সেদিন পালবাড়ি থেকে বেরনোর আগে রণধীর কানে কানে বলেছিলেন সুদীপার, ‘কোনও চিন্তা নেই তোমার। আমি তো আছি। আমাকে একটু ভাবতে দাও। তোমার মা বেশি বাড়াবাড়ি করলে তার ব্যবস্থা আমাদেরই করতে হবে।’
মেয়েকে শাসন করতে গিয়ে কেন মাঝেমাঝেই বাড়াবাড়ি করে ফেলতেন সুলেখা? কেন মেয়ের প্রতি আচরণে প্রায়শই ‘শাসন’ রূপ নিত ‘অত্যাচারের’? বাবা-দাদু-ঠাকুমার অফুরান স্নেহের প্রশ্রয়ে মেয়ে বিগড়ে যাবে, এমন আশঙ্কায় ভুগতেন বলেই কি জারি করেছিলেন এত নিয়মনিষেধ? নাকি অন্য কোনও অভাববোধ ছিল? যে না-পাওয়ার ক্ষোভ গভীর শিকড় গেড়েছিল অবচেতনে, এবং যার বহিঃপ্রকাশ প্রায়ই ঘটে যেত মেয়ের প্রতি ব্যবহারে? সুদীপার জন্মের পর বেশ কিছুদিন জটিল রোগে ভুগেছিলেন সুলেখা। সেরে ওঠার পর ডাক্তার জানিয়ে দিয়েছিলেন, কখনওই আর দ্বিতীয় সন্তানের মা হতে পারবেন না সুলেখা। গর্ভধারণ ক্ষমতা নষ্ট হয়ে গেছে পাকাপাকি। সুলেখার তীব্র ইচ্ছে ছিল, মেয়ের পর ছেলে হোক একটা। সেই পুত্রাকাঙ্ক্ষায় দাঁড়ি পড়েছিল সুদীপার জন্মের পর। কে জানে, অবচেতনে হয়তো মেয়ের ঘাড়েই চাপাতেন ইচ্ছাপূরণ না হওয়ার দায়।
একমাত্র সন্তানের যত্ন নিতেন না সুলেখা, এমন অপবাদ তা বলে কেউ দিতে পারবে না। কেউ বলতে পারবে না, মা হিসেবে মেয়ের প্রতি কর্তব্যে কোনওরকম ফাঁক রেখেছিলেন সজ্ঞানে। সুলেখার সমস্যা আসলে ছিল ওই ‘কর্তব্যবোধ’ সম্পর্কে তাঁর নিজস্ব ধ্যানধারণায়।
একটা বয়সের পর যে সন্তানের জীবনের প্রতিটি ওঠাপড়া নিয়ন্ত্রণে রাখা আর সেভাবে সম্ভব নয়, এবং জোর করে সেটা করতে গেলে যে সন্তানের মনে মা-বাবার প্রতি একটা অনিবার্য বৈরিতা তৈরি হয় ক্রমশ, সেটা সুলেখা বুঝতেন না। বুঝতেন না, অভিভাবকদের এই মাত্রাধিক নিয়ন্ত্রণকে সন্তানদের কাছে দাসত্ব বলে বোধ হয় বয়ঃসন্ধির বছরগুলোয়। বুঝতে চাইতেন না, দাসত্বের শৃঙ্খল যত বেশি নিশ্ছিদ্র হয়, তার থেকে মুক্তি পাওয়ার তাগিদও হয় ততটাই উদগ্র। মনও ততটাই বিদ্রোহী হয়ে উঠতে থাকে। মনস্তত্ত্বের ভাষায় authoritarian parenting-এর শিকার এই ছেলেমেয়েরা তখন চায় মানসিকভাবে অন্য কারও উপর নির্ভর করতে। কেউ যদি একটু সময় খরচ করে ওদের সুখ-দুঃখের কথা শোনে এ সময়, যদি পিঠে স্নেহের হাত রেখে দুটো সমবেদনার কথা বলে, তাকেই তখন নিজের শ্রেষ্ঠতম শুভানুধ্যায়ী মনে হয়।
নিজের পরিবারের বাইরে কাউকে অবলম্বন করে এই বাঁচতে চাওয়া কারও কারও ক্ষেত্রে পরিণত হয় ‘অবসেশনে’। সান্ত্বনা দেওয়ার মানুষটা, সমবেদনা পাওয়ার জায়গাটা তখন হয়ে ওঠে যে-কোনও মূল্যে পরম কাঙ্ক্ষিত। হয়ে ওঠে নিজের একমাত্র পরিত্রাণের জায়গা।
রণধীর ছিলেন সুদীপার সেই পরিত্রাণ। এক পক্ককেশ পঞ্চান্ন বছরের কুদর্শন পুরুষের প্রেমে সুদীপার মতো সুন্দরী উদ্ভিন্নযৌবনা কিশোরী যেভাবে ভেসে গেছিল অগ্রপশ্চাৎ না ভেবেই, তার নেপথ্যে ছিল ওই পরিত্রাণেরই রসায়ন।
