দোতলা বাড়িটার কোথাও কোনও আলো জ্বলছে না। একতলার সদর দরজাটা হাট করে খোলা। বড়সড় অঘটন ঘটে গেল নাকি কোনও? একটু নার্ভাস লাগছিল রথীনের। ভিতরে ঢুকতে গিয়েও থমকে গেলেন। ঢোকার আগে আশেপাশের দু’-তিনটে বাড়ির লোককে ডেকে তুললেন। রথীন সহ পাড়ার অন্তত জনাছয়েক একসঙ্গে ঢুকলেন ভিতরে। এবং ঢুকেই বুঝলেন, অবিলম্বে নোয়াপাড়া থানায় খবর দেওয়া দরকার।
একতলায় দুটো শোবার ঘর। একফালি ড্রয়িংরুম। রান্নাঘর, বাথরুম। একতলার ভিতর থেকেই দোতলায় উঠে যাওয়ার সিঁড়ি। দুটো বেডরুম দোতলাতেও। দুটো ঘরের সঙ্গেই অ্যাটাচড বাথরুম। আর ছোট বসার ঘর একটা।
একতলার ঘরের মেঝেতে দুই বৃদ্ধ-বৃদ্ধার নিস্পন্দ দেহ পড়ে আছে। দেবেন্দ্রমোহন পাল এবং তাঁর স্ত্রী লতিকা। এপাড়ার একেবারে আদি বাসিন্দা বলা যেতে পারে এঁদের। একতলাতেই রান্নাঘরের বাইরে পড়ে আছেন সুলেখা। দেবেন্দ্র-লতিকার পুত্রবধূ। দোতলার একটা বেডরুমের বিছানায় নিথর পড়ে আছেন দেবেন্দ্রমোহনের একমাত্র ছেলে, বছর পঁয়তাল্লিশের সুভাষ।
চারজনের দেহেই তামার তার জড়ানো। যে তারের অন্য প্রান্ত গুঁজে দেওয়া রয়েছে কাছাকাছির ইলেকট্রিক প্লাগ-পয়েন্টে। শরীরের কিছু কিছু অংশ পুড়ে গেছে সবারই। চারজনের কারও দেহেই যে প্রাণের বিন্দুমাত্রও অবশিষ্ট নেই আর, সেটা বুঝতে ডাক্তার না হলেও চলে।
দুটো তলাই লন্ডভন্ড। বাড়ির যা কিছু আলমারি-দেরাজ, মূলত দোতলাতেই। সব খোলা। ভিতরের কাপড়চোপড়-জিনিসপত্র সব যে হাঁটকানো হয়েছে বেশ কিছুক্ষণ ধরে, স্পষ্ট। বাড়িময় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে এদিক-সেদিক পড়ে আছে এটা-ওটা-সেটা।
নোয়াপাড়া থানার জিপ যখন এসে থামল বাড়ির সামনে, ততক্ষণে পাড়ার সবাই জেগে গিয়েছেন। ভিড় জমে গেছে বাড়ির সামনে। পাড়ার মহিলারা ধাতস্থ করার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছেন সুভাষ-সুলেখার একমাত্র মেয়েকে। হাত-পা-মুখের বাঁধন রথীন খুলে দেওয়ার পর থেকেই যে কেঁদে চলেছে লাগাতার। কেঁপে কেঁপে উঠছে মাঝেমাঝে। বারবার মুখে-চোখে ঠান্ডা জলের ঝাপটা দেওয়া সত্ত্বেও এখনও কথা বলার মতো অবস্থাতেই পৌঁছয়নি মেয়েটি। যাকে ডাকনামেই পাড়ার সবাই চেনে। বুড়ি। ভাল নাম সুদীপা। সুদীপা পাল।
.
