পাঁচজনের সংসার। দেবেন্দ্রমোহন-লতিকা, সুভাষ-সুলেখা আর তাঁদের কিশোরী কন্যা সুদীপা, পালবাড়ির একমাত্র মেয়ে। বাড়ির আদরের ‘বুড়ি’। দাদু-ঠাকুমা তো নাতনিকে চোখে হারান। সুদীপা যা যা খেতে ভালবাসে, ঠাকুমা পরম যত্নে বানিয়ে দেন নাতনির আবদারে। ‘বুড়ি’-অন্ত প্রাণ দাদুও। মুখের কথা খসতে না খসতেই সুদীপার জন্য হাজির করেন হরেক উপহার।
মেয়েকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন সুভাষের। নিজের ইচ্ছে ছিল ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার। স্বপ্ন আর পূরণ হয়নি সংসারের জাঁতাকলে। সেই স্বপ্নের পুনর্জন্ম হয়েছে সুদীপাকে ঘিরে। মেয়েটা পড়াশুনোয় ভাল। ক্লাসে প্রথম তিন-চার জনের মধ্যে থাকে ছোটবেলা থেকেই। এখন ক্লাস এইট। আর দু’বছর পরে, মানে ১৯৯০-এ মাধ্যমিক। সুভাষের স্থির বিশ্বাস, মেয়ে ভাল রেজাল্ট করবে। হায়ার সেকেন্ডারিতে সায়েন্স নিয়ে পড়ে তারপর জয়েন্ট এন্ট্রান্সে বসবে মেয়ে, ভাবাই আছে সুভাষের। ভাবতে কী যে ভাল লাগে সুভাষের, আজকের এই একরত্তি মেয়েটা সাত-আট বছর পর কোনও বড় কোম্পানির ইঞ্জিনিয়ার! ভেবেই রেখেছেন, বাড়ির সদর দরজায় তখন বেশ বাহারি একটা নেমপ্লেট লাগাবেন। ‘সুদীপা পাল, বিটেক’।
স্বপ্নপূরণের লক্ষ্যে এতটুকু খামতি রাখেননি সুভাষ। ইছাপুরেরই বাপুজি কলোনিতে রণধীর বসুর বাড়ি। নবাবগঞ্জ হাইস্কুলে অঙ্কের শিক্ষক। বাড়িতে প্রাইভেট টিউশনি করেন। পঞ্চান্ন বছরের রণধীর পাড়ায় পরিচিত ‘গদু মাস্টার’ নামে। লোকে বলে, গদু মাস্টারের কাছে নাড়া বাঁধলে অঙ্কে লেটার নিশ্চিত। এই গদু মাস্টারের কোচিং ক্লাসে মেয়েকে ভরতি করে দিয়েছিলেন সুভাষ। সপ্তাহে তিনদিন পড়তে যেত সুদীপা।
একদিন কোচিং থেকে মেয়েকে আনতে গিয়ে সুভাষ দেখলেন, যে ব্যাচে সুদীপা পড়ে, তার ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা বেড়েছে কয়েকজন। একচিলতে ঘরে গাদাগাদি করে বসতে হচ্ছে। সুভাষ সেদিনই রণধীরকে বললেন, ‘মাস্টারমশাই, এতজনের সঙ্গে এক ব্যাচে পড়লে পার্সোনাল অ্যাটেনশনটা সেভাবে পাচ্ছে না মেয়েটা। আমি চাইছি, আপনি বাড়িতে এসে পড়ান। যে সময়টা আপনি আমার বাড়িতে খরচ করবেন, তাতে হয়তো আপনার আরেকটা ব্যাচ পড়ানো হয়ে যেত। কিন্তু ওই টাকাটা পুষিয়ে দেব আমি। টাকা নিয়ে ভাববেন না।’
রণধীর রাজি হয়ে গেলেন। প্রাইভেট টিউটর হিসেবে তাঁর সুনাম আছে ঠিকই। তবে তাঁর দুই কামরার বাড়ির যে ঘরটায় ছাত্র পড়ান, তাতে খুব ঠাসাঠাসি করে বসলেও ছ’-সাতজনের জায়গা হয়। ব্যাচ বড় করার ইচ্ছে থাকলেও উপায় নেই। তা ছাড়া একটু বিত্তশালী ঘরের অভিভাবকদের একটা অনীহা থাকেই ওই ঘিঞ্জি ঘরে ছেলেমেয়েদের পাঠাতে।
