সাজার মেয়াদ সম্পূর্ণ হয়েছে নাদির-আজাদের। রাজ এখনও সংশোধনাগারে।
কী লিখি শেষে?
ফেলুদার গল্পেই হোক বা বাস্তবে, গোরস্থানে সাবধান!
৫. যা গেছে তা যাক
সুলেখা কড়া চোখে তাকান গোঁজ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়ের দিকে, ‘একবার তো বললাম, যাবি না। কানে কথা যাচ্ছে না বুঝি? যা, পড়তে বোস।’
মায়ের বকুনিতে চোদ্দো বছরের কিশোরীর চোখ ছলছল। ফের মরিয়া আর্জি জানায়, ‘কেন যাব না? স্কুলের সবাই দেখে ফেলেছে সিনেমাটা। সবাই বলছে, দারুণ হয়েছে। আজ সন্ধের শো-তে অরুণিমা-দেবস্মিতারা যাচ্ছে। ওদের সঙ্গে যেতে না দাও, তুমি বা বাবা নিয়ে চলো।’
সুলেখা ঝাঁঝিয়ে ওঠেন, ‘ওরা যাচ্ছে যাক। হলে গিয়ে ওসব বড়দের হিন্দি বই দেখার বয়স তোর হয়নি। তুই যাবি না, ব্যস।’
—কে বলল বড়দের ছবি? ‘কয়ামত সে কয়ামত তক’ মোটেই বড়দের ছবি নয়। তা হলে তো ‘এ’ মার্কা থাকত, অরুণিমারাও যেতে পারত না। রোম্যান্টিক ছবি। ব্যারাকপুরে ‘জয়ন্তী’-তে চলছে। চলো না নিয়ে।
সুলেখার মাথায় আগুন চড়ে যায়। বাবা-দাদু-ঠাকুমার আদরে মেয়েটা যেন বাঁদর হয়ে উঠছে দিন-কে-দিন। ক্লাস এইটের মেয়ে হিন্দি বই দেখতে যাবে হলে! তা-ও আবার রোম্যান্সের বই! শখ কত! তা ছাড়া মুখে-মুখে এত চোপা করার মতো সাহসই বা হয় কী করে?
মেয়ে এখনও জেদ করে দাঁড়িয়ে আছে দেখে সুলেখা ঠাস করে একটা চড় কষিয়ে দেন গালে, ‘সিনেমা দেখা নিয়ে আর একটা কথাও যেন মুখ থেকে না বেরয়। দশ মিনিটের মধ্যে পড়তে বসবি।’ কথাগুলো বলেই দোতলা থেকে নেমে আসার সিঁড়িতে পা রাখেন সুলেখা। রান্নাবান্নার অনেক কাজ পড়ে আছে। দ্রুত পা চালিয়ে চলে আসেন নীচে। সময় হয় না আর পিছনে ফিরে তাকানোর। তাকালে দেখতে পেতেন, কিশোরী কন্যা যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল, সেখান থেকে একচুলও নড়েনি। ঠায় দাঁড়িয়ে দেখছে মায়ের নীচে নেমে যাওয়া। পাতা প্রায় পড়ছেই না চোখের। অদ্ভুত সে দৃষ্টি! ক্ষোভ-রাগ-অভিমানের সঙ্গে যাতে দ্বেষেরও তীব্র মিশেল!
.
— হল তো! হল তো! কতবার বলেছিলাম, পাপ বিদেয় করো, বিদেয় করো! কানে কথাই তুললে না! তুললে আজ এভাবে মানসম্মান নিয়ে টানাটানি হত না। গলায় দড়ি দিয়ে মরতে ইচ্ছে করছে আমার!
থামানো যাচ্ছিল না সুলেখাকে। স্ত্রী-র মুখরা স্বভাবের সঙ্গে সুভাষ পরিচিত বিয়ের অল্পদিন পর থেকেই। কিন্তু আজ যেন সুলেখার মেজাজ আরও বেশি বাঁধনহীন। রণচণ্ডী মূর্তি একেবারে। অন্যদিন হলে সুভাষ ঠান্ডা মাথায় শান্ত করার চেষ্টা করতেন সুলেখাকে। আজ সেটা করে লাভ নেই। যা ঘটেছে, শুনে তাঁর নিজেরই মাথা গরম হয়ে যাচ্ছে। ভুল তো কিছু বলছে না সুলেখা। সত্যিই তো আগে একাধিকবার বলেছে ওই মাস্টারকে ছাড়িয়ে দিতে। তেমন একটা পাত্তা দেননি সুভাষ। কিন্তু আজ যা ঘটল, তারপর তো পাড়ায় থাকাই দায় হয়ে যায়। লোকে বাড়ি বয়ে এসে এভাবে অপমান করে যাবে!