কোন মামলার কথা লিখছি, সেটা পাঠক অবধারিত আন্দাজ করতে পারছেন আগের অনুচ্ছেদগুলো পড়ে। সেই সাড়া-জাগানো মামলা, যার অভিঘাত শুধু রাজ্যের মানুষকেই স্তব্ধ করে দেয়নি, আলোড়ন ফেলে দিয়েছিল দেশজুড়েই। সেই ঘটনার কথা, প্রায় তিরিশ বছর পেরিয়ে গেলেও যা নিমেষে আমবাঙালির স্মৃতিতে ফিরে আসে ফ্ল্যাশব্যাকে, ‘নোয়াপাড়া’ আর ‘সুদীপা পাল’, এই শব্দ তিনটে একসঙ্গে উচ্চারণ করলেই।
কিছু মামলা থাকে, যা নিয়ে লোকের আগ্রহের পারদ কখনই নিম্নগামী হয় না। সে যতই পেরিয়ে যাক বছরের পর বছর, দশকের পর দশক। সুরূপা গুহ হত্যামামলা যেমন। সাতের দশকের শেষদিকের যে কেস নিয়ে এখনও অশেষ ঔৎসুক্য মানুষের মনে। তেমনই, কৌতূহলের শেষ নেই গড়িয়াহাটে দেবযানী বণিকের হত্যাকাণ্ড বা অক্সিটাউনের বহুচর্চিত খুনের মামলা নিয়ে। অথবা স্টোনম্যান বা খাদিম কর্তা অপহরণ বিষয়ে। এমন আছে আরও বেশ কিছু, যে সব ঘটনার নেপথ্যকথায় আমার-আপনার মতো সাধারণের আগ্রহ চিরকালীন। যে মামলার কথা লিখছি, তা-ও এই গোত্রেরই। কী হয়েছিল, কে করেছিল, কেন করেছিল, সেই মূল ব্যাপারটা সবারই মনে আছে মোটামুটি। তবু ঘটনাটাই এমন, আরও বিশদে জানতে চাওয়ার চাহিদাটা বেঁচে থাকেই।
এ মামলা নয়ের দশকের একেবারে শুরুর দিকের। সেসময় এই মামলার গতিপ্রকৃতি নিয়ে খবরের কাগজগুলো দিনের পর দিন নিউজ়প্রিন্ট খরচ করেছে অকৃপণ। এই কেস নিয়ে মনোবিদরাও গবেষণা করেছেন বিস্তর। তবু তিক্ত সত্যিটা হল, সে সংবাদপত্রের রিপোর্টই হোক বা বিশেষজ্ঞদের গবেষণা, উভয় ক্ষেত্রেই তথ্যের শুদ্ধতার সঙ্গে অনায়াসে মিশে গেছে কল্পনার ভেজাল, জল্পনার খাদ।
আরও স্বীকার্য, কেস ডায়েরিতে ধরা থাকা বিভিন্ন নথি-বয়ানের নীরস খতিয়ানে বা চার্জশিটে নথিবদ্ধ সাক্ষ্যপ্রমাণের বিবরণীতে, কিংবা আদালতের যুক্তি-তথ্য সমৃদ্ধ রায়েও বেরিয়ে আসে না এই ধরনের মামলার নেপথ্যের সব কিছু। বেরিয়ে আসে না পরদার পিছনে থাকা টুকরো টুকরো খণ্ডচিত্র। যা জানা যায় তদন্তের সঙ্গে জড়িত সর্বস্তরের অফিসার-কর্মীদের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণের আলাপচারিতায়। খোলস ছাড়ে বহু অজ্ঞাত-অশ্রুত তথ্য, প্রকাশ্যে আসে ঘটনার ‘কী-কেন-কখন-কীভাবে’-র আদ্যোপান্ত।
জানা ঘটনার অজানা কাহিনি, তাই থাকল লিপিবদ্ধ।
.
২৬, ব্রজনাথ পাল স্ট্রিটের উপর দোতলা বাড়িটা নোয়াপাড়ায় বেশি পরিচিত ‘পালবাড়ি’ হিসেবে। ইছাপুরের গোয়ালাপাড়ায় এই বাড়িটা তৈরি করেছিলেন দেবেন্দ্রমোহন পাল। শুরুতে অবশ্য একতলা ছিল। দোতলাটা হয়েছে এই বছর পাঁচেক হল, ছেলে সুভাষের উদ্যমে। সুভাষ পেশায় স্কুলশিক্ষক ছিলেন। পাশাপাশি হাত লাগাতেন দেবেন্দ্রমোহনের খড়ের ব্যবসাতেও। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কর্মক্ষমতা কমল দেবেন্দ্রের। শুরু হল অসুখ-বিসুখের উপদ্রব। স্কুলের চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে পাকাপাকিভাবে ব্যবসার হাল ধরলেন সুভাষ। শুধু হাল ধরলেন বললে কম বলা হয়, উদয়াস্ত পরিশ্রমে কয়েক বছরের মধ্যেই ব্যবসাকে বাড়িয়ে তুললেন দৈর্ঘ্যে-প্রস্থে। পালবাড়িতে লক্ষ্মীর বসতি স্থায়িত্ব পেল। ‘মধ্যবিত্ত’ থেকে পরিবারের উত্তরণ ঘটল ‘উচ্চবিত্তে’।
