ধৈর্যের বাঁধ অবশ্য ভেঙে যেত কখনও কখনও। যেমন হয়েছিল ‘কয়ামত সে কয়ামত তক’ দেখতে যাওয়া নিয়ে। স্কুলে রোজ বন্ধুদের মুখে শুনছে, কী দারুণ হয়েছে সিনেমাটা। নতুন হিরো আমির খান বলতে তো বন্ধুরা পাগল। ভীষণ কিউট আর হ্যান্ডসাম নাকি। গানগুলোও সুপারহিট, টিভিতে ‘চিত্রহার’-এ শুনেওছে সুদীপা। মায়ের কাছে সিনেমাটা দেখতে যাওয়ার আবদার করা মাত্র মুখঝামটা শুনতে হল, ‘ক্লাস এইটের মেয়ে হিন্দি বই দেখতে যাবে হলে! তা-ও আবার রোম্যান্সের বই! শখ কত!’ জেদ করে দাঁড়িয়েছিল বলে থাপ্পড়ও পড়ল গালে, ‘সিনেমা দেখা নিয়ে আর একটা কথাও যেন মুখ থেকে না বেরয়। দশ মিনিটের মধ্যে পড়তে বসবি।’
সেদিন সন্ধেবেলা মাস্টারমশাই এসে লক্ষ করলেন, সহজ অঙ্কতেও আটকে যাচ্ছে সুদীপা। একবার নয়, বারবার। রণধীর জিজ্ঞেস না করে পারলেন না, ‘আজ কী হয়েছে তোমার? এত কেয়ারলেস মিসটেক তো তোমার হয় না।’ সুদীপা মাথা নিচু করে বসে আছে দেখে আলতো করে ছাত্রীর পিঠে হাত রাখলেন রণধীর, ‘কী হয়েছে তোমার?’ সুদীপা মুখ তুলে তাকাল। চোখে জল ভরে এসেছে। রণধীর অবাক হয়ে বললেন, ‘এ কী! কাঁদছ কেন?’ সুদীপা ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলতে থাকে সিনেমা দেখতে যাওয়া নিয়ে অশান্তির বৃত্তান্ত।
রণধীর শুনলেন। বললেন, ‘মায়ের নিশ্চয়ই আজ কোনও কারণে মেজাজ খারাপ ছিল, তাই তোমাকে মেরেছেন। এটা নিয়ে মন খারাপ করে থেকো না। মা তো তোমার ভালই চান…।’
বাক্য শেষ করতে পারলেন না রণধীর, খানিক চমকেই গেলেন সুদীপার প্রতিক্রিয়ায়, ‘না স্যার, মা আমার ভাল চায় না। কথায় কথায় গায়ে হাত তোলে। বাবা-দাদু-ঠাকুমা ছাড়া কেউ ভাল চায় না আমার। মা আমাকে কোথাও যেতে দেয় না। কারও সঙ্গে মিশতে দেয় না। কারও সঙ্গে কথা বলতে দেয় না। আপনিই বলুন স্যার, আমাকে সিনেমাটা দেখতে দিলে মায়ের কী ক্ষতি হত?’
—তুমি বাবাকেও তো বলতে পারো। হয়তো বাবা বুঝিয়ে বলতে পারবেন তোমার মা-কে।
সুদীপা চুপ। রণধীর বুঝতে পারলেন নীরবতার কারণ। এবাড়িতে নিয়মিত যাতায়াতের সুবাদে বুঝে গেছেন, মেয়েকে প্রাণাধিক ভালবাসেন ব্যবসার কাজে সকাল থেকে সন্ধে পর্যন্ত ব্যস্ত থাকা সুভাষ, কিন্তু সুদীপার রোজকার জীবন কীভাবে চলবে, সে ব্যাপারে শেষ কথা বলার অধিকার এবাড়িতে সুলেখারই। দাদু-ঠাকুমাও জানেন সেটা। অনন্ত স্নেহ-ভালবাসা দেন ওঁরা, কিন্তু নাতনির দৈনন্দিন জীবনধারার ব্যাপারে নাক গলান না কখনও। কখনও পেরোন না সুলেখার নির্ধারণ করে দেওয়া অদৃশ্য লক্ষ্মণরেখা।
মাস্টারমশাই সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেন ছাত্রীকে, ‘তুমি দুঃখ কোরো না, রেজাল্ট ভাল করলে আমি একদিন তোমাকে সিনেমা দেখাতে নিয়ে যাব, কেমন?’