মায়ের প্রতি সুদীপার পুঞ্জীভূত ক্ষোভকে প্রথমে ক্রোধ এবং ক্রমে ঘৃণায় পরিণত করতে অনুঘটকের ভূমিকা নিয়েছিলেন রণধীর। জানতেন, এই বয়সের উন্মত্ত রাগ ভুলিয়ে দিতে পারে অনেক কিছু। ভুলিয়ে দিতে পারে পরিবারের অন্যদের থেকে পাওয়া নিঃশর্ত স্নেহ-ভালবাসা, পরিবার থেকে পাওয়া অটুট নিরাপত্তা। রণধীর বুঝতেন, কৌশলী পরিচর্যা পেলে অন্ধ ক্রোধ একসময় বদলে যায়ই প্রতিহিংসায়। লোপ পায় বোধবুদ্ধি। নিরুদ্দেশ যাত্রায় যায় বিচার-বিবেচনা। ঠিক যেমনটা হয়েছিল সুদীপার।
প্রথম চুম্বনের সেই রাতে ঘুমতে পারল না সুদীপা। কানে নাগাড়ে বেজেই চলেছিল স্যারের কথাগুলো, ‘আমি তো আছি।’ কী ভালবেসে বললেন কথাটা! এমনভাবে তো কেউ কখনও বলেনি। এমনভাবে তো তার কথা ভাবেনি কেউ কখনও। মা যে এত কথায়-কথায় বকে-মারে, কই, বাবা-দাদু-ঠাকুমাও তো কখনও আটকাতে আসে না, বারণ করে না মা-কে। পরে এসে গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে যায় ঠিকই। কিন্তু বলে না তো কখনও, ‘কাঁদিস না বুড়ি, আমরা তো আছি।’ স্যার যেভাবে বললেন আজ, কত আদর করে!
আচ্ছা, সে কি স্যারের প্রেমে পড়তে চলেছে? স্যার তার থেকে প্রায় চল্লিশ বছরের বড়। মুখভরতি শ্বেতির দাগ। চুল পেকে গেছে অর্ধেক। রোগাটে সাদামাটা চেহারা। শেষ পর্যন্ত এমন একজনের প্রেমে পড়ল সে? না কি প্রেম এমনই হয়? চেহারা তুচ্ছ হয়ে যায়, বয়সের ব্যবধান তুচ্ছ হয়ে যায়, যখন সত্যিকারের ভালবাসা আসে ঢেউয়ের মতো?
সুদীপা ভেবেছিল, প্রেম। রণধীর বুঝেছিলেন, প্রেম নয়, মোহ। ‘Teenage infatuation’। শৃঙ্খলিত আবহে বড় হওয়া এক কিশোরীর অবদমিত চাওয়া-পাওয়ার প্রকাশ। এই মোহকে ব্যবহার করেছিলেন রণধীর, নিজের অর্থকষ্ট লাঘবের সিঁড়ি হিসেবে।
দ্বিধার বাঁধ একবার ভেঙে গেলে যা হয়, যত দিন যাচ্ছিল, গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছিল শিক্ষক-ছাত্রীর অসমবয়সি সম্পর্ক। পড়াশুনার ফাঁকে রোজই হত টুকটাক শরীরী আদর। সুদীপার সমস্ত অস্তিত্ব জুড়ে তখন ‘স্যার’, যাঁকে আপনি বলে সম্বোধন সবার সামনে, একান্তে স্রেফ ‘তুমি’।
’৯০-এর মাধ্যমিকের তখন মাত্র তিন মাস বাকি। রণধীর পড়াতে এসে সুদীপাকে একদিন বললেন, ‘মনে হয়, তোমাকে আর পড়াতে আসতে পারব না।’ সুদীপার মাথায় বিশ্বচরাচর ভেঙে পড়ল, ‘কেন স্যার?’ রণধীরকে বিষণ্ণ দেখাল, ‘আমি তো পড়াতেই চাই তোমাকে। তোমার বাবা মাইনেপত্র ভালই দেন, কিন্তু তবু আর পোষাচ্ছে না। অনেকটা সময় চলে যাচ্ছে এখানে। নতুন ব্যাচের ছাত্র পেয়েছি পাঁচজন। মাসে দুশো করে দেবে বলছে। মাস গেলে এক হাজার। ওটা পেলে আমার উপকার হবে। সংসারের যা টানাটানি, পেরে উঠছি না। তুমি কিছু মনে কোরো না।’
