মায়ের শত অনুরোধেও। এ নিয়েও অশান্তি হত প্রায়ই।
তৃতীয়, লীনার চরিত্রের দিকে নিয়মিত আঙুল তুলতেন প্রদীপ। যিনি সম্প্রতি ক্যালকাটা ক্লাবের প্রেসিডেন্ট পদের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। এবং গো-হারান হেরেছিলেন। লীনার সঙ্গে সামাজিক স্ট্যাটাসের এতটাই তফাত তাঁর, এবং লীনার বেহিসাবি জীবনযাপন এতটাই প্রচারিত, সেজন্যই ভোট পাননি সংখ্যাগরিষ্ঠের, এমনই বদ্ধমূল ধারণা হয়েছিল প্রদীপের।
