—পুঁতলি কীভাবে বডিটা?
—ওখানে পুরনোদিনের অনেক মূর্তি আছে স্যার। দামি মার্বেল পাথরের। চোরেরা এসে পাথর ভেঙে নিয়ে যায়। মূর্তির মাথাও কেটে নিয়ে যায়। ভাঙা পাথরের বড় বড় টুকরো অনেক থাকে ওখানে। একটু খুঁজলেই পাওয়া যায়। আমরা তিনজন ভারী কয়েকটা পাথরের টুকরো খুঁজে আনলাম। সেই দিয়ে মাটির কিছুটা তাড়াতাড়ি খুঁড়ে গোপালের বডি পুঁতে দিলাম।
—তোর বাঁ হাতের কাটা দাগটা? ক্ষুর থেকেই তো?
—হ্যাঁ স্যার। ক্ষুর চালানোর সময় গোপাল হাত চালিয়েছিল। আমার হাতেও ক্ষুর লেগেছিল। অনেকটা রক্ত ছিটকে এসে আমার পাজামাতে লেগেছিল। পাজামা আর ক্ষুর, দুটোই কবরখানাতেই মাটি খুঁড়ে পুঁতে দিয়েছিলাম। গোপালের ঘড়ি আর মানিব্যাগটা আজাদ নিয়েছিল।
সে রাতে বেরনোর সময়ই আমরা ঠিক করলাম, হপ্তাখানেক এলাকায় থাকব না। সব ঠান্ডা হয়ে গেলে ফিরে আসব। ব্যান্ডেলে এক বন্ধুর বাড়িতে গিয়ে লুকিয়েছিলাম। টাকা ফুরিয়ে আসছিল। বেশিদিন কামাই করলে গ্যারাজের চাকরিটাও চলে যেত।
—রাজ আর আজাদকে কোথায় পাওয়া যাবে?
—সেটা বলতে পারব না স্যার।
আজাদকে ধরতে বেগ পেতে হল না বিশেষ। সোর্স মারফত খবর এল দিন পনেরোর মধ্যেই। এদিক-ওদিক পালিয়ে বেড়াচ্ছিল। নাদিরের মতো আজাদকেও ফিরতে হতই জাননগরের বাড়িতে। চালু ছিল নিশ্ছিদ্র নজরদারি। এলাকায় পা রাখার ঘণ্টাদুয়েকের মধ্যেই ধরা পড়ল জালে।
বেনিয়াপুকুরের বাসিন্দা রাজ বরং বিস্তর ভোগাল পুলিশকে। ধরা পড়ল প্রায় এক বছর পরে। পালিয়ে গিয়েছিল বিহারে। রাজকে ফেরার দেখিয়েই যাবতীয় তথ্যপ্রমাণ সংবলিত চার্জশিট দ্রুত জমা দিয়েছিলেন সুশান্ত।
এই মামলার তদন্ত এবং চার্জশিট ছিল পুরোটাই পারিপার্শ্বিক প্রমাণ (circumstantial evidence) নির্ভর। এবং সেজন্যই তদন্তে তিল মাত্রও ফাঁকফোকর রাখার উপায় ছিল না সুশান্তের। যে খুনের ঘটনায় কোনও প্রত্যক্ষদর্শী নেই, সেই মামলায় পারিপার্শ্বিক প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযুক্তদের দোষী সাব্যস্ত করা অতি দুরূহ কাজ।
কেন দুরূহ? সুপ্রিম কোর্ট ১৯৫২ সালের একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলার রায়ে পারিপার্শ্বিক প্রমাণ বিষয়ে যা বলেছিল, তার অংশবিশেষ তুলে দিলাম নীচে।
‘It is well to remember that in case where the evidence is of a circumstantial nature, the circumstances from which the conclusion of guilt is to be drawn should be in the first instance be fully established and all the facts so established should be consistent only with the hypothesis of the guilt of the accused. Again, the circumstances should be of a conclusive nature and tendency and they should be such as to exclude every hypothesis but the one proposed to be proved. In other words, there must be a chain of evidence so far complete as not to leave any reasonable ground for a conclusion consistent with the innocence of the accused and it must be such as to show that within all human probability the act must have been done by the accused.’
সারাংশ? পারিপার্শ্বিক প্রমাণের ভিত্তিতে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করার শর্তাবলি খুব পরিষ্কার। যে ঘটনাগুলিকে পরিপার্শ্ব বা অবস্থানগত প্রমাণ হিসেবে দাবি করছেন তদন্তকারী, তা শুধু সংশয়াতীত ভাবে প্রমাণ করাটাই যথেষ্ট নয়। ঘটনাগুলি যে অভিযুক্তের অপরাধী হওয়ার তত্ত্বকেই শুধুমাত্র প্রতিষ্ঠিত করছে, তা নিয়ে যেন ন্যূনতম দ্বিধাদ্বন্দ্ব না থাকে বিচারকের মনে। সর্বোপরি, ঘটনা এবং প্রমাণের বাঁধুনি হতে হবে এতটাই সুশৃঙ্খল, যে সন্দেহের কণামাত্র অবকাশও থাকবে না অভিযুক্তের অপরাধ নিয়ে।
শর্ত মেনেই খুঁতহীন চার্জশিট তৈরি করেছিলেন সুশান্ত। নাদিরের বয়ান অনুযায়ী কবরখানা থেকে উদ্ধার হয়েছিল পুঁতে রাখা ক্ষুর এবং লুঙ্গি। ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করা রক্ত যে মানবদেহের এবং গোপালের জামাকাপড় আর নাদিরের ক্ষুর ও লুঙ্গিতে লেগে থাকা রক্ত যে একই গ্রুপের, সেটা ফরেনসিক পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছিল। আজাদের বাড়ি থেকে বাজেয়াপ্ত হয়েছিল মানিব্যাগ আর ঘড়ি, যা গোপালের বলেই আদালতে চিহ্নিত করেছিলেন ওঁর দাদারা। ক্রিমেটোরিয়াম স্ট্রিটে সে রাতে যখন গোপালের মুখোমুখি রাজ-আজাদ-নাদির, বাড়ি ফিরছিলেন এলাকার দীর্ঘদিনের বাসিন্দা হানিফ। যিনি প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে আদালতে অভিযুক্তদের শনাক্ত করেছিলেন, প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ‘last seen together’-এর জরুরি প্রমাণ। এবং ছিল ঘটনার দায় স্বীকার করে আদালতে বিচারকের কাছে নাদির-আজাদের গোপন জবানবন্দি। জাল কেটে বেরনোর রাস্তা কোথায় আর?
আলিপুর জেলা ও দায়রা আদালত যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে নাদির, রাজ ও আজাদকে। রায়ে সপ্রশংস উল্লেখ ছিল শাহ্জামল এবং সুশান্তের ভূমিকার।
নাদির এবং আজাদ শাস্তি মকুবের আবেদন করে হাইকোর্টে। সওয়াল-জবাবের পালা সাঙ্গ হলে নিম্ন আদালতের রায়ের সঙ্গেই সহমত হয় হাইকোর্ট। সাজাপ্রাপ্তদের পরবর্তী গন্তব্য ছিল সুপ্রিম কোর্ট, শাস্তির মেয়াদ কমানোর আর্জি নিয়ে। সর্বোচ্চ আদালত সেই আর্জি খারিজ করে দেয় পত্রপাঠ।
