খুনটা ঠিক কীভাবে হয়েছিল, আদ্যোপান্ত খুলে বলল নাদির। প্রকাশ্যে এল গোপাল-হত্যার নেপথ্যকাহিনি।
—আমি রেশমাকে পাগলের মতো ভালবাসতাম স্যার। মনে হত, ও চাইলে জানও দিয়ে দিতে পারি। কিন্তু ও আমাকে পাত্তাই দিত না। যে-দিন সন্ধের দিকে এন্টালিতে ওদের দু’জনকে হাত-ধরাধরি করে দেখলাম, দিমাক খারাপ হয়ে গেল। গোপালকে চিনি আমি। এলাকার ছেলে। মুখচেনা, তবে আলাপ ছিল না তেমন। রেশমার সঙ্গে গোপালকে দেখে রাগে অন্ধ হয়ে গেলাম আমি। গোপালের মধ্যে কী দেখল মেয়েটা?
রেশমাকে ধরলাম পরের দিন সন্ধেবেলা। পার্ক সার্কাসে চার নম্বর ব্রিজের কাছে। জানতাম, ওই সময় কোচিং ক্লাস থেকে বাড়ি ফেরে। আমি স্ট্রেট বললাম, ‘তোমাকে গোপালের সঙ্গে দেখলাম কাল বিকেলে। ওর সঙ্গে মিশছ কেন?’ রেশমা ভীষণ রেগে গেল। বলল, ‘তাতে তোমার কী? ওকে ভাল লাগে, তাই মিশছি। বেশ করছি।’
—তারপর?
—শুনে মাথা দপদপ করছিল। রেশমার সঙ্গেই আমার নিকাহ হবে, এই খোয়াব দেখতাম। সারারাত ঘুমতে পারলাম না স্যার। মনে হচ্ছিল, রাতেই গোপালের বাড়ি চলে যাই। মেরে মুখ ফাটিয়ে দিই।
আমার দুই কাছের বন্ধু রাজ আর আজাদকে সব খুলে বললাম পরের দিন। রাজ বলল, মাথা গরম করিস না। এই গোপাল মালটাকে রাস্তায় ধরে একটু চমকে দিই চল। আজাদ সায় দিল, বলল, দরকার হলে সলিড কয়েক ঘা দিয়ে দেব। রেশমার দিকে আর কখনও চোখ তুলে তাকানোর সাহস হবে না। আমিও ভাবলাম, ঠিকই বলছে। থ্রেট দিলেই কাজ হয়ে যাবে।
—হুঁ…
—রাজ বুদ্ধি দিল, পাড়াতে এসব করতে গেলে হল্লা হয়ে যাবে। নির্জন কোনও জায়গায় গোপালকে নিয়ে যেতে হবে। আজাদও বলল, হ্যাঁ, এমন কোথাও, যেখানে কেউ আশেপাশে থাকবে না। আমি বললাম, কিন্তু গোপাল আমাদের সঙ্গে যেতে রাজি হবে কেন? রাজ হাসল, ‘আরে, ওটা কোনও প্রবলেমই না। আমার সঙ্গেও ওর মুখচেনা আছে। আমি কায়দা করে নিয়ে আসব। আগে জায়গাটা ঠিক কর তোরা।’
আজাদ বলল, জাননগরের কবরখানায় নিয়ে গেলে কেমন হয়? আজাদের কথাটা মনে ধরল আমার। ফাঁকা জায়গা, সন্ধের পর একটা লোকও থাকে না। অফিসঘরটার কাছে ছাড়া ভিতরে কোথাও জোরালো লাইটও নেই। পাঁচিল ভাঙা অনেক জায়গায়। ঢুকতে অসুবিধে হবে না।
—বুঝলাম…
—আমরা প্ল্যান বানালাম। ঠিক হল, আমি একটা ক্ষুর জোগাড় করে আনব ভয় দেখানোর জন্য। মারার কোনও প্ল্যান ছিল না স্যার, বিশ্বাস করুন। গোপাল রাত করে বাড়ি ফেরে, মল্লিকবাজার দিয়ে। রাজ ওকে রাস্তায় ধরে বলবে, ওর কোনও আত্মীয়ের অসুখ। হাসপাতালে নিয়ে যেতে সাহায্য লাগবে। এই বলে ও কবরখানার পিছনের রাস্তায় নিয়ে আসবে। আমরা ওখানে অপেক্ষা করে থাকব।
—বেশ …
—প্ল্যানমাফিকই হল সব। রাজ কবরখানার পিছনের রাস্তায় নিয়ে এল গোপালকে। আমাকে আর আজাদকে দেখে চমকে গেল গোপাল। রাজ ওকে বলল, ‘রেশমার সঙ্গে তোর নাকি ইশক চলছে শুনলাম।’ গোপাল রেগে গেল, ‘তাতে তোর কী? তুই আমাকে মিথ্যে কথা বলে এখানে আনলি কেন?’ আমি পকেট থেকে ক্ষুরটা বার করে সোজা গলায় ঠেকিয়ে দিলাম, ‘ভিতরে চল, বলছি। না হলে এটা স্ট্রেট চালিয়ে দেব, মা কসম!’