সুদীপা মুখ তুলে তাকায়। জোর করে হাসার চেষ্টা করে। পড়ানো শেষ করে রণধীর উঠে পড়েন। বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মনে হয়, হলুদ টপ আর কালো স্কার্টে আজ কী দারুণ লাগছিল সুদীপাকে। এই বয়সে সব মেয়েকেই দেখতে ভাল লাগে। আর সুদীপা তো এমনিতেই দেখতে ভারী সুন্দর। যত বয়স বাড়ছে, রূপ যেন আরও ঝলসে উঠছে। দেখলে চোখ ফেরানো যায় না। আজকাল কখনও কখনও সুভাষবাবুকে বলতে ইচ্ছে করে রণধীরের, ‘আমি সপ্তাহে চারদিন নয়, রোজই আসব আপনাদের আপত্তি না থাকলে। তার জন্য বাড়তি টাকা লাগবে না।’ বলা হয়ে ওঠে না চক্ষুলজ্জায়। কী না কী ভেবে বসবেন ওঁরা! অবশ্য ভাবলে ভুল কিছু কি আর ভাববেন? নিজের কাছে কীভাবে লুকোবেন নিজেকে? সত্যিই তো সুদীপাকে রোজ দেখতে ইচ্ছে করে তাঁর। রোজ। মেয়েটার সঙ্গে সময় কাটাতে ইচ্ছে করে প্রতিদিন।
মাস দুয়েক পরের ঘটনা। পড়াতে এসে ফের রণধীর দেখলেন, সুদীপার মুখ ভার। বড্ড অন্যমনস্ক। কারণটা আজ আর খুঁচিয়ে জানতে হল না। সুদীপা নিজেই বলল, বাঁ হাতে খুব ব্যথা। মা আজ দুপুরে স্কেল দিয়ে মেরে কনুই ফুলিয়ে দিয়েছে। কেন? স্কুল থেকে ফেরার সময় বাড়িতে ঢোকার মুখে দেখা হয়ে গিয়েছিল অজন্তার সঙ্গে। পাড়াতেই থাকে কয়েকটা বাড়ি পরে। অজন্তার দাদা মানসও ছিল সঙ্গে। খুব বেশি হলে মিনিটদুয়েক ‘কী রে, কী খবর?’ গোছের কথাবার্তা বলেছে সুদীপা। তা-ও অজন্তার সঙ্গে। মানসদা দাঁড়িয়েই ছিল চুপচাপ। মা দেখেছে বারান্দা থেকে।
বাড়ি ঢুকতেই কৈফিয়ত তলব, ‘কেন কথা বলছিলি ওই ছেলেটার সঙ্গে?’ সুদীপা প্রতিবাদ করেছিল, ‘কথা তো অজন্তার সঙ্গে বলেছি!’ মা পালটা বলেছিল, ‘না, তুই ওর দাদার সঙ্গেই কথা বলছিলি, আমি নিজের চোখে দেখেছি।’ সুদীপারও রাগ হয়ে গিয়েছিল মায়ের অকারণ দোষারোপে, ‘তুমি ভুল দেখেছ। আর যদি মানসদার সঙ্গে একটা-দুটো কথা বলেই থাকি, কী এমন মহাভারত অশুদ্ধ হয়েছে?’ শুনে সুলেখা খেপে গিয়েছিলেন। চুলের মুঠি ধরে মেয়েকে মার, স্কেলপেটা।
‘কোথায় লেগেছে দেখি?’ সুদীপার হাতটা টেনে নিয়েছিলেন মাস্টারমশাই। ফুলে থাকা কনুইয়ে হাত বুলিয়ে দিয়েছিলেন। সহানুভূতির স্পর্শে কান্না উথলে এসেছিল সুদীপার। রণধীর বলেছিলেন, ‘ইশ! এভাবে কেউ মারে!’ চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে হাত রেখেছিলেন ছাত্রীর পিঠে। যাবতীয় দ্বিধা-দ্বন্দ্ব কাটিয়ে কাছে টেনে নিয়েছিলেন সুদীপাকে। স্যারের আঙুল ঘুরে বেড়াচ্ছিল ছাত্রীর কাঁধে-ঘাড়ে-পিঠে-গলায়। কী ভাল যে লাগছিল সুদীপার! মনে হচ্ছিল, স্যার যেন না থামেন। রণধীর আলতো করে সুদীপার মুখটা তুলে কপালে চুমু খেয়েছিলেন, বুকে আরও গভীরভাবে জড়িয়ে নিয়ে। ঠোঁটে ঠোঁট ছুঁইয়েছিলেন। সুদীপা কাঁপছিল। ভাললাগার কাঁপুনি। পুরুষস্পর্শে সব উজাড় করে সাড়া দিচ্ছিল কিশোরী শরীর।