আর অপমান বলে অপমান! সন্ধেবেলা কাজ সেরে বাড়ি ফিরে স্ত্রীর মুখে সুভাষ শুনলেন, বিকেলের দিকে অলকা এসেছিলেন। বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে দশ মিনিট ধরে পাড়া-প্রতিবেশী সবাইকে শুনিয়ে তুমুল গালিগালাজ করে গেছেন, ‘এমন মেয়ে আমার থাকলে গলায় পা দিয়ে মেরে ফেলতাম! ছি ছি! লজ্জা করে না! বলিহারি যাই এমন বাপ-মায়ের! বাপের বয়সি মাস্টারের পিছনে মেয়েকে লেলিয়ে দিয়ে মজা দেখছে…।’
সুলেখা প্রতিবাদ করতে গিয়েছিলেন, ‘এসব আপনি কী যা-তা বলছেন!’ উত্তরে গলার মাত্রা আরও চড়িয়েছিলেন রাগে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য অলকা, ‘ঠিকই বলছি। একদম ন্যাকা সাজবেন না! ধিঙ্গি মেয়েকে সামলে রাখতে পারেন না তো জন্ম দিয়েছিলেন কেন? আর লাইনেই যদি নামাতে হয়, ভদ্রপাড়ায় কেন? সোনাগাছিতে পাঠান!’
প্রতিটা শব্দ যেন কানে আগুনের হলকা পৌঁছে দিচ্ছিল সুলেখার। মেয়ে স্কুল থেকে ফিরে নিজের ঘরে ঘুমচ্ছিল। টেনে তুলেছিলেন চুলের মুঠি ধরে, কিল-চড়-থাপ্পড় খরচ করেছিলেন এলোপাথাড়ি, ‘ঠিকই তো বলে গেল, তোর মতো মেয়েকে পেটে ধরাটাও পাপ। থাকার থেকে না থাকা ভাল। পড়াশুনো করে দিগ্গজ হওয়া বার করছি তোর।’
মা যতক্ষণ মারছিল, আত্মপক্ষ সমর্থনে একটি শব্দও খরচ করেনি মেয়ে। মারের পর্ব শেষ হওয়ার পর শুধু স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়েছিল সুলেখার দিকে। অদ্ভুত সে দৃষ্টি! যা থেকে অভিমান তো নয়ই, ক্ষোভ-রাগ-দ্বেষও নয়, ঠিকরে পড়ছিল স্রেফ প্রতিহিংসা।
নেমন্তন্ন-বাড়ি থেকে ফিরতে একটু বেশিই রাত হয়ে গিয়েছিল রথীনবাবুর। সেই বরানগরের বিয়েবাড়ি থেকে এই নোয়াপাড়া, দূরত্ব তো নেহাত কম নয়। রাতে খাওয়ার পর ছাদে একটু পায়চারি করা মধ্যপঞ্চাশের রথীনের বরাবরের অভ্যেস। রাত প্রায় পৌনে বারোটা নাগাদ ছাদে উঠে সবে একটা সিগারেট ধরিয়েছেন, আওয়াজটা তখনই কানে এসেছিল। গোঁ-গোঁ করে একটা শব্দ আসছে না পালবাড়ির দিক থেকে? কে গোঙাচ্ছে এত রাতে? বিপদ-টিপদ হল নাকি কিছু? ছাদের উপর থেকে স্পষ্ট কিছু দেখাও যাচ্ছে না। রথীন তড়িঘড়ি নেমে এসেছিলেন নীচে। বেরিয়ে পড়েছিলেন টর্চ নিয়ে। মিনিটদুয়েকের মধ্যেই আবিষ্কৃত হয়েছিল ওই গোঁ-গোঁ আওয়াজের উৎস।
পালবাড়ির সদর দরজার সামনেই পড়ে আছে মেয়েটা। দড়ি দিয়ে হাত-পা বাঁধা পিছমোড়া করে। মুখও বাঁধা কাপড় দিয়ে। ওই অবস্থাতেই আওয়াজ করার চেষ্টা করে যাচ্ছে প্রাণপণ। কাছে গিয়েই চমকে উঠলেন রথীন। আরে, এ তো পালবাড়িরই মেয়ে! এখানে এভাবে পড়ে? তাড়াতাড়ি হাত-পা আর মুখের বাঁধনটা খুলে ফেললেন রথীন। মেয়েটা হাঁফাচ্ছে। কাঁপছে সারা শরীর। ‘কী রে, কী হয়েছে?’-র জবাবে কেঁদে ফেলল ঝরঝরিয়ে। কোনওরকমে নিজেদের বাড়ির দিকে আঙুল দেখাতে পারল শুধু।