গোপাল হকচকিয়ে গেল। পাঁচিলের ভাঙা জায়গার কোনখান দিয়ে ঢুকব, কোথায় বসব, আগে থেকেই ঠিক করা ছিল। গোপালকে নিয়ে ভিতরে ঢুকে রাজ আর আজাদ চমকে-ধমকে বোঝানোর চেষ্টা করল অনেক। গোপাল কিছু বলছিল না। মুখ গোঁজ করে বসেছিল। আমি শেষে বললাম, ‘দ্যাখ গোপাল, আমি রেশমাকে অনেকদিন ধরে ভালবাসি। তুই এর মধ্যে ঢুকিস না। আর যদি কখনও রেশমার সঙ্গে তোকে দেখি, হাওয়া করে দেব একেবারে।’
আমি এটা বলামাত্রই খেপে গেল গোপাল। চিৎকার করতে শুরু করল, ‘কী ভেবেছিস তোরা? মিথ্যে বলে ডেকে এনে ভয় দেখাবি, আর আমি রেশমাকে ভুলে যাব? তোকে রেশমা কেন পছন্দ করে না জানিস? তোর এই মাস্তানি স্বভাবের জন্য। রেশমা কার সঙ্গে মিশবে, আমি কার সঙ্গে মিশব, তুই ঠিক করে দেওয়ার কে রে? হাওয়া করে দিবি মানে? আমি কালই থানায় কমপ্লেন করছি দাঁড়া।’
আমার যে কী হয়ে গেল স্যার… গোপালের মেজাজ দেখে আমি আর মাথা ঠিক রাখতে পারলাম না। ঝাঁপিয়ে পড়লাম ওর উপর । ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলাম মাটিতে। গোপাল পড়ে যেতেই আমি ওর গলায় ক্ষুর চালিয়ে দিলাম রাগের মাথায়। পড়ে যাওয়ার পর গোপালও হাত-পা চালানোর চেষ্টা করেছিল। রাজ আর আজাদ তখন চেপে বসেছিল ওর বুকের উপর। প্রচুর রক্ত বেরচ্ছিল গোপালের গলা দিয়ে। একটু পরে ও স্থির হয়ে গেল। আমরা নাকের কাছে হাত দিয়ে বুঝলাম, নিশ্বাস পড়ছে না, মরে গেছে। খুব ভয় পেয়ে গেছিলাম আমরা। মারতে চাইনি স্যার, হঠাৎ করে কী যে হয়ে গেল……
—কী চেয়েছিলিস না চেয়েছিলিস সেটা আমরা বুঝব। বাকিটা বল।
—বলছি স্যার। আমরা ভাবলাম, বডিটা না সরিয়ে ফেললে তো সব জানাজানি হয়ে যাবে। থানা-পুলিশ হবে। ধরা পড়লে লাইফ বরবাদ। জেল যেতে হবে। কিন্তু সরাব কোথায়? রাজই বলল, এই কবরখানাতেই পুঁতে দিই চল। লাশ না পেলে কেউ কিচ্ছু করতে পারবে না। আজাদ বলল, পেলেও কেউ চিনতে পারবে না এমন ব্যবস্থা করতে হবে। কাছেই একটা ভারী সিমেন্টের টুকরো পড়ে ছিল। সেটা নিয়ে এসে গোপালের মুখের উপর আছড়ে ফেললাম।