কোচিংয়ের জন্য একটা বড় ঘর ভাড়া নিতে পারলে হত। কিন্তু সে আর্থিক সংগতি আর কোথায়? স্কুলে পড়িয়ে মাস গেলে মাইনে হাতে আসে হাজার দেড়েক। টিউশনি থেকে যা পান, সেটা মাসমাইনের সঙ্গে যোগ করলেও সংসার চালাতে হিমশিমই খেতে হয় রণধীরকে। মেয়ের বয়স এখন আট। তার স্কুলের খরচ আছে। তার উপর স্ত্রী অলকা মাঝেমাঝেই রোগে ভোগেন। চিকিৎসার খরচ আছে। মাসের শেষ সপ্তাহে পৌঁছে হাতে প্রায় কিছুই থাকে না। সুদীপার বাবা যে টাকাটা দেবেন বলছেন বাড়ি গিয়ে পড়ালে, সেটা নেহাত কম নয়।
সপ্তাহে চারদিন, সোম-বুধ-শুক্র-শনি, সন্ধে সাতটা থেকে সাড়ে ন’টা, বাড়িতে এসে সুদীপাকে পড়াতে শুরু করলেন রণধীর। এই ব্যবস্থায় সুলেখাও খুশি হলেন। চোদ্দো-পনেরো বছরের মেয়েকে নিয়ে মায়েরা একটু বেশিই সাবধানি থাকেন। কিন্তু সুলেখা ছিলেন আরও মাত্রাধিক সতর্ক। এবং ঘোর রক্ষণশীলও। মেয়ে আর দশজনের সঙ্গে গা-ঘেঁষাঘেঁষি করে বসে অঙ্ক শিখবে মাস্টারের বাড়ি গিয়ে, এতে শুরু থেকেই সায় ছিল না সুলেখার। মাঝেমাঝেই তাগাদা দিতেন সুভাষকে, ‘বলে দেখো না, যদি বাড়িতে এসে পড়াতে রাজি হন।’
শুধু অঙ্ক শেখাই নয়, সুলেখা চাইতেন, শুধু স্কুলে যাওয়া-আসাটা বাদ দিয়ে সুদীপার বাকি সবকিছুও আবদ্ধ থাকুক বাড়ির চৌহদ্দির মধ্যেই। বাড়ির সামনের মাঠে বিকেলে পাড়ার ছেলেমেয়েরা খেলাধুলো করত। সুদীপাকে যেতে দিতেন না সুলেখা, ‘কত রকমের লোক আসে ওখানে, তোর যাওয়ার দরকার নেই। বাড়িতে খেলনা আছে তো অনেক। বারান্দায় বসে খেল।’
বাড়িতে একা একা খেলে কি আর সেই আনন্দ পাওয়া যায়, যা পার্কে বা মাঠে সকলের সঙ্গে দৌড়াদৌড়ি করে মেলে? সুদীপার খুব ইচ্ছে করত মাঠের দোলনাটায় দুলতে, স্লিপে চড়তে। কিন্তু মা অনুমতি দিলে তো! অনুমতি ছিল না পাড়ার সমবয়সি কারও সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মেশার। অনুমতি ছিল না বন্ধুদের জন্মদিনে যাওয়ারও। কার জন্মদিন? কোথায় যেতে হবে? আর কে কে থাকবে? শুধু মেয়েরাই থাকবে তো, না কি কোনও ছেলেও থাকবে? ওই বাড়িতে কতজন পুরুষ? বন্ধুর বাবা কী করেন? হাজাররকম ফিরিস্তি দিতে হত সুদীপাকে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নাকচ হয়ে যেত আর্জি। যদি বা কখনও সুলেখা অনুমতি দিতেন, সেটা হত বহুবিধ শর্তসাপেক্ষে, ‘ঠিক সোয়া ঘণ্টার মধ্যে ফিরে আসতে হবে’, ‘অপরিচিত লোকের সঙ্গে কথা বলবে না’… এমন আরও অনেক। শুনতে শুনতে বন্ধুর বাড়ি যাওয়ার ইচ্ছেটাই মরে যেত সুদীপার। যেত না কোথাও, থেকে যেত বাড়িতেই। অভিমান আর মনখারাপ নিয়ে।
